মঞ্চে নৃত্যের তালে তালে যা রচিত হল তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এত জোর, এত দাপট নারীদের নাচে 'ডান্সারস গিল্ড'-ই প্রথম ও শেষ। প্রকৃতির মায়ের ভূমিকায় মঞ্জুশ্রীর বিকল্প আজও কেউ নয়।

গ্রাফিক্স -দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 28 August 2025 20:02
জন্মের পরই যে মেয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন সে মেয়ে হয়ে জন্মেছে বলেই সমাজে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে বাঁচতে আসেনি।
'পুরুষের বিদ্যা করেছিনু শিক্ষা'/' লভি নাই মনোহরণের দীক্ষা'। রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদার সার্থক জীবন্ত রূপ যেন
মঞ্জুশ্রী চাকি সরকার (Manjusri Chaki Sircar)।
ঠিক যেন রাজকন্যা অভ্যাস করলেন ধনুর্বিদ্যা; শিক্ষা করলেন যুদ্ধবিদ্যা, রাজদণ্ডনীতি। মঞ্জুশ্রীর নাচের মধ্যে এই প্রতিটি কথা সত্য। নারীর লাজুক লাবণ্য কোনদিনই মঞ্জুশ্রীর নাচে ছিল না। বরং রবীন্দ্রনাথের নাচে তিনি নিয়ে এলেন আফ্রিকান প্রভাব। যা বাঙালি আগে দেখেনি। মঞ্জুশ্রী প্রমাণ করলেন তিনি সময়ের থেকে এগিয়ে।

নানা নৃত্যশৈলীর সংমিশ্রণে গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব নাচের ভাষা। আফ্রিকার অরণ্যাবৃত নিবিড় জঙ্গল, আমেরিকার আলোকিত নগর, মণিপুরের পার্বত্য উপত্যকা উঠে এসছে মঞ্জুশ্রীর নৃত্যশৈলীতে।
১৯৩৪ সালের ২৮ অগস্ট জন্ম মঞ্জুর।
ছোটবেলা থেকেই নাচের প্রতি গভীর অনুরাগ।
ছোটবেলায় পাবনার মেয়ে মঞ্জু ছিলেন প্রতিবেশিনী রমার বাল্যবন্ধু। সেই রমা আর কেউ নয় সুচিত্রা সেন।
ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে উদয়শঙ্কর-অমলাশঙ্করের ‘কল্পনা’ দেখে রোমাঞ্চিত হলেন মঞ্জু। ম্যাট্রিক পাশ করতেই অনাদিপ্রসাদের নৃত্যদলে ভর্তি, সেই সূত্রে নিউ এম্পায়ারে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান মঞ্চস্থ হল।
এরপর বেথুন এবং প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময়ে তিনি একই সঙ্গে মণিপুরি ও ভরতনাট্যম চর্চা করেছেন। তখন থেকেই এক আঙ্গিক থেকে অন্য আঙ্গিকে চলে যাওয়া শুরু হল।
স্বামী পার্বতীকুমার ছিলেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের আফ্রিকান স্টাডিজ় বিভাগের রিডার। তিনি যখন নাইজিরিয়া যাওয়ার প্রস্তাব দিলেন, মঞ্জুশ্রী গহন আফ্রিকার স্বপ্নে রোমাঞ্চে বিভোর। নিন্দুকরা বললেন, এ বার তা হলে মঞ্জুর নাচের পালা শেষ।
কিন্তু আফ্রিকায় গিয়ে আফ্রিকান নৃত্যকে ভারতীয় নাচে যুক্ত করলেন মঞ্জুশ্রীই প্রথম। খুলে গেল তাঁর নাচের নতুন দরজা। নতুন দিনের আলোর সূচনা হল।
মঞ্জুশ্রীর আর এক গর্ব ছিল তাঁর কন্যা রঞ্জাবতী। তাঁদের মা-মেয়ের নাচ দেখতেই অঝোর বৃষ্টি উপেক্ষা করে কানায় কানায় পূর্ণ হত রবীন্দ্রসদন প্রেক্ষাগৃহ।

'যে আমারে পাঠাল এই
অপমানের অন্ধকারে
পূজিব না, পূজিব না সেই দেবতারে পূজিব না।
কেন দিব ফুল, কেন দিব ফুল,
কেন দিব ফুল আমি তারে...'
'চণ্ডালিকা' রূপে রঞ্জাবতী যখন মঞ্চে অবতীর্ণ হতেন, মনে হত সত্যিকারের চণ্ডালিকা যেন আবিভূর্তা হয়েছেন। শুধু রবীন্দ্রনাথের চণ্ডালিকা নয়, যেন প্রকৃতির থেকে সৃষ্ট এক নারী। তাঁর নাচে শান্তিনিকেতনী ঘরানার সঙ্গেই মিশে যেত আফ্রিকান ডান্স মুভমেন্ট। অঙ্গ সঞ্চালনে খেলত বিদ্যুৎ তরঙ্গ। যেন নিবিড় অরণ্যের মধ্যে থেকে সৃজিতা চণ্ডালিকা।
বাঙালি তথা বিশ্বমননে রঞ্জাবতী সরকার (Ranjabati Sircar) নামটি এখনও দ্যুতিময়। যদিও এ প্রজন্ম রঞ্জাবতীকে চেনে না তেমন করে।
আমার সৌভাগ্য হয়েছিল এই মা-মেয়ে মঞ্জুশ্রী-রঞ্জাবতীর নাচ চাক্ষুষ করার। মঞ্জুশ্রী মায়া আর রঞ্জাবতী প্রকৃতি।
ছোটবেলায় যা দেখেছিলাম আজীবন ভুলব না। ঐ দুরন্ত নৃত্যনাট্য আর কখনও কারও মধ্যে দেখিনি। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে বিকৃত না করে আরো সাহসী আধুনিকীকরণ করত মঞ্জুশ্রীর 'ডান্সারস গিল্ড'। আজও মনে আছে রবীন্দ্রসদনের চণ্ডালিকা র সেই পোস্টার 'আমি তোমারই মাটির কন্যা'। সবুজ লতাপাতা পোশাকে প্রকৃতি রঞ্জাবতী আর মায়ের ভূমিকায় মঞ্জুশ্রী। ওঁদের পোশাক পরিকল্পনাও হত অসম্ভব অভিনব যা নাচকে নতুন আঙ্গিক দিত। রবীন্দ্রনাথের ভাবনাকে চিরকাল আন্তর্জাতিক রূপ দিয়েছেন ওঁরা। কিন্তু গানে কোনও বিকৃত রুচি আনেননি। তখন বিশ্বভারতীর কপিরাইট ছিল ভীষণ কড়া। তবু দর্শকের ভালবাসায় জিতে যায় তাঁদের সাহসী কোরিওগ্রাফি।

মঞ্চে নৃত্যের তালে তালে যা রচিত হল তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এত জোর এত দাপট নারীদের নাচে 'ডান্সারস গিল্ড'-ই প্রথম ও শেষ। প্রকৃতির মায়ের ভূমিকায় মঞ্জুশ্রীর বিকল্প আজও কেউ নয়।
শুনেছি মঞ্জুশ্রীর নির্দেশ ছিল খাওয়া-দাওয়ার অভ্যাসে ব্যায়ামবীরদের মতো ডায়েট রাখা হত ডান্সারস গিল্ডের মেয়েদের। কাঠবাদাম থেকে পেস্তা আখরোট, তেমনই যোগা ব্যায়াম এসবের মাধ্যমে আলাদা ভাবে গড়ে তোলা হত শিল্পীদের শরীর। নৃত্যশৈলীতেও ওঁদের বডি মুভমেন্ট রবীন্দ্রনৃত্যে কেউ ভাবতে পারত না।
কিন্তু নব্বই দশকের শেষেই শেষ হল মা-মেয়ের উপাখ্যান। রঞ্জাবতীর অকাল মৃত্যু মায়ের আগেই। কারণটি যদিও বড়ই নির্মম। কয়েক দশক আগে নিজের জীবনের প্রতি আশা হারিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন নৃত্যাঙ্গনা রঞ্জাবতী।

কিডনি রোগে অসুস্থ মঞ্জুশ্রী হাসপাতালে শুয়ে মেয়ে হারানোর শোক সয়েছিলেন। মৃত্যু পেরিয়ে আজ মঞ্জুশ্রী অরণ্যঅমৃতা।
'মোর দেহ পাক্ তব স্বর্গের মূল্য মর্তে অতুল্য'॥
যারা চাক্ষুষ করেছেন মঞ্জুশ্রী-রঞ্জাবতীর নাচ তাঁরাই বুঝবেন সময়ের থেকে কতটা এগিয়ে ছিলেন ওঁরা। তবে ওঁদের স্বপ্ন 'ডান্সারস গিল্ড' আজও চলছে স্বমহিমায়।
আজ লেজেন্ড মঞ্জুশ্রী চাকি সরকারের জন্মদিনে শ্রদ্ধা।
ছবি সৌজন্যে Dancers' Guild