
'বেলাইন' ছবি
শেষ আপডেট: 4 April 2024 16:00
ছবি - বেলাইন
পরিচালনা - শমীক রায়চৌধুরী
অভিনয়ে - পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রেয়া ভট্টাচার্য, তথাগত মুখোপাধ্যায়
প্রযোজনা - হরিৎ রত্ন ও মনীষা রত্ন
দ্য ওয়াল রেটিং - ৮. ৫/ ১০
অল্প চরিত্র নিয়েও যে ভাল ছবি হতে পারে তা দেখিয়ে দিয়েছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। ঋতুপর্ণ পরবর্তী যুগে অনেক নতুন পরিচালক এসেছেন। তবে ছবি আসে ছবি যায়, দাগ কাটে কম। এবার এল 'বেলাইন'। ছবির তিনটি মূল চরিত্র। এক বৃদ্ধ ও এক যুগল, যারা বিবাহিত নয় লিভ-ইন করে। এদের রোজনামচা নিয়েই এগোতে থাকে গল্প। কিন্তু মজার বিষয়, তিনটি চরিত্রের কোনও নাম নেই ছবিতে। একাকীত্ব থেকে আসে মানসিক অবসাদ, অপ্রাপ্তি আর যৌনতাহীন জীবন। সবকিছুর মিশেলে কয়েকটা দিনের গল্প বলেছেন পরিচালক শমীক রায়চৌধুরী। অথচ গল্প বলার ধাঁচ নতুন। সেটাই 'বেলাইন' ছবির বিশেযত্ব।
একাকীত্ব নিয়ে বাংলায় কম ছবি হয়নি। কিন্তু এ ছবিতে একাকীত্ব থাকলেও রয়েছে এক ছকভাঙা প্রয়াস। এক বৃদ্ধ অবসর জীবনে একাই নিজের মতো থাকেন। তাঁর অবসরের সঙ্গী বাংলা সিরিয়াল। সিরিয়ালের চরিত্রগুলিই যেন তাঁর একলা ঘরের সদস্য। সিরিয়ালে তাঁর প্রিয় চরিত্র সতী। এ হেন এক বৃদ্ধর কাছে ক্রস কানেকশনে বেলাইন হয়ে চলে আসে এক তরুণীর নম্বর। বৃদ্ধ চুপচাপ কান পেতে মেয়েটির দিনযাপনের গল্প শুনে যেতে থাকেন। মেয়েটিও একা। সম্পর্কে থাকলেও বিবাহিত নয়, প্রেমিকের সঙ্গে লিভ-ইনে থাকে। বৃদ্ধের একাকীত্বে জড়িয়ে আছে ফেলে আসা জীবনের যৌনতা। আর মেয়েটির একাকীত্বে জড়িয়ে রয়েছে অপূর্ণ যৌনতা। বেলাইনে বৃদ্ধটির স্বপ্নপ্রেয়সী হয়ে ওঠে মেয়েটি। যদিও মেয়েটি বৃদ্ধের অবস্থান টের পায় না। মেয়েটির শিৎকার শব্দে বৃদ্ধের সন্ন্যাস জীবনে উঠতে থাকে পাল তোলা ঢেউ। কান পেতে কপোত-কপোতীর গোপন গল্প শোনা বৃদ্ধের নেশা হয়ে দাঁড়ায়। প্রাত্যহিক সমস্যা থেকে প্রতিদিন তাঁর বাড়িতে আসা বন্ধুরাও বৃদ্ধের কাছে তুচ্ছ হয়ে যেতে থাকে। কানে কানে কামযাপনে পৌঁছে যায় বৃদ্ধের মন। অথচ বাস্তবে কি এমনটা ঘটতে পারে? নাকি সবটাই স্বপ্নদৃশ্য?
এমনই আলো আঁধারি পথে আমাদের হাঁটাতে থাকেন পরিচালক। তবে ছবির ক্লাইম্যাক্স শেষে গিয়ে আপনাদের বেলাইন করে দেবে। 'বেলাইন' ছবিটি সেভাবে রিলিজের সময় প্রচারের আলোয় না এলেও নিজগুণে ছবিটি রিলিজের পর শিরোনামে উঠে আসার ক্ষমতা রাখে। কারণ পরিচালক শমীক রায়চৌধুরীর গল্প বলার ধরন এবং পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও শ্রেয়া ভট্টাচার্যর বলিষ্ঠ অভিনয়। কঠোর ভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের তকমাতে থাকা এই ছবি বাংলা ছবির ঘরানায় কিন্তু বাঁকবদল এনেছে। এ ধরনের সাহসী উপস্থাপন বাংলা ছবিতে বিরল। দেড় ঘন্টার ছবিটি নতুন দিগন্তে পৌঁছে দেয়। যদিও সবটাই বাস্তব অবাস্তবের খেলা তবু ছবিটি ছক ভেঙেছে।
পরিচালক শমীক রায়চৌধুরী ছবির বুনোট থেকে ছবির টেকনিক্যাল দিক ভীষণ ভাল সামলেছেন। বাংলা ছবিতে এত স্মার্ট কাজ সেভাবে দেখা যায় না। তিনি লম্বা দৌড়ের ঘোড়া তাঁর নির্মান তা প্রমাণ করে।
অভিনয়ে পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা প্রথমেই বলতে হয়। এতদিন কমেডিয়ান হিসেবে পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে একটা ছাপ পড়ে গেছিল তা যেন মুছে দিলেন পরিচালক। জানি না এই ছবি প্রেক্ষাগৃহ কতটা ভরাবে বা পুরস্কারের দৌড়ে কতটা জায়গা পাবে? কিন্তু 'বেলাইন' পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে শেষ বসন্তে সেরা অভিনেতার পুরস্কার এনে দিতে পারে। এতটাই খেটে অভিনয় করেছেন তিনি। এমন চ্যালেঞ্জিং কাজে তাঁকে আগে আমরা দেখিনি। ছবিতে কি কমেডি নেই? আছে। কিন্তু সংলাপের ঘটনাপ্রবাহে এমন ভাবে কৌতুক এসেছে বিশেষত পরাণের ঠোঁটে তা মন ভরায়।
শ্রেয়া ভট্টাচার্য আদ্যন্ত একজন বলিষ্ঠ অভিনেত্রী। 'মেয়েবেলা'র মতো মেনস্ট্রিম সিরিয়ালেও শ্রেয়া নজর কেড়েছিলেন। 'বেলাইন' ছবিতে শ্রেয়া মুখ্য চরিত্রে এবং অবশ্যই এটা তাঁর শ্রেষ্ঠ অভিনয়। ছবিতে যেমন শ্রেয়া একাকীত্বের শিকার তেমনই তিনি হয়ে ওঠেন 'যৌনদেবী'। কিন্তু পরিচালক যৌনদৃশ্য ছবি জুড়ে রাখলেও তা কখন বিকৃত হতে দেননি। শ্রেয়া সত্যি মুগ্ধ করেছেন । সাহসী থেকে আটপৌরে সবেতেই তিনি অপরাজিতা।
ছবির তৃতীয় চরিত্র, তথাগত মুখোপাধ্যায়।শ্রেয়ার সঙ্গেই তাঁর সমস্ত অভিনয়। এতটা দাপুটে অভিনেত্রীর সঙ্গে তথাগত কিন্তু রীতিমতো টক্কর দিয়েছেন। শয্যাদৃশ্য থেকে মানে-অভিমানে নজর কাড়লেন তথাগত। বেশ কিছু দৃশ্যে ক্যামেরার সামনে তিনি খুব সাহসী।
তবে সায়ন ঘোষের থেকে আরো বেশি আশা ছিল। যেখানে একই সাথে রিলিজ 'ও অভাগী' ছবিতে সায়ন দুর্দান্ত সেখানে 'বেলাইন' ছবিতে তিনি চড়া অভিনয়ে সীমাবদ্ধ। বৃদ্ধের বন্ধু মৃগী রোগীর চরিত্রে সৌরভ ঘোষ দাগ কাটলেন। টিভি মেকানিকের চরিত্রের অভিনেতাও সপ্রতিভ। সুদর্শন সন্দীপ ভট্টাচার্য বেশ স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় করেছেন।
বেলাইন ছবির আরো একটি ভাল দিক এই ছবির সংগীত পরিচালনা। গানের ব্যবহার থেকে এমন আবহ বাংলা ছবিতে চট করে দেখা যায় না। বিশেষত শাম্মি কাপুর নাচে শ্রেয়ার নাচ ও কোরিওগ্রাফি অনবদ্য।
কিছু ছবি থাকে যা চুপ করে অনুভব করার মতো। ভাষায় প্রকাশ করলে তার থেকে অনেক অর্থ বেরতে পারে। 'বেলাইন' তেমন একটা ছবি। এ ছবির আমজনতার ছবি নয়। এ ছবি কতদিন প্রেক্ষাগৃহ রাখবে! কতদিন দর্শক ভরবে তার নিশ্চয়তা নেই। কেউ আবার শুধু যৌনতার স্বাদ নিতেই যাবে। স্বমেহন থেকে শরীরী খেলার দৃশ্য গুলি শিল্প নৈপুন্যে এঁকেছেন পরিচালক।
কিন্তু এমন এক অভিনব প্রয়াসেও যে বাংলা ছবি করা যায় তা দেখালেন পরিচালক। এই ছবির প্রযোজক অবাঙালি কিন্তু তিনি মুক্তমনা বলতেই হয়। এমন একটি কাজ করার স্বাধীনতা তিনি পরিচালককে দিয়েছেন। ছবির প্লট বেলাইন হলেও বাংলা ছবি আরো এক ধাপ এগোল লাইনেই, বেলাইনে নয়।