
শেষ আপডেট: 8 December 2023 20:34
বানিজ্যিক ছবির বক্সঅফিস সাফল্য নির্ভর করেছে চিরকাল হিট 'জুটি'র ওপর। বাংলা ছবির ইতিহাসও সেই ছায়াপথ ধরেই এগিয়েছে। বাংলা ছবির প্রথম হিট জুটি বলা যায় প্রমথেশ বড়ুয়া-কানন দেবী কে। তাঁদের রেকর্ড হিট ছবি 'মুক্তি'। যে ছবিতে প্রমথেশ-কানন প্রথম প্রেমের পতাকা উড়িয়েছিলেন বাংলা ছবিতে। দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে উমাশশী বা চন্দ্রাবতী দেবীর জুটিও হিট করেছিল।
তবে এই জুটিগুলি পরের যুগে সে অর্থে সমকালীন হতে পারেনি। ছবি গুলি আধুনিক যুগের থেকে কিছুটা টকি স্টাইলে নির্মিত ছিল। আধুনিক যুগের প্রেমের জুটির পতাকা ওড়ালেন যাঁরা তাঁরা উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন। 'সাড়ে চুয়াত্তর' ছবি দিয়ে এই জুটির শুরু। তবে লিড হিরো হিরোইন রূপে উত্তম-সুচিত্রা কে সাফল্য এনে দিল 'অগ্নিপরীক্ষা'। একেএকে 'শিল্পী','শাপমোচন','হারানো সুর','সপ্তপদী'। শেষ ছবি উত্তম-সুচিত্রা জুটির 'প্রিয় বান্ধবী'। তবে শেষদিকে যেন এই জুটির ম্যাজিক ফুরিয়ে আসছিল। মোট ৩০টি ছবিতে জুটি বেঁধে অভিনয় করেছেন উত্তম-সুচিত্রা।
উত্তমকুমার-সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় জুটির ছবির সংখ্যা আরও কিছু বেশি কিন্তু চল্লিশ পার করেনি। উত্তম-সুপ্রিয়া থেকে উত্তম-মাধবী ছবির সংখ্যা চল্লিশ পেরোয়নি। এরপরেই আসে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও অপর্ণা সেনের জুটির কথা। বসন্ত বিলাপ থেকে বসু পরিবার। সেখানেও ছবির সংখ্যা বিশাল সংখ্যার নয়। পরের নতুন যুগের নায়ক হয়ে এলেন তাপস পাল। তাপস পাল মহুয়া রায়চৌধুরী আর দেবশ্রী রায়ের সঙ্গে অনেক হিট ছবি উপহার দিলেও সংখ্যা অনেক বেশি নয়। প্রসেনজিৎ-দেবশ্রী জুটিও দর্শক নিয়েছিল। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে এই জুটির বিচ্ছেদ চিরতরে তাঁদের ক্যারিয়ারেও দুরত্ব এনে দিল।
নায়ক নায়িকার সুপ্রিম জায়গায় এবার যাঁদের নাম আসে তাঁরা প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা। উত্তম সুচিত্রা বা উত্তম সাবিত্রী র জুটি যা পারেনি প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণার জুটি তা পেরেছে। এই জুটির পঞ্চাশ তম ছবি রিলিজ করতে চলেছে ২০২৪ সালে। 'নাগপঞ্চমী' ছবি দিয়ে বুম্বা-ঋতু জুটির জয়যাত্রা শুরু হয়। এরপর মনের মানুষ,বাবা কেন চাকর,খেলাঘর থেকে শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ। হাফ সেঞ্চুরি করে ফেলেছেন এই জুটি। ছবির সংখ্যা অনেক হলেও প্রথম দিকের অনেক মেনস্ট্রিম ছবির গুণগত মান হয়তো উচ্চতর নয়। কিন্তু নব্বই দশকের খরা যুগে টালিগঞ্জ পাড়ার একমাত্র হিটমেশিন জুটি ছিলেন প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা। সিঙ্গল স্ক্রিনগুলো এই জুটিই বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। স্বপন সাহা থেকে সুজিত গুহদের তুরুপের তাস ছিল এই জুটি।
পোসেনজিৎ-ইতুপন্না থেকে প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা হতে কম কাঠখড় দুজনকে পোড়াতে হয়নি। নিজেদের নিরন্তর পাল্টে ফেলে নিজেদের বিবর্তন ঘটিয়েছেন এই জুটি। ঋতুপর্ণ ঘোষের 'উৎসব' ছবি দিয়েই যে বিবর্তনের শুরু। এরপর মাঝে দীর্ঘ বছর একসাথে ছবি করেননি প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা। ফিরলেন শিবপ্রসাদ-নন্দিতা র 'প্রাক্তন' ছবি দিয়ে। এতগুলো বছর পার করেও এই জুটির ম্যাজিক কমেনি। এরপর কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের 'দৃষ্টিকোণ' ছবিতে আরও নতুন চমকে হাজির হলেন তাঁরা। প্রাক্তন বা দৃষ্টিকোণের সময় ইন্ডাস্ট্রি বদলে গেছে,দর্শকের রুচি বদলে গেছে। নতুন রূপে প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণার ছবি হিট,ছবির সব কটি গান সুপার ডুপার হিট। 'তুমি যাকে ভালোবাসো স্নানের ঘরে বাষ্পে ভাসো' থেকে 'লক্ষ্মীটি একবার ঘাড় নেড়ে. সম্মতি দাও, আমি যাই ছেড়ে'।
বেশ কয়েক বছর বিরতির পর আবার কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবিতেই আসতে চলেছে প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা জুটি। কৌশিক গাঙ্গুলি পরিচালিত ‘অযোগ্য’ সিনেমার মধ্য দিয়ে সিনেমায় 'হাফ সেঞ্চুরি' পার করল ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ও প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের জুটি। ছবিটির শ্যুটিং শেষ। ২০২৪ সালে ছবিটি মুক্তি পাবে। ছবির ফার্স্ট লুক পোস্টার লঞ্চ হয়ে গেল পার্ক স্ট্রিটের ফ্লুরিজে।
ঋতুপর্ণা বললেন "গল্প কী বলতে পারবনা। পরিচালকের নিষেধ আছে। প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা জুটি আবারও একটা রহস্য নিয়ে আসছে। হাফ সেঞ্চুরি করে ফেললাম আমরা। অযোগ্য হতে চলেছে আমাদের পঞ্চাশ তম ছবি। আমি নিশ্চিত দর্শক নিরাশ হবেন না।”
প্রসেনজিৎও উচ্ছ্বাস নিয়ে বলেছেন, “হাফ সেঞ্চুরি বলে কথা। এই ভার বহন করার জন্য একটা সঠিক কাঁধ দরকার ছিল। সেটা অবশ্যই কৌশিক। ৫০তম সিনেমা খুব গুরুত্বপূর্ণ আমাদের কেরিয়ারে। কথা দিচ্ছি, ভালো লাগবে। অপেক্ষা করে আছি সকলের প্রতিক্রিয়ার।” এই ছবিতে আও এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা যাবে শিলাজিৎ মজুমদারকে। থাকছেন লিলি চক্রবর্তী,অম্বরীশ ভট্টাচার্য ও সুদীপ মুখোপাধ্যায়।
পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় জানালেন এই হিট জুটিকে নিয়ে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। কৌশিক 'দ্য ওয়াল' কে জানালেন " 'অযোগ্য', প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণার পঞ্চাশতম ছবি আর আমার একত্রিশ তম ছবি। কথায়-কথায় ছবিটা তৈরি হয়ে গেছে। আমায় ভাবতে বেশি কষ্ট করতে হয়নি। সহজ ভাবেই এ ছবির গল্প মাথায় এসেছে। তবে প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা আবার একসঙ্গে বেশ কয়েক বছর পর আমার ছবি দিয়ে ফিরছেন। একসাথে ছবি করতে দুজনেই সম্মতিটা ছিল বেশ বড় ব্যাপার। আমি ছবি করলেই যে দুই স্টারের ভাল লাগবে তা তো নয়! অযোগ্য ছবির গল্প যোগ্য মনে হয়েছে বলেই ওঁরা রাজি হয়েছেন। এই জুটির জন্ম মেনস্ট্রিম ছবি থেকেই। কিন্তু এখনকার দর্শক বেগমজান ঋতুপর্ণাকে দেখতে চান,দৃষ্টিকোণের ঋতুপর্ণাকে দেখতে চান,প্রাক্তন,দোসর বা দৃষ্টিকোণের প্রসেনজিৎ কে দেখতে চান। যে জন্য 'অযোগ্য' ছবিতে এই জুটিকে যোগ্য ভাবেই ফেরাতে চাই। দর্শকের চাহিদা,ভালবাসার কথা মাথায় রেখে। বদলে যাওয়া দর্শকদের রুচির সাথে যাতে আমাদের গল্পটা খাপ খাওয়াতে পারে। এটাও প্রেমের গল্প। প্রেমটা কোন আধারে আসছে সেটাই দেখার।"
আর একটা চমকপ্রদ কথা বললেন কৌশিক।"জুটি বললেই যাঁদের কথা সবার আগে মনে পড়ে, সেই উত্তম-সুচিত্রা জুটিরও কিন্তু ৫০ তম ছবি নেই। অনেক কম তাঁদের ছবির সংখ্যা। উত্তম-সাবিত্রী জুটিরও নায়ক-নায়িকা রূপে ৫০ টি ছবি নেই। বাংলাতে এই প্রথম ইতিহাস গড়তে চলেছে প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা তাঁদের ৫০ তম ছবি মুক্তি দিয়ে। এত গুলো বছর এত গুলো যুগ নিজেদের জুটির চাহিদা টিঁকিয়ে রাখা কিন্তু কম কথা নয়। আমি ধন্য আমার ছবিটাই তাঁদের জুটির ৫০তম ছবি হতে চলেছে। ঘটনাটা কিন্তু ঐতিহাসিক।"