ধর্মেন্দ্র ও হেমা মালিনীর প্রেমের গল্প যেন এক সিনেমাই। ‘তুম হাসিন ম্যায় জওয়ান’ ছবির সেটে তাঁদের দেখা হয়। তারপর ‘শোলে’, ‘সীতা অউর গীতা’, ‘ড্রিম গার্ল’-এর মতো একের পর এক ছবিতে রোমান্সের পরত জমতে থাকে।

ধর্মেন্দ্র।
শেষ আপডেট: 24 November 2025 14:04
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বলিউডের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে যাঁরা শুধুমাত্র অভিনেতা নন—বরং এক সময়কে চিনিয়ে দেয়। ধর্মেন্দ্র (Dharmendra) তারই মধ্যে পড়েন।
সোমবার প্রয়াত হয়েছেন ধর্মেন্দ্র। বয়স হয়েছিল, ৮৯ বছর। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়াতেই বাড়ির সামনে জমছে বলিউড সেলেবদের ভিড়।
১৯৩৫ সালের ৮ ডিসেম্বর পাঞ্জাবের লুধিয়ানা জেলার সাহনেওয়াল গ্রামে জন্ম ধর্মেন্দ্র কেওয়াল কৃষণ দেওলের। ছোটবেলায় সিনেমার পর্দা ছিল তাঁর কাছে জাদুর জানালা। সেই গ্রাম থেকে, কাদামাখা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন—একদিন তিনিও বড় পর্দায় আলো ছড়াবেন।
ফিল্মফেয়ার ম্যাগাজিনের ট্যালেন্ট কনটেস্ট জিতে ১৯৬০ সালে ‘দিল ভি তেরা হম ভি তেরে’ ছবির মাধ্যমে বলিউডে আত্মপ্রকাশ। প্রথম ছবিতেই নজর কাড়লেও প্রকৃত সাফল্য আসে কিছু বছর পরে—‘শোলা অউর শবনম’ (১৯৬১), ‘বন্দিনী’ (১৯৬৩), ‘ফুল অউর পাথ্থর’ (১৯৬৬) ও ‘সত্যকাম’ (১৯৬৯)-এর মাধ্যমে।
ষাট ও সত্তরের দশক ছিল তাঁর সোনালি যুগ। শক্তিমত্তা, মাধুর্য ও সংবেদনশীলতার এমন মিশেল বলিউড আগে দেখেনি। ‘মেরা গাঁও মেরা দেশ’, ‘চুপকে চুপকে’, ‘ড্রিম গার্ল’, ‘শোলে’—প্রতিটি ছবিতে ধর্মেন্দ্র হয়ে উঠেছেন ভারতীয় পুরুষত্বর নতুন সংজ্ঞা। শক্তির মধ্যে প্রেম, সাহসের মধ্যে কোমলতা—এই অনন্য ভারসাম্যই তাঁকে আলাদা করে দিয়েছে সমসাময়িক নায়কদের থেকে।
ধর্মেন্দ্র ও হেমা মালিনীর প্রেমের গল্প যেন এক সিনেমাই। ‘তুম হাসিন ম্যায় জওয়ান’ ছবির সেটে তাঁদের দেখা হয়। তারপর ‘শোলে’, ‘সীতা অউর গীতা’, ‘ড্রিম গার্ল’-এর মতো একের পর এক ছবিতে রোমান্সের পরত জমতে থাকে।
তখন ধর্মেন্দ্রর সংসারে ছিলেন প্রথম স্ত্রী প্রকাশ কৌর। তবুও হৃদয়ের টান থামেনি। সমাজের সমালোচনা, বিতর্ক—সব পেরিয়ে ধর্মেন্দ্র ও হেমা এক হয়েছেন। ধর্মেন্দ্র বলেছিলেন, “আমি কাউকে আঘাত করিনি, আমি শুধু হৃদয়ের কথা শুনেছি।”
হেমা মালিনী তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, “তিনি একই সঙ্গে শক্তিশালী ও কোমল। ঝড়ের মধ্যেও পাহাড়ের মতো পাশে থেকেছেন।” তাঁদের দুই মেয়ে ঈশা ও অহনা আজও বলেন—বাবা এখনও মায়ের উদ্দেশে শায়রি লেখেন, ভালোবাসায় বলেন, “মেরি হেমা।”
ধর্মেন্দ্রর অভিনয়ে এক অদ্ভুত মানবিকতা ছিল। ‘সত্যকাম’-এর আদর্শবাদী যুবক থেকে শুরু করে ‘অনুপমা’র সংবেদনশীল লেখক—প্রতিটি চরিত্রেই তিনি জীবনের রঙ ফুটিয়ে তুলেছেন।
‘শোলে’-তে বীরু চরিত্রে তাঁর সংলাপ—“বসন্তি, ইন কুত্তোঁ কে সামনে মৎ নাচনা”—আজও ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অমর। কিন্তু পর্দার বাইরে তিনি একেবারে আলাদা মানুষ। এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “দেনে ওয়ালে নে সব কিছু দিয়া, বাস যো চাহা, ওহ নেহি দিয়া।” অর্থাৎ, স্রষ্টা তাঁকে সব দিয়েছেন—কিন্তু তিনি কখনও দাবিদার হননি। এটাই ধর্মেন্দ্রর জীবনের দর্শন—বিনয়ে মহত্ত্ব।
খ্যাতির চূড়ায় থেকেও ধর্মেন্দ্র আজও মাটির মানুষ। লোনাভালার খামারে কাজ করেন, ট্র্যাক্টর চালিয়ে ভিডিও পোস্ট করেন ইনস্টাগ্রামে। ২০২৫ সালের দশেরা উপলক্ষে তাঁর ভিডিও বার্তায় বলেন, “ভাল মানুষ হয়ে বাঁচুন, তবেই সাফল্য আপনার পিছু নেবে।” তাঁর এই সরলতাই তাঁকে কোটি ভক্তের হৃদয়ে অমর করেছে।
ধর্মেন্দ্রর জীবন মানেই হিন্দি সিনেমার ক্রমবিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। সাদা-কালো যুগের সামাজিক নাটক থেকে সত্তরের দশকের অ্যাকশন ব্লকবাস্টার—সবেতেই তিনি ছিলেন সামনের সারিতে।
মনে রাখার মতো সিনেমা
ফুল অউর পাত্থর (১৯৬৬)
সত্যকাম (১৯৬৯)
মেরা গাঁও মেরা দেশ (১৯৭১)
শোলে (১৯৭৫)
চুপকে চুপকে (১৯৭৫)
দ্য বার্নিং ট্রেন (১৯৮০)
লাইফ ইন এ মেট্রো (২০০৭)
আপনে(২০০৭)
রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি (২০২৪)
তাঁর আসন্ন ছবি ‘ইক্কিস’, শ্রীরাম রাঘবনের পরিচালনায়, ডিসেম্বরে মুক্তি পাবে। যুদ্ধ ও সাহসিকতার এই গল্প যেন তাঁর নিজের জীবনদর্শনেরই প্রতিফলন।
২০১২ সালে পদ্মভূষণ, ২০০৪-এ লোকসভায় বিকানেরের সাংসদ, অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার—তবু ধর্মেন্দ্রর নিজের ভাষায়, “আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার হল সাধারণ মানুষের হাসিমুখ।”
ধর্মেন্দ্রর দুই স্ত্রী—প্রকাশ কৌর ও হেমা মালিনী। পুত্র সানি ও ববি দেওল, কন্যা ঈশা, অহনা, বিজেতা ও অজিতা। আজ তাঁরা প্রত্যেকেই বলিউডে ধর্মেন্দ্রর উত্তরাধিকার বহন করছেন।
দূরদর্শনের এক পুরনো সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, “আপনি কীভাবে স্মরণীয় হতে চান?” ধর্মেন্দ্রর চোখে মৃদু হাসি ছিল সেদিন। বলেছিলেন, “আমি দেশকে ভালোবেসেছি, মানুষকে ভালোবেসেছি—আমাকে সেই ভাবেই মনে রাখুন।”
আজ যখন তিনি হাসপাতালে, তখন সারা দেশ প্রার্থনা করছে সেই ‘হি-ম্যান’-এর দ্রুত আরোগ্যের জন্য—যিনি হৃদয়ের গভীর থেকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন, যিনি বিনয়ের মাধ্যমে তারকাখ্যাতির সীমা ছাড়িয়ে গেছেন। তিনি সেই মানুষ—যিনি কবির মতো ভালোবাসেছেন, নায়কের মতো লড়েছেন, আর কিংবদন্তির মতো বেঁচেছেন।