রহস্যের জগতে কিছু চরিত্র থাকে, যারা উচ্চস্বরে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয় না—তবু তাঁদের চোখ এড়ায় না কিছুই। তাঁরা অস্ত্র হাতে নেন না, তাড়া করে না অপরাধীকে; বরং চুপচাপ বসে মানুষের কথাবার্তা, আচরণ, নীরবতা আর ফাঁকফোকর পড়ে ফেলেন নিখুঁতভাবে।

সোহিনী যখন মার্পেল।
শেষ আপডেট: 1 January 2026 19:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রহস্যের জগতে কিছু চরিত্র থাকে, যারা উচ্চস্বরে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয় না—তবু তাঁদের চোখ এড়ায় না কিছুই। তাঁরা অস্ত্র হাতে নেন না, তাড়া করে না অপরাধীকে; বরং চুপচাপ বসে মানুষের কথাবার্তা, আচরণ, নীরবতা আর ফাঁকফোকর পড়ে ফেলেন নিখুঁতভাবে। ঠিক এমনই এক কিংবদন্তি চরিত্র মিস মার্পেল (Phool Pishi O Edward, Miss Marple)। বিশ্বসাহিত্যের রহস্যভুবনে যাঁর নাম উচ্চারিত হলেই মনে পড়ে শান্ত স্বভাবের এক বৃদ্ধা, যাঁর সরলতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে শীতল যুক্তি আর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ। আগাথা ক্রিস্টির নির্মিত চরিত্র মিস মার্পেলের আত্মা, দর্শন আর অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গিই এবার বাংলা ছবির শরীরে নতুন করে প্রাণ পেতে চলেছে—‘ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড’-এ।
উইন্ডোজ প্রোডাকশনসের পঁচিশ বছরে পা দেওয়ার সন্ধিক্ষণে নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বেছে নিয়েছেন এমনই এক গল্প। কারণ, তাঁদের মতে, এটি শুধু একটি মিস্ট্রি নয়—এ এক ধরনের অনুভব। উইন্ডোজের দীর্ঘ পথচলায় যে মানবিক গল্প বলার চর্চা তাঁরা লালন করে এসেছেন, তার সঙ্গে মিস মার্পেলের চরিত্রগত গভীরতা আশ্চর্যজনকভাবে মিশে যায়। এই ছবি তাঁদের কাছে তাই নিছক উদযাপনের ঘোষণা নয়, বরং নিজেদের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার এক আবেগঘন প্রচেষ্টা।
মিস মার্পেল—যিনি গ্রাম্য পরিবেশে বসেই খুন, ষড়যন্ত্র আর মানবমনের অন্ধকার চেনে—বাংলা সংস্করণে রূপ নিচ্ছেন ‘ফুল পিসি’ হয়ে। এখানে গোয়েন্দাগিরি কোনও পেশা নয়, বরং জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত এক প্রজ্ঞা। মানুষকে পড়ে নেওয়ার ক্ষমতা, ছোট-ছোট ঘটনার মধ্যে বড় সত্য খুঁজে বের করার দক্ষতা, আর নিঃশব্দে সবকিছুর গভীরে পৌঁছে যাওয়ার যে বৈশিষ্ট্য মিস মার্পেলের চরিত্রকে অমর করে তুলেছে, সেই সত্তাই নতুন করে নির্মিত হচ্ছে এই ছবিতে। সেই কেন্দ্রীয় চরিত্রে দেখা যাবে সোহিনী সেনগুপ্তকে—যাঁর অভিনয়ে সংযম, তীক্ষ্ণতা চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলবে বলেই আশাবাদী নির্মাতারা।

‘ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড এগোবে মিস্ট্রি-ড্রামার পথে, যেখানে রহস্য কখনও আলাদা করে চিৎকার করবে না, বরং ধীরে ধীরে আবেগের সঙ্গে মিশে দর্শকের মনে ঢুকে পড়বে। চরিত্রনির্ভর, বহুস্তরীয় এই গল্প শহুরে চাকচিক্যের বদলে মাটির কাছাকাছি দাঁড়িয়ে কথা বলবে—ঠিক যেমন মিস মার্পেল তাঁর ছোট্ট পরিসর থেকেই গোটা অপরাধজগতের মানচিত্র এঁকে ফেলতেন।
এই যাত্রায় সঙ্গী হচ্ছেন—অর্জুন চক্রবর্তী, অনামিকা সাহা, রাইমা সেন, সাহেব চট্টোপাধ্যায়, রজতাভ দত্ত, অনন্যা চট্টোপাধ্যায়, কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যামৌপ্তি মুদলি, ঋষভ বসু এবং সৌম্য মুখোপাধ্যায়। প্রত্যেক চরিত্রই গল্পের রহস্যকে আরও ঘনীভূত করবে, আবার আবেগের নতুন দরজাও খুলে দেবে। ছবির আবহ নির্মাণে সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন জয় সরকার। শব্দের শরীর পাবে শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলমে। এই মুহূর্তে চিত্রনাট্য লেখার কাজ চলছে। প্রতিটি চরিত্র, প্রতিটি মোড় খুঁজে নেওয়ার পরই শুরু হবে প্রি-প্রোডাকশন। পরিচালকদ্বয়ের মতে, দর্শকের দীর্ঘদিনের চাওয়াই ‘বহুরূপী’র ফেরার মূল কারণ, আর এবার তাঁরা সেই জগৎকে আরও বিস্তৃত ও গভীরভাবে তুলে ধরতে চান।
নতুন ছবি ও পুরনো ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে উইন্ডোজ প্রোডাকশনস যেন আবারও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে—২৫ বছরে পা দিয়েও গল্প বলা থামে না। বরং অভিজ্ঞতার ভারে সেই গল্প আরও সূক্ষ্ম, আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। ‘ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড’ তাই শুধু বাংলা ‘মিস মার্পেল’ হয়ে ওঠে না; রহস্য আর আবেগের সুতোয় গাঁথা এক নিজস্ব, স্বতন্ত্র অধ্যায়ের জন্ম দেয়।