Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
TB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তানসরকারি গাড়ির চালককে ছুটি দিয়ে রাইটার্স থেকে হাঁটা দিলেন মন্ত্রীছত্তীসগড়ে পাওয়ার প্ল্যান্টে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ! মৃত অন্তত ৯, ধ্বংসস্তূপের নীচে অনেকের আটকে পড়ার আশঙ্কা

শর্মিলা-অপর্ণার নয়নের মণি ছিলেন এই পরিচালক, নেশার কবলে পড়ে অকালে ফুরিয়ে যায় প্রতিভা

সত্যজিৎ রায় তো সাংবাদিকদের কাছে ঘোষণাই করে দিলেন, তাঁর পদাঙ্ক অনুসারী পরিচালক রূপে পার্থপ্রতিমই হবেন যোগ্য ধারক!

শর্মিলা-অপর্ণার নয়নের মণি ছিলেন এই পরিচালক, নেশার কবলে পড়ে অকালে ফুরিয়ে যায় প্রতিভা

অপর্ণা সেন, পার্থপ্রতিম চৌধুরী, শর্মিলা ঠাকুর

শেষ আপডেট: 17 April 2025 18:37

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

শহরে চলছে শর্মিলা ঠাকুরের 'পুরাতন'। শহর জুড়ে শর্মিলার ছবির পোস্টার। আশির শর্মিলা কলকাতা এসে মুখোমুখি হলেন সাংবাদিকদের। সেখানে উঠে এল শর্মিলার কেরিয়ারের শুরুর দিকের একটি ছবির নাম, 'ছায়াসূর্য'। কালো মেয়ে ঘেঁটুর চরিত্রে সকলে মনে জায়গা করে নেন শর্মিলা। কিন্তু ঘেঁটু হয়ে ওঠার পিছনে আসল কারিগর ছিলেন পরিচালক পার্থপ্রতিম চৌধুরী। প্রথম ছবি 'ছায়াসূর্য' বানিয়ে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিলেন পার্থপ্রতিম। স্বয়ং সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, পার্থপ্রতিমের হাত ধরে বাংলা ছবিতে নতুন যুগ শুরু হল। কিন্তু যত দিন এগোতে থাকল পার্থপ্রতিম চৌধুরী হারিয়ে গেলেন মধ্যমেধার পরিচালক হয়ে। বিস্মৃতির অন্ধকারে চলে গেলেন তিনি। নেশার বশবর্তী হওয়াই কি তাঁর কাল হয়েছিল?

প্রখ্যাত নট, নাট্যকার, চিত্রনাট্যকার, গীতিকার ও চিত্র পরিচালক পার্থপ্রতিম চৌধুরী।  পার্থপ্রতিম ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার এক আগ্নেয় শিল্পী। জন্ম  ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩৮। সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণালের পরবর্তী যুগে যে শিল্পনিষ্ঠ কৃতী পরিচালকেরা এসেছেন, পার্থপ্রতিম তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। নতুন যুগের একাধিক গুণী পরিচালকদের পূর্বসূরী ছিলেন পার্থ। সেই গৌরব তাঁর কাছ থেকে কেউ কোনওদিন কেড়ে নিতে পারবে না।

তবে পরিচালক নন, অভিনেতা হিসেবে প্রথম চলচ্চিত্রে পা রাখেন পার্থপ্রতিম। কানন দেবীর 'শ্রীমতী প্রোডাকশন'-এর শেষ ছবি 'ইন্দ্রনাথ, শ্রীকান্ত ও অন্নদাদিদি' ছবিতে কিশোর পার্থপ্রতিমের অভিনয় সেসময় সাড়া ফেলেছিল। কানন দেবীর সঙ্গেই অভিনয় করেছিলেন তিনি। 

এরপর 'সুন্দরম' নাট্যগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেও পার্থপ্রতিমের নাম উল্লেখযোগ্য। মনোজ মিত্র 'সুন্দরম' গোষ্ঠীতে যোগ দেন পরে। শুরুটা করেছিলেন পার্থ।

সত্যজিতের দ্বারা এতটাই তিনি প্রভাবিত ছিলেন যে 'পথের পাঁচালী'র চিত্রধর্মী মঞ্চায়ন ঘটান 'সুন্দরম'-এর প্রথম প্রযোজনা 'সেই আমাদের অপু' নাটকে। তারপর 'খাঁচা', 'শব্দরূপ ধাতুরূপ', 'চার দেওয়ালের গল্প', 'কৃষ্ণচূড়ার মৃত্যু', 'সম্রাট কনিষ্ক', 'মলাটের রং মুহূর্ত', 'ফিঙ্গারপ্রিন্ট', 'সর্পিল', 'ধারাবিবরণী' একের পর এক 'সুন্দরম'-এর প্রযোজনায় শুধু পার্থপ্রতিমেরই নাটক!

ইতিমধ্যে তিনি পরিচালক অসিত সেনের সহকারী রূপে হাতেখড়ি নিয়েছেন 'পঞ্চতপা', 'জীবন তৃষ্ণা', 'আগুন', 'দীপ জ্বেলে যাই' ছবিতে।

এরপর নিজের পরিচালনায় মাত্র একুশ বছর বয়সে প্রথম ছবি 'ছায়াসূর্য'। প্রথম ছবিতেই বাজিমাত!শর্মিলা ঠাকুরের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ চরিত্রায়ন 'ঘেঁটু'। সারাজীবনে শর্মিলা অন্য কোনও ছবিতে এত ভিন্ন ধর্মী চরিত্রে আর কখনও অভিনয় করেননি! যে ব্যাপারটি স্বয়ং সত্যজিৎ রায়কেও ভাবিয়েছিল, তা হল ঘেঁটুর প্রেমিকের চরিত্রে অরুণ মুখোপাধ্যায়ের মুখ সারা ছবিতে একটিবারও না দেখানো। বেকার যুবকের অবহেলিত চরিত্রটির মধ্য দিয়ে এই ছিল সমাজের প্রতি পরিচালকের প্রতিবাদী প্রকাশভঙ্গি। সত্যজিৎ রায় তো সাংবাদিকদের কাছে ঘোষণাই করে দিলেন, তাঁর পদাঙ্ক অনুসারী পরিচালক রূপে পার্থপ্রতিমই হবেন যোগ্য ধারক!

শর্মিলা ঠাকুরের নিজের সারা জীবনের শ্রেষ্ঠ চরিত্রের মধ্যে ছিল 'ঘেঁটু'। প্রিয় পরিচালক হিসেবে শর্মিলা সবসময় প্রথমে রাখতেন পার্থর নাম। শর্মিলাকে নিয়েই পার্থপ্রতিমের দ্বিতীয় ছবি 'শুভা ও দেবতার গ্রাস'। এরপর তনুজাকে নিয়ে 'দোলনা' ছবি করেন পার্থ। যে ছবিতেই লতা মঙ্গেশকরের বিখ্যাত গান 'আমার কথা শিশির ধোঁয়া হাস্নুহানার কলি'। এই দুটি ছবিই চিরতরে হারিয়ে গেছে বাংলা ছবির ইতিহাস থেকে। 

অন্যদিকে অপর্ণা সেনের পছন্দের তালিকাতেও ছিল পার্থপ্রতিমের নাম। দুই উঠতি নায়িকার মনের কাছাকাছি ছিলেন এই পরিচালক। নতুন প্রজন্মের ছবির কান্ডারী ছিলেন তাঁরা। পার্থপ্রতিমের 'হংসমিথুন' ছবিতে শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় আর অপর্ণা সেনের জুটি হিট করেছিল। অপর্ণা সেন পরিচালক হওয়ার পর বলেছিলেন, 'পার্থপ্রতিমের কাছ থেকেই আমার ক্যামেরার কাজ, পরিচালনার হাতেখড়ি হয়েছিল।  শুধু সত্যজিৎ রায় নন, পার্থপ্রতিমের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য আমার জীবনে।'

আরও চমকপ্রদ হল, মহানায়ক উত্তমকুমার ডিগ্ল্যামারাইজড চরিত্রে প্রথম অভিনয় করেন পার্থপ্রতিমের 'যদুবংশ' ছবিতে। নায়ক উত্তমের বাইরে অভিনেতা উত্তম প্রথম প্রকাশ পেলেন 'যদুবংশ' দিয়েই। এই ছবিতে অপর্ণা সেন আর শর্মিলা ঠাকুর দু’জনেই অভিনয় করেছিলেন। দুই বোনের ভূমিকায় দ্বৈত চরিত্রে ছিল অপর্ণার অভিনয়। 

ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে পার্থর ছবি ছিল 'শুভ কেমন আছো?' অজয় করের 'পরিণীতা' ছবির চিত্রনাট্যকারও ছিলেন পার্থপ্রতিম। 

গীতিকার রূপেও বহু গান লিখেছিলেন তিনি। দূরদর্শনের প্রথম যুগের ধারাবাহিকে গান লিখতেন পার্থপ্রতিম। 

দর্শক থেকে গুণীজনেরা, সকলেই ভেবেছিলেন, বাংলা ছবির নতুন পথিকৃৎ হবেন। কিন্তু পার্থর অন্যধারার ছবি বক্সঅফিস সাফল্য পেত না। ধীরেধীরে তাঁর চাহিদা কমতে থাকল প্রযোজকদের কাছে। নিজস্ব ধারার কাজ ছেড়ে শেষের দিকে বাণিজ্যিক মোড়কে ছবি করতে শুরু করলেন পার্থপ্রতিম। মুনমুন সেনকে প্রথম বাংলা ছবিতে নায়িকা করে 'রাজবধূ' ছবি করলেন পার্থপ্রতিম। উৎপল দত্ত, ছায়া দেবীর সঙ্গে মুনমুন স্ক্রিন শেয়ার করেন। কিন্তু এ ছবি বক্সঅফিসে দর্শক নিল না। মুনমুনকে নিয়ে বানালেন 'পূজারিণী' আর 'সরগম'। শুরুর দিকে এমন সব ভাল ছবি করেছিলেন মুনমুন পার্থর সঙ্গেই। মিঠুন-দেবশ্রী-সৌমিত্র-র 'ত্রয়ী' ছবির চিত্রনাট্যকারও ছিলেন পার্থপ্রতিম। শেষ ছবি ছিল প্রসেনজিৎ-শতাব্দীর 'মনে মনে'। 

পার্থপ্রতিম মদ্যপানে আসক্ত ছিলেন। আড্ডা বা চিত্রনাট্য পড়া মানেই মদ ছিল প্রথম উপকরণ। তার উপর ছিল অবসাদ। যা চাইছেন, তা করতে পারছেন না। করলেও দর্শক নিচ্ছে না। এসবের মধ্যেই নেশার জীবনে ধীরেধীরে ডুবে যেতে থাকলেন এই প্রতিভাবান পরিচালক। নানা ধরনের কাজ করতে গিয়ে ছবির মানও পড়তে থাকে তাঁর। খবরের বাইরে চলে যান এই পরিচালক। ১৯৯৪ সালের ৮ এপ্রিল, সবার চোখের আড়ালে নীরব প্রস্থান ঘটে পার্থপ্রতিম চৌধুরীর। 

বাংলা ছবির ইতিহাসে যাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে থাকা উচিত ছিল, প্রচারের বাইরে থেকে তিনি হারিয়ে যান বিস্মৃতির আড়ালে।


```