
শেষ আপডেট: 20 December 2023 17:35
ছবি- চালচিত্র এখন (KIFF বিশেষ জুরি অ্যাওয়ার্ড জয়ী)
প্রদর্শন- ২৯তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব,২০২৩
পরিচালনা- অঞ্জন দত্ত
অভিনয়ে- অঞ্জন দত্ত, শাওন চক্রবর্তী,সুপ্রভাত দাস,বিদীপ্তা চক্রবর্তী
প্রযোজনা- অঞ্জন দত্ত ও নীল দত্ত
সঙ্গীত- নীল দত্ত
মৃণাল সেন বাংলায় রামায়ণ প্রসঙ্গে বলেছিলেন "কৃত্তিবাস ওঝা বড় কবি সন্দেহ নেই, কিন্তু কৃত্তিবাস ওঝা বাল্মিকীর রামায়ণ হুবহু অনুবাদ করেছেন। কিন্তু মাইকেল মধুসূদনকে আমি অনেক অনেক বড় কবি বলে মনে করি, তিনি রামায়ণের একটি বিশেষ অংশই শুধু নেননি, He invested this with contemporary attitudes."
মৃণাল সেনের এই কথা প্রযোজ্য অঞ্জন দত্তের 'চালচিত্র এখন' ছবির ক্ষেত্রে। এ ছবিকে বলা যায় মেকিং অফ চালচিত্র। আশির দশকের কলকাতাকে অঞ্জন এখনকার কলকাতাতেও প্রাসঙ্গিক করে তোলার কাজে সফল হয়েছেন।
মৃণাল সেন সাতের দশকে যেমন 'কলকাতা ট্রিলজি' নিয়ে তিনটি ছবি বানিয়েছেন তেমন আশির দশকের শুরুতেই বানিয়েছেন মধ্যবিত্ত ট্রিলজি। ‘একদিন প্রতিদিন’-‘চালচিত্র’-‘খারিজ’। এই তিনটি ছবিতে মৃণাল আটপৌরে মধ্যবিত্তদের গল্প বুনেছেন। ভাড়া বাড়ির বারো ঘর এক উঠোন, উঠোনে উনুনের ধোঁয়া থেকে ভাড়াটে মধ্যবিত্তের স্বপ্নপূরণ থেকে স্বপ্নভঙ্গের খণ্ডচিত্র উঠে এসেছে মৃণালের এই তিনটি ছবিতে। 'একদিন প্রতিদিন' যতটা আলোচিত, অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত ছবি ১৯৮১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'চালচিত্র'। এই ছবিটি নিয়ে তখন তেমন ঝড় ওঠেনি, সেভাবে বক্সঅফিসেও সাফল্য পায়নি। কিন্তু সেই ছবির বানানো নিয়েই তৈরি অঞ্জনের 'চালচিত্র এখন' ছবিটি ২০২৩ সালে এসে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের পরই ঝড় তুলল। 'চালচিত্র' ছবিতেই মৃণাল সেনের আবিস্কার ছিলেন অঞ্জন দত্ত। তথাকথিত বাঙালি হিরোদের রোম্যান্টিক চেহারা অঞ্জনের ছিল না। কিন্তু জহুরির চোখ হিরে চিনতে ভুল করেনি। অঞ্জনের অভিনয় যেন বাংলা চলচ্চিত্রে এক বিপ্লব ঘটিয়েছিল।
কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে গত ১০ ডিসেম্বর নন্দন প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হল অঞ্জন দত্ত পরিচালিত ছবি 'চালচিত্র এখন'।
হাউসফুল নন্দন দেখে ছবির শুরুতেই অঞ্জন দত্তর অকপট স্বীকারোক্তি "মৃণালদার ছবি দেখতেও এত দর্শক হত না, যতটা আজ মৃণালদাকে নিয়ে বানানো ছবি দেখতে হয়েছে।" এ কথা সত্যি, 'চালচিত্র' সহ মৃণাল সেনের অনেক ছবিই দর্শক পছন্দ করেনি সেভাবে। অথচ ছবিগুলি সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে ছিল। আবার হয়তো সেটাই ছবিগুলির ব্যর্থতার কারণ।
কেমনভাবে নবাগত অঞ্জন দত্তকে খুঁজে বের করে চলচ্চিত্রে আনেন মৃণাল সেন, সেই গুরু-শিষ্যর বোঝাপড়ার গল্পই বোনা হয়েছে এই ছবিতে। 'চালচিত্র এখন' ছবি নিঃসন্দেহে অভিনেতা অঞ্জন ও পরিচালক অঞ্জন দুজনেরই শ্রেষ্ঠ ছবি। দর্শকের সঙ্গে পিছনের সারিতে বসে অঞ্জন দত্ত নিজেকে মৃণাল সেন রূপে পর্দায় দেখছিলেন। অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে পর্দার নানা আলো যখন দর্শকাসনে বসা অঞ্জনের মুখে পড়ছে তখন দেখা যাচ্ছে অঞ্জনের চোখ গুরু মৃণাল সেনের জন্য কতটা ছলছলে। যেন পরিচালক অঞ্জনের সত্তরের স্বপ্নপূরণ।
এ চালচিত্র এখন ছবিতে মৃণাল সেনের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অঞ্জন দত্ত। ছবিতে তাঁর নাম কুণাল সেন। এখানে মৃণাল সেন পুত্রের নামটি মৃণাল সেনের নামে ব্যবহার করেছেন অঞ্জন, যা বেশ সুচারু প্রয়োগ বলেই মনে হয়। অভিনয় প্রসঙ্গে একথা কথা বলতেই হবে। এই ছবিতে কখনওই জোর করে মৃণাল সেন হয়ে উঠতে চাননি অঞ্জন। অল্প কিছুটা প্রস্থেটিক মেক আপ নিলেও মৃণাল সেনের কণ্ঠে কথা না বলে নিজ কণ্ঠেই অঞ্জন কথা বলেছেন, যা ছবিতে আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে।
মৃণাল সেনকে অন্তরে বাহিরে যতটা কাছ থেকে দেখেছেন, বুঝেছেন অঞ্জন দত্ত, তা বোধহয় এ যুগের আর কোনও পরিচালকই দেখেননি। বডি ল্যাঙ্গোয়েজ থেকে মানসিক টানাপোড়েনে তাই অঞ্জন অবিকল মৃণাল হয়ে উঠতে পেরেছেন। ছবিতে তাঁর সংলাপের পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে কমেডি। অভিনয়ে যতটা, পরিচালক অঞ্জন ততটাই ঋদ্ধ করেছেন আমাদের। আমার মতে অঞ্জন দত্তের পরিচালনায় ও অভিনয়ে এতদিন পর্যন্ত তাঁর সেরা ছবিটি ছিল 'দত্ত ভার্সেস দত্ত'। যেখানে নিজের বাবার সঙ্গে দ্বন্দ্বকে পর্দায় তুলে আনেন অঞ্জন। এবার গুরুকে পর্দায় আনলেন তিনি। চালচিত্র এখন ছবিতে মৃণালের চালচিত্র ছবির কোনও দৃশ্য ব্যবহার করেননি অঞ্জন। ছবি তৈরির বাইরের গল্প বলে গেছেন। অনেক পরিচালকই এমনটা করতে সাহস পান না।
অভিনেতা অঞ্জন ও পরিচালক অঞ্জনের আরও একটি সন্ধিক্ষণ এই ২০২৩। কারণ, মৃণাল সেনের মধ্যবিত্ত ট্রিলজির শেষ ছবি 'খারিজ'-এর দ্বিতীয় ভাগ 'পালান' কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের পরিচালনায় মুক্তি পেয়েছিল এই বছররেই কয়েক মাস আগে। যেখানে অঞ্জন নিজের চরিত্রটির পরিণত রূপ আবার পর্দায় বাস্তবায়িত করেছেন। খারিজের অঞ্জন, পালানের অঞ্জন, চালচিত্রের অঞ্জন এবং চালচিত্র এখন-এর অঞ্জন, চারটি রূপ একাই অসামান্য দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন অঞ্জন দত্ত, যা কার্যত ঐতিহাসিক। এতগুলো দশক পার করেও অঞ্জন দত্ত ফুরিয়ে যাননি। সত্তর পেরিয়ে তিনি শ্রেষ্ঠ উপহার 'চালচিত্র এখন' তুলেদিলেন সিনেপ্রেমীদের হাতে।
এই ছবিতে অঞ্জন দত্তের সেরা আবিস্কার অভিনেতা শাওন চক্রবর্তী। তিনি অঞ্জন দত্তর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন, ছবিতে তাঁর নাম রঞ্জন দত্ত। শাওন কিন্তু একেবারেই নবাগত অভিনেতা নন। অনেক চলচ্চিত্রে পার্শ্বচরিত্রে করার পাশাপাশি 'মেয়েবেলা' সিরিয়ালে টিটো চরিত্র করে সবার কাছেই চেনা মুখ। কিন্তু এমন তো কত অভিনেতাই আসে যায়, ফুরিয়ে যায়। কিন্তু শাওনকে বড় পর্দায় প্রথম এমন চমকের সঙ্গে পেশ করলেন অঞ্জন দত্ত, যা আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর জন্য এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল। সেই 'চালচিত্র' থেকে দূরদর্শনের 'চরিত্রহীন' সিরিয়ালের অঞ্জন দত্তকেই যেন পর্দায় দেখা গেল আবার। সেই কাঁধ ঝাকানো, সেই তর্কের মাঝে হঠাৎ রাগ, সেই দমকা হাওয়া, সেই দার্জিলিঙের সঙ্গে কলকাতার দ্বন্দ্ব।
শাওনের সংলাপ যেন এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মনের কথা। যখন এক আবেগঘন দৃশ্যে রঞ্জন-রূপী শাওন অঞ্জন মৃণালকে বলে, "আপনি তো আর আপনার পরের সিনেমাতে আমাকে নেবেন না কারণ আমি কমিউনিস্ট নই।" তখন মৃণালের উত্তর "আমি ভাল অভিনেতাকে ছবিতে নিই। তুমি কমিউনিস্ট নও, ভাল অভিনেতা বলেই নিয়েছি।"
অঞ্জনের স্ত্রী ছন্দা দত্তের চরিত্রে মেঘলা দাশগুপ্তর উপস্থিতি বেশ মানানসই। গীতা সেনের চরিত্রে মনে দাগ কাটবে বিদীপ্তা চক্রবর্তীর অভিনয়। বিদীপ্তা গীতা সেনকে নকল করেননি বা গীতা হয়ে উঠতে চাননি। সংলাপ আর মমত্ববোধেই গীতাকে তুলে এনেছেন পর্দায়। যখন অঞ্জন গীতাকে বলে, আমি বিশ্রাম নিলে আপনিও বিশ্রাম নিন। রান্না করছেন কেন।! বিদীপ্তার উত্তর, "আমার এসব অভ্যেস আছে।" মৃণাল সেনের মতো আপনভোলা মানুষের সংসারটাকে কত যত্নে কত শ্রমে অভিনেত্রী গীতা সেন ধরে রেখেছিলেন, তা যেন বিদীপ্তার অভিনয়ে স্পষ্ট।
আরও এক অভিনেতার কথা না বললেই নয়। তিনি সুপ্রভাত দাস। মৃণাল সেনের ক্যামেরাম্যান মহাজনের চরিত্রে অনবদ্য সুপ্রভাত। লুক থেকে অভিনয়ে অঞ্জন দত্তকে যোগ্য সঙ্গত করেছে তাঁর অভিনয়। গাম্ভীর্য থেকে ব্যক্তিত্বে মন জয় করে নিলেন অভিনেতা। এই সুপ্রভাতও তো অঞ্জনের এক সময়ের আবিস্কার। মৃণাল সেনের ম্যানেজারের চরিত্রে আবারও তাক লাগিয়ে দিলেন শুভাশিস মুখোপাধ্যায়।
শ্রীলা মজুমদারের চরিত্রে কঙ্কনা হালদার যথাযথ। গলার স্বরও শ্রীলার মতোই মানানসই।
মৃণাল সেনের ছবির মতোই চালচিত্র এখন-এ ফ্রিজ শট রয়েছে। তার কৃতিত্ব সম্পাদক অর্ঘ্যকমল মিত্রের।
তবে ছবিতে কি খারাপ কিছুই নেই? সে অর্থে খারাপ নেই বললেই চলে। তবে অনুপ কুমারের চরিত্রে গায়ক রূপঙ্কর বাগচীকে একেবারেই মানেনি। উচ্চতা,ব্যক্তিত্ব থেকে কথা বলার ধরন, কোনও কিছুতেই রূপঙ্করকে অনুপ কুমার ভাবা যায় না। না আছে অনুপ কুমারের আইকনিক গোঁফ। তবে অঞ্জনের প্রশংসা প্রাপ্য কারণ মৃণাল সেনের সংসার দেখাতে গিয়ে অনুপ কুমারের অবদান অঞ্জন ভুলে যাননি। যখন মৃণাল সেন মৃণাল সেন হননি, তখন মৃণালের অভাবের সংসার শ্যালক অনুপ কুমারের টাকাতেই চলত অনেকটা। পেশাদারি রঙ্গমঞ্চ থেকে চলচ্চিত্রে অনুপ কুমার লেজেন্ড। অঞ্জনের ছবিতে এই প্রথম উল্লেখ পাওয়া গেল অনুপ কুমারের।
অতি অভিনয়ের বদনাম থাকলেও মৃণাল সেনের কোনও কোনও ছবিতে অনুপ কুমার ছিলেন। আর উৎপল দত্তের মতো ব্যক্তিত্বের চরিত্র পর্দায় আনা কিন্তু সহজ কথা নয়। সে চেষ্টা অঞ্জন করেছেন। কিন্তু পরিচালক অভিনেতা শেখর দাস উৎপল দত্ত হয়ে উঠতে পারেননি। মার খেয়ে গেছেন ভাঙা হাস্কি কণ্ঠে।
এই ছবিতে গান একটা সম্পদ। অঞ্জন ছবির সময়দৈর্ঘ্যের কারণে যা বলে উঠতে পারেননি, তা স্পষ্ট হয়েছে গানে। নীল দত্তর মিউজিক অনবদ্য।নাইন্টিজের ক্যাসেট যুগ যেন ফিরে আসে এ ছবির গান শুনতে শুনতে। বেলা বোস, কালো মেম, রঞ্জনাদের স্মৃতি ফেরাবে এই ছবির গান।
ছবির নানা দিক বললাম, তবে 'চালচিত্র এখন' ছবির একটি দৃশ্য সবথেকে বেশি মন ছুঁয়ে গেছে, সেটির কথা না বললেই নয়। মৃণাল সেনের ইউনিটের ম্যানেজার চরিত্রে শুভাশিস মুখোপাধ্যায় বলছেন, "ওরে সবার খাওয়া হয়েছে কিনা কেন জিজ্ঞেস করি জানিস! মৃণাল সেন ছবি শুরু করলে টেকনিশিয়ান থেকে বহু মানুষের পেট ভরে ভাল খাবার খাওয়ার সুযোগ হয়।" পর্দায় ভেসে ওঠে ছবিতে জড়িত মানুষেরা কীভাবে তৃপ্তি করে খাচ্ছেন দুপুরের খাবার। এই যে মানুষ মৃণাল সেনকে অঞ্জন দত্ত দেখালেন ২০২৩-এ দাঁড়িয়ে, তার চেয়ে ভাল শ্রদ্ধার্ঘ্য আর কী হতে পারে!বলতে দ্বিধা নেই অঞ্জন যেভাবে মৃণাল সেনের জীবনের বেশ কিছু খণ্ড সময় পর্দায় আনলেন, এমন জীবন-ছবি আর কেউ বানাতে পারবেন কিনা সন্দেহ। কুর্নিশ অঞ্জন দত্তকে!