
সত্য-কাবেরী
শেষ আপডেট: 11 January 2025 15:49
ফিল্ম রিভিউতে সব লিখতে নেই। কিছু-কিছু লিখতে হয়। আর থ্রিলার ছবির রিভিউয়ে ভেঙে-ভেঙে, কিছু-কিছু লিখতে হয়। কিন্তু সে ছবি যদি থ্রিলার-ই না হয়। সে ক্ষেত্রে কী করতে হয়, তা অবশ্য জানা নেই। অগত্যা, দেখেটেখে বুঝেসুঝেই লেখা এগনো যাক। মৈনাক ভোমিক ‘নতুন’ কিছু করতে চেয়েছেন। ‘ফিল গুড’ বিষয়আশয় থেকে বেরিয়ে ওঁর কথা মতো ‘অন্য জঁর’ চেষ্টা করেছেন। যা, কাবিলে তারিফ!
Ritwick Chakraborty ঋত্বিক (সত্য গঙ্গোপাধ্যায়) এবং তাঁর স্ত্রী শোলাঙ্কি Solanki Roy (কাবেরী গঙ্গোপাধ্যায়) যাদের নিয়ে মূলত গল্প এগোয়, তারা সাধারণ। আর্থিক অনটনে দিন গুজরান করছে। সত্য সাংবাদিক, তাও ‘সত্যতা’ তাঁর রিপোর্টে ঠাঁই পায় না। আর কাবেরী স্কুল শিক্ষিকা ছিল, কিন্তু সেই চাকরি ছেড়েছে সে। এ মতো অবস্থায় দুম করে তাঁদের জীবনে তৃতীয় মানুষের অনুপ্রবেশ। সঙ্গে প্রচুর টাকায় লাল স্যুটকেস।
ঘটনাপ্রবাহে একের পর এক অঘটন, এবং তাতে জড়িয়ে পড়ে দম্পতি। ঘটনায় যোগ দেয় রাজনীতিবিদ, লোকাল মস্তান, এবং দুই ছিঁচকে ‘লাল-নীল’। তারপর দ্বিতীয় খুন এবং তৃতীয় খুন যা একেবারে কারণহীন। শেষের দিকে পরপর খুন...খুন...খুন...খুন...খুন! এবং তারপর এক নতুন ভালর কিছুর শুরু। গল্প মোটামুটি এই...
ছবির ‘কম ভাল’ এবং ভালর দিক নিয়ে এগনো যাক।
থ্রিলার ছবি। ডার্ক থ্রিলার নয়। ডার্ক থ্রিলার ‘বিরক্তিকর’ হয়ে ওঠে। ভয়ের তীব্রতা অনুভব করায়। সাসপেন্সের ‘ঘোমটা’ আস্তে আস্তে উন্মোচন হয়। তা এখানে নেই। ‘সহজ’ শব্দটি থ্রিলার ছবির সঙ্গে যায় না। প্রেমের সঙ্গে যায়। ঠিক যেমন মৈনাকের ‘বিবাহ ডায়েরিজ’-এর সঙ্গে গিয়েছিল। যতটা রক্তারক্তি, ‘গায়ে কাঁটা ধরানো’ সিন দেখিয়ে ট্রেলর তৈরি হয়েছিল, সেই লোম খাড়া করা সিন থিতিয়ে গিয়েছে বড়পর্দায়। গল্পের বুনোট আরও জমানো জরুরি ছিল।
ছবি যত এগোয়, সব যেন খাপে-খাপ হয়ে মিলে যায় সব। রহস্যবিহীন। ইনটেন্স মুহূর্ত অর্থাৎ ‘এবার কী হবে?’ এমন দৃশ্য থ্রিলারে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, ছবিতে তা নেই। ‘সাবপ্লট’ অর্থাৎ ছবির বাকি চরিত্রগুলোর জীবনের গল্পগুলো একেবারে স্বস্তি দেয়নি। শুধুমাত্র স্বস্তিকার গল্পটি ছাড়া। এবং শেষমেশ যে বিষয়ে মৈনাক ‘তুখোড়’ ছিলেন তা হল সংলাপ। ওটাই ছবিতে ‘মেজর মিসিং’। টানটান কিছু সংলাপ, কনভার্সেশনাল কিংবা সলিলকিও হতে পারতো তা, নেই। ‘মোনোলগ’ নিয়ে বেশ দারুণ কাজ করেছেন মৈনাক ভৌমিক। এই ছবিতে সেটা নেই।
এবার ‘কম ভাল’ কাটিয়ে ভালর দিকে ফোকাস করা যাক।
মৈনাক ভৌমিক প্রথম ‘অন্য’ জঁর চেষ্টা করেছেন। এবং প্রথমবারের চেষ্টায় অনেকটাই থ্রিলার হয়েছে। আর বাকি ‘ভুলত্রুটি’ উপেক্ষা করা যায়। ‘ডিজাইন’ নিয়ে ট্রেলরে যা লেখা ছিল বড়-বড় করে। তা হোক্স নয়। ছবিতেও স্পষ্ট। সৌজন্যে মৈনাক ভৌমিক। ‘সত্য গঙ্গোপাধ্যায়’ সহজ, সরল, নিপাট ভদ্রলোক। অভিনয়ে ঋত্বিক চক্রবর্তী। সাবলীল অভিনয়, আলাদা করে চোখে পড়ানোর মতো তিনি কিছু করেননি। উপযুক্ত সঙ্গত দিয়েছেন ‘কাবেরী’ শোলাঙ্কি রায়।
‘পতির পুণ্যে, সতীর পুণ্য’, সেই পুণ্যলাভে তিনি বারবার পাশে থেকেছেন। বাকি যে চরিত্র মৈনাক সাজিয়েছেন, তারা সবাই অসৎ, এখানে গ্রে চরিত্র নেই। এবং এই অসৎ চরিত্ররাই প্রত্যেক সিনের প্রতি ‘সৎ’ থেকেছেন। বিমল গিরি, লোকনাথ দে, সুব্রত দত্ত, যুধাজিৎ সরকার, দেবপ্রিয় মুখোপাধ্যায় প্রত্যেকেই, নিজেদের চরিত্রকে বুঝেছেন, অভিনয় করেছেন। স্পেশালি মেনশন করতে হয় সুজন নীল মুখোপাধ্যায়ের নাম। তিনি ‘বড়’ পুলিশ অফিসারের চরিত্রে আলাদা করে নজর কেড়েছেন। চরিত্রের এক ‘অদ্ভূত’ স্টাইলাইজেশন, ধরে এগিয়েছেন দৃশ্যে। চোখ ঢুলুঢুলু। মাথা নামানো। তিতিবিরক্ত। তবে রাগছেন না, যা করছেন দৃশ্যে তা মার্জিত, একেবারে উচ্চকিত নয়। স্যাভির আবহসঙ্গীত থ্রিলারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুরের সঙ্গে সাসপেন্সের ঘনিষ্ঠতা ছিল। অনুপম রায়-প্রশ্মিতার গান সিনের সঙ্গে সাদৃশ্যেই সাজানো হয়েছে। ‘কষ্ট কমে যায়’ গানটি দারুণভাবে দৃশ্যে ব্যবহার হয়েছে।
মৈনাক ভৌমিক তাঁর প্রথম ‘নতুন রকমের’ ছবিতে আলাদা কিছুর ছাপ ফেলতে চেয়েছেন। পেরেছেন। খানিকটা পারেনওনি। শেষমেশ, সব ঠিকঠাক হয়ে যাওয়াতেই মিলে যায় পুর্বে মৈনাক পরিচালিত ‘একাধিক’ ছবির ক্লাইম্যাক্স। ‘ফিলগুড’ অনেকটা সব ভাল, যার শেষ ভালর মতো। এই ছবিতেও অন্যথা হয়নি। ‘ভাগ্যলক্ষ্মী’র লক্ষ্মীলাভ হবে না? ভাগ্য ভাল হবে! তা জানতে ছবিটি দেখতে পারেন। এটুকুই।
পুনশ্চ: ‘চিনি’র মতো এই ছবি হয়নি। ‘বিবাহ ডায়েরিজ’-এর মতো নয়। মৈনাকের কাছে ‘নতুন ধরণের’ ছবি হয়েছে। দর্শকের কাছে নতুন ছবি নয়। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে ওটিটি কন্টেন্ট যাঁরা গ্রোগ্রাসে মুগ্ধতায় গিলছে, এই ছবির অনেক কিছুই আগেভাগে বুঝতে পারবেন। মৈনাক ‘জেন ওয়াই’ ফিল্মমেকার। আশা করা যায় পরেরবার আরও ভাল করবেন। করবেনই।