
শেষ আপডেট: 9 October 2023 19:13
নারী আর দুর্গা নাকি এক ও অভিন্ন। নারী মানেই শক্তিরূপিণী, দশভূজা- এসব কথা যেন মিথ হয়ে গেছে সমাজে। পুজো এলেই নারীকে দেবীত্মে উত্তরণ করানোর মাত্রা যেন আরও বাড়তে থাকে। কিন্তু দুর্গা পুজো মানে কি শুধুই নারীর পুজো? সেখানে পুরুষ শুধুই ভিলেন? পুজো কি নারী-পুরুষের দ্বন্দ্ব, নাকি অশুভর বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়গান?
চিরকালের এই বিতর্ক নিয়েই 'দ্য ওয়াল'-এর পুজো আড্ডায় মুখ খুললেন ‘অল বেঙ্গল মেন’স ফোরামের প্রধান ও পুরুষ-অধিকার নিয়ে লড়াই করা নারী শ্রীমতী নন্দিনী ভট্টাচার্য।
নন্দিনী ভট্টাচার্য এক ব্যতিক্রমী নারী। নারীবাদের যুগেও তিনি অবহেলিত, শোষিত পুরুষদের হয়ে সোচ্চার হয়েছেন। তিনি বুঝেছেন, গার্হস্থ্য হিংসা, অত্যাচারের শিকার হয় এ সমাজের পুরুষও, ব্যথা-যন্ত্রণা-মানসিক টানাপড়েনে মহিলাদের মতোই কাঁদে তারাও। তাই তাদের হয়ে লড়াইয়ের ময়দানে নেমেছেন নন্দিনী। তিনিও কি এই সমাজের একজন দুর্গা নন? পুরুষতান্ত্রিক সমাজ আর পুরুষদের জন্য সমাজের তফাত নিয়ে মুখ খুলেছেন তিনি।
পুরুষও আজ দুর্গা
নন্দিনীর কাছে দুর্গা মানেই নারী নয়। অসুর মানেই পুরুষ নয়। তাঁর মতে, দুর্গা পুজো আদতে শুভ-অশুভর মধ্যে দ্বন্দ্বের ধারণা। 'এই কথাটাই আমরা ভুলে গেছি। মা দুর্গাকে যদি আমরা আশ্রয়দাত্রী মনে করি সেটা কিন্তু শুধু উনি নারী বলে নয়। সেই যুক্তিতে তো বহু পুরুষই তো আশ্রয়দাতা। তাঁরা কেন দুর্গা নয়? শিশু অধিকার কর্মী ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী কৈলাশ সত্যার্থী কি দুর্গা নন? পথশিশুদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন যে পুরুষ, তিনি কি দুর্গা নন?' জানতে চান নন্দিনী।
অসুর মানেই শুধু পুরুষ?
নন্দিনী বললেন, 'ভারতে এই যে নারী পাচার চলে, সেইসব চক্রের মাথায় কিন্তু বসে আছেন বিভিন্ন নারী। আগ্রাওয়ালি বলে আলাদা শব্দ আছে। যারা এই ব্যবসা চালায় তাদের হোতা কিন্তু মহিলারাই। এইসব মাসিরা অসুর নয়? ব্যবসা করছে, সেটা নিয়ে আমার কথা নয়। কিন্তু নারী নির্যাতন তো হচ্ছে যুগের পর যুগ।
যেসব পুরুষ শিল্পপতি, হাজার হাজার মানুষের অন্নসংস্থান করছেন, তাঁরা কেন দুর্গা নন? বলা হচ্ছে অসুর পুরুষের প্রতীক। তাহলে বহু মহিলাই তো আছেন যাঁরা বাড়ির বউকে পুড়িয়ে মেরেছে। বহু ননদ বৌদির গায়ের গয়না কেড়ে নিয়েছে। পুত্রবধূর গায়ে বহু শাশুড়ি অ্যাসিড ঢেলে দিয়েছে কিংবা কেরোসিনে পুড়িয়ে মেরেছে। শুধুমাত্র ছেলের পাতেই নাকি বড় মাছের টুকরো তুলে দেওয়া হচ্ছে। সেটা বাবা দেন কি? মা-ঠাকুমা-পিসি, এঁরাই তো দিয়েছেন। তারাও তো অসুরেরই প্রতীক।
ছেলেদের মা এবং বউয়ের মধ্যে স্যান্ডুইচ হতে হয়। একটা মেয়েকে কিন্তু কখনও মা আর শাশুড়ির মধ্যে ব্যালান্স করতে হয় না।'
নন্দিনী সবসময় মনে করেন, মেয়েদের এগিয়ে আসতে হবে, নিজেদের জন্য তো বটেই, সঙ্গে পুরুষদের জন্যও। '৪৯৮-এর মিথ্যে কেসে একজন পুরুষের সঙ্গে যে কত মা-বৃদ্ধা ঠাকুমারাও ফেঁসে যান, হিসেবের বাইরে। বয়স্কা ঠাকুমা বাতের ব্যথায় চলতে পারছেন না, তাঁকেও ৪৯৮ কেসে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। কতজন বৃদ্ধা যে আমাদের কাছে সাহায্য চাইতে আসেন, ভাবতেও পারবেন না!' জানালেন নন্দিনী।
পুরুষও দশভুজা, সে অসুরের প্রতীক নয়
আমাদের বাবারা কি অফিস ছাড়া বাইরের কাজ করতেন না? ছুটির দিনে আমাদের বাবারা দোকান-বাজার-হাট করতেন তো! পুরুষ তো ইলেট্রিক বিলও দিয়েছে, ঘরের কত কাজ সামলেছে, আবার অফিস ব্যবসাও করেছে। আর আজকের পুরুষরা তো অনেক বেশি সংবেদনশীল সন্তানের প্রতি, স্ত্রীর প্রতি। এই যে আজকাল বিদেশে বা প্রবাসে ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে চাকরি-বাকরি করেন, তাঁরা কিন্তু একসঙ্গে রান্নাও করেন। সকালের ব্রেকফাস্ট কোনওদিন ইনি বানান, কোনওদিন উনি বানান।
আর বাবারা বিশেষ করে মেয়েদের বাবারা তো মায়েদের থেকেও সন্তানের প্রতি বেশি কেয়ারিং, যত্নশীল। এটা লোকে বোঝে না, মেয়ের বিয়ে হলে মায়ের থেকেও বাবা বেশি কাঁদেন। সেটা হয়তো সামনে প্রকাশ করেন না। মা তো চিরন্তন সত্যটা জানেন, তিনিও বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ি এসেছেন, তাঁর মেয়েও বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়ি যাবে। বাবা কিন্তু এটা মানতেই পারেন না। আমি নিজের বিয়েতেও দেখেছি, আমার বাবা কন্যা-বিদায়ের সময় আমার গাড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। গাড়ি চলে যাচ্ছে, তবু বাবা গাড়ি ধরেই এগোচ্ছেন। আমার বাবা চলে গেছেন অনেক বছর, কিন্তু বাবার সেই কন্যা-বিদায়ের সময়ের মুখটা আমার এখনও মনে আছে। বাবারা অনেক বেশি আকুল হন।'
কাশবনে পোজ দিলেই দুর্গা হওয়া যায় না
নন্দিনীর কথায়, 'পুরুষ-নারী দ্বন্দ্ব আমার নয়। কিন্তু এই নারীদের অযথা মহিমান্বিত করা, এখানেই আমার আপত্তি। এই পুজো আসলেই লাল-পাড় সাদা শাড়ি পরে কাশবনে ছোটাছুটি করলেই তারা সত্যিকারের দুর্গা হয়ে যাবে না। কাশবনে দুর্গা সেজে শ্যুটিং করলেই মা দুর্গা হওয়া যায় না। আমি তো দেখছি আজকাল সব বয়সী মহিলারাই কাশবনে দৌড়চ্ছেন দুর্গা সেজে! এ তো শুধু প্রদর্শন। আসল মা দুর্গা বহু সংসারে বহু মহিলাই আছেন।
আগেকার দিনে সংসারে একজন বৌ থাকতেন, তিনি মেজো বউ হতে পারেন, বড় বউ হতে পারেন, যিনি সবাইকে আগলে রাখতেন। আজও অনেক সংসারে এমন বৌ-রা বিরল হলেও আছেন। তাঁরাই আসল মা দুর্গা। কত মহিলা সংসার করেও ব্যবসা করে বহু মানুষকে প্রতিপালন করছেন। এখানেও বহু পুরুষ অনেকের অন্নসংস্থান করেন। তাঁরাও তো মা দুর্গা। হুজুগ মানে কিন্তু মা দুর্গা নয়। বছরের ৩৬০ দিন তুমি অন্যের সংসার ভাঙার চেষ্টা করলে, অন্যের ক্ষতি করলে, বাকি পুজোর সময় মা দুর্গা সাজলে- তাতে নিজেকেই হাস্যস্পদ বানাচ্ছ। যেসব পুরুষ বহু বাচ্চার শৈশব বাঁচাচ্ছেন, বহু মেয়েকে অন্ধকূপ থেকে তুলে আনছেন, তাঁরা কেন দুর্গা নয়?'
পুরুষও ধর্ষিত হয়
নন্দিনী বললেন, 'ভারতে ১৮ শতাংশ পুরুষ ধর্ষিত হয়। আমাদের চোখের সামনে বড় উদাহরণ যাদবপুরের ওই মৃত ছাত্রটি। সবাই বলবে পুরুষই তো তাকে ধর্ষণ করেছে। আমরা কবে বলেছি পুরুষ ধর্ষণ করে না? পুরুষকে নারী বা পুরুষ যে কেউ ধর্ষণ করলে সেটাও যে অপরাধ, সংবিধানে বা আইনে তার কোনও জায়গাটাই তো আপনারা রাখেননি! সমাজই বিশ্বাস করে না।
রাজস্থানের একটি ছেলেকে তার মা আর বোনেরা মিলে ধর্ষণ করেছে। কত ছেলে স্ত্রীর হাতে ধর্ষিত হয়, সে খবর কেউ রাখেন? কিন্তু যেখানে সংবিধানেই সেই অপরাধের কোনও জায়গা নেই, সেখানে কী শাস্তি দেব তাঁকে? মানসিক ধর্ষণও কিন্তু হয়। আমাদের অফিসে একটা কেস এল একজন ছেলের বাবা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ৪৯৮ মিথ্যে কেসে ফেঁসে তিনি অপমানে, টেনশনে আত্মহত্যা করেছেন। আর এক ভদ্রলোককে তাঁর ছেলের বউ মিথ্যে ধর্ষণের মামলায় ফাঁসিয়েছেন। ভদ্রলোক সুইসাইড করলেন। তখন আপনারা বোঝেন কেমন লাগে? বহু মহিলারা এভাবে পুরুষদের মিথ্যে মামলায় ফাঁসান।
দুর্গা পুজো আদতে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়। শুভর দ্বারা অশুভের নিধন। দুর্গাপুজো মানে শুধু মেয়েরাই আরাধ্য, এটা একেবারেই নয়। গুলিয়ে ফেলবেন না।
আমার চোখে পুরুষ- রমণী কোনও ভেদাভেদ নাই!
বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।'