
শেষ আপডেট: 31 October 2022 13:44
দুজনেই তাঁরা সমসাময়িক অভিনেত্রী। কিন্তু তাঁরা ছিলেন এক পাড়ার বন্ধু। পাপিয়া অধিকারী (Papiya Adhikari) পড়তেন সাউথ পয়েন্টে আর সোনালী চক্রবর্তী (Sonali Chakraborty) পড়তেন লেক স্কুল ফর গার্লসে। কিন্তু দুজনেই ছোট থেকে নৃত্যপটীয়সী আর খুব ডাকাবুকো। তাই তাঁদের জমত ভালই।
আজ অকালে প্রয়াত হলেন অভিনেত্রী সোনালী চক্রবর্তী। সোনালীর স্মৃতিচারণে তাঁর মেয়েবেলার খেলার সাথী পাপিয়া অধিকারী।

বেদনা ভরা কণ্ঠে পাপিয়া অধিকারী 'দ্য ওয়াল'কে বললেন, 'সোনালী আমার একদম ছোট্টবেলাকার বন্ধু। মহানির্বান রোডে আমার পাশের বাড়ির মেয়ে ছিল সোনালী। আমরা একে অপরের ছাদ পেরিয়ে, উঠোন পেরিয়ে কত খেলাধুলো করেছি। ও আমার বাড়িতে কত এসেছে, আমিও ওর বাড়ি কত গেছি। আমি, সোনালী, সোনালীর বোন শ্রাবণী-- আমরা পাড়ায় একটা গ্যাং ছিলাম। একটু দূরে থাকত খেয়ালি দস্তিদার। তবে ওর বাবা জোছন দস্তিদার ওকে খুব একটা খেলতে বেরোতে দিতেন না। তখন তো পাড়ায় পাড়ায় খেলা হত। মনে পড়ছে আজ, আমরা একসঙ্গে কত চোর-চোর খেলেছি।
আমি আর সোনালী একসঙ্গে নাচও শিখতাম। 'সুরতীর্থ' বলে একটা নাচের স্কুল ছিল। সেখানেই ভরতনাট্যম শেখাতেন করবীদি। কত্থকও শেখাতেন নামকরা একজন, নামটা এখন মনে পড়ছে না। সোনালী ভীষণ ভাল ডান্সার। ওর নাচের দিকটা তেমন এক্সপ্লোরই হয়নি পরবর্তী কালে। তনুদার (তরুণ মজুমদার) ছবিতে কিন্তু নাচ দিয়েই সোনালী এসেছিল। মনে আছে তো দাদার কীর্তির অর্জুনকে! তারপর তো ও অভিনেত্রী হয়ে গেল।'

রূপে-নাচে-অভিনয়ে অনন্যা, তবু জোটেনি নায়িকার রোল! অভিমানেই বুঝি অকালে চলে গেলেন সোনালী
শঙ্কর চক্রবর্তী ও পাপিয়া অধিকারী সহকর্মী, অনেক দিনের বন্ধু। শঙ্কর-সোনালী জুটি নিয়ে পাপিয়া বললেন, 'শঙ্কর সোনালীদের বাড়িতেই থাকত প্রথমদিকে। শঙ্করকে একবার মজা করে বলেছিলাম, তোমার কপালে এত সুন্দরী বউ, বাব্বা! শঙ্কর বলেছিল, আমার চেহারাটা কি খারাপ! তখন বলেছিলাম, তুমি ঠিক আছো, কিন্তু সোনালী যে বড্ড সুন্দরী।'

খেলার সাথী, বিদায়দ্বার খোলো–
এবার বিদায় দাও।
গেল যে খেলার বেলা...।
রবীন্দ্রনাথের গানের এই লাইনগুলোই পাপিয়ার মনে ভাসছে আজ সারাদিন। আরও বললেন পাপিয়া, 'বেশ কিছু সময় ওঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। যোগাযোগ ছিল না। আজকে সকালে খবরটা পেয়ে আমি ভীষণ ধাক্কা খেলাম। ছোটবেলার সাথী চলে গেলে, আমরা যারা বেঁচে আছি, তাঁদের পক্ষে সহ্য করা কঠিন হয়ে যায়। এত বড় ধাক্কা! ভাল লাগে বলো!

রবীন্দ্রনাথের নায়িকার মতো সুন্দরী সোনালী অভিনয়, নাচ, মডেলিং-- সব করেছে দক্ষতার সঙ্গে, কিন্তু তবু সেভাবে ও সুযোগ পেল না। এত সুন্দরী, লম্বা নাক, টলটলে চোখ-- সব ছেলেরাও ওর প্রেমে পড়ত। সোনালী যদি সব বাদ দিয়ে নাচটা চালিয়ে যেত, তাহলে অনেক বিখ্যাত ডান্সারদের থেকে ভাল ডান্সার হতে পারত। সেই ক্ষমতা ওর ছিল। কিন্তু অভিনয়ে এসে গেলে সেটা তো হয়ে ওঠে না।
আর অপ্রাপ্তি কার না থাকে। শরীরটাও ঠিক ছিল না শেষের দিকে। আমাদের এখানে একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে, আর্টিস্টদের বসিয়ে রাখা। এই যে আর্টিস্টদের অপেক্ষা করানো, এটা বন্ধ হওয়া উচিত। এই সময় আমরা অন্য কাজ করতে পারি।

সোনালীদের বাড়িটাও এখন ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। পলিক্লিনিক গোছের কিছু তৈরি হচ্ছে ওখানে। সোনালীও চলে গেল, আমাদের ছোটবেলার সব স্মৃতিও মুছে যাচ্ছে। বড় ভাল মেয়ে, ওর হাসি মুখ ছাড়া অন্য মুখ দেখিনি। নতুন আর্টিস্টরা থাকলেও সিরিয়াল চলে পুরনোদের জোরে। ছোট খাটো টর্চ দিয়ে সিরিয়াল জমবে না, মশাল দরকার এক-আধটা। এটা দর্শকরা বোঝেন, কিন্তু পরিচালক-প্রযোজকরা হয়তো সকলে বোঝেন না। এসব তো আমাদের মতো সব সিনিয়র শিল্পীদেরই অপ্রাপ্তি।'
গড়িয়াহাটের স্টুডিওয় সোনালীদির ছবি দেখে ভাবতাম, এত্ত সুন্দর! স্মৃতির 'গাঁটছড়া'য় জড়ালেন তনুকা