শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
আমরা কথায় কথায় বলে থাকি 'যাত্রাপালা করিস না তো'। কোনও সিনেমা না পোষালেই বলি 'যাত্রা হচ্ছে যেন'। যাত্রা যেন সবকিছুর মধ্যে খারাপ। অথচ যাত্রাই হল বিনোদন জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ আদি রূপ। যাঁরা যাত্রাকে বিদ্রুপ করেন তাঁরা আদতে হয়তো সামনে থেকে কোনও যাত্রা দেখেননি। তাঁরা চিরাচরিত ভাবনা থেকেই এমনটা বলে থাকেন। তাছাড়া শহরে বসে যাত্রা দেখার সেরকম সুযোগ নেই। এবার সেই সুযোগ করে দিলেন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ৩২ বছর পর আবার রবীন্দ্রসদনে মঞ্চস্থ হল যাত্রা। হৈহৈ করে সাড়ম্বরে শুরু হল যাত্রা উৎসব। প্রথম তিনদিন রবীন্দ্রসদন প্রেক্ষাগৃহ ছিল হাউসফুল। এরপর বাগবাজারের ফণীভূষণ বিদ্যাবিনোদ যাত্রামঞ্চে এক মাস ব্যাপী চলবে এই যাত্রা উৎসব। কবে কোন যাত্রা তার তালিকা রইল।

তিনদিন আগে রবীন্দ্রসদনে এই উৎসবের শুরু। ২৪ নভেম্বর ২০২৩, মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে দুই মন্ত্রী অরুপ বিশ্বাস ও ইন্দ্রনীল সেন একতারা মঞ্চে শুভ উদ্বোধন করলেন এই যাত্রা উৎসবের। তিন দশক আগে হটকেকের মতো যাত্রার সিজন টিকিট বিক্রি হয়েছিল এই শহরের বুকে। মাঝের দীর্ঘ সময় যাত্রাকে একেবারেই ব্রাত্য করে দেওয়া হয় বিনোদন জগত থেকে। গ্রামের দর্শকদের জন্যই বরাদ্দ ছিল যাত্রা। কিন্তু বহু যুগ পর আবার ফিরল সেই আলোয় ভরা দিন। শহরের প্রাণকেন্দ্র রবীন্দ্রসদনে ফের শুরু হল যাত্রা। দর্শকদের জন্যপ্রবেশ অবাধ রাখা হয়েছিল। ফণীভূষণ বিদ্যাবিনোদ যাত্রামঞ্চে যদিও সামান্য দামেই টিকিট কেটে রোজ দেখা যাবে যাত্রাগুলি।
রবীন্দ্রসদনে তিনদিন তিনটি যাত্রা মঞ্চস্থ হচ্ছে গত শুক্রবার থেকে আজ রবিবার পর্যন্ত। প্রথম উদ্বোধনের দিন মঞ্চস্থ হয়েছিল কাকলি চৌধুরী-অনল চক্রবর্তী জুটির নতুন পালা 'জোড়াদিঘীর চৌধুরী বাড়ি', দ্বিতীয় দিন মিতালি চক্রবর্তী ও শিলাজিৎ (যাত্রাভিনেতা) অভিনীত 'রাধার চোখে জ্বলছে আগুন'। তৃতীয় দিন পিয়ালী বসু অভিনীত 'ফুলেশ্বরীর ফুলশয্যা' রয়েছে তালিকায়।

যাত্রা মানেই মেলোড্রামার রমরমা আর ভীষণ মোটা দাগের নিবেদন, সেই মিথ ভেঙে দিয়েছেন অনল-কাকলি জুটি। তাঁদের বলা হয় যাত্রার উত্তম-সুচিত্রা। ২৫ বছর পার করা এই দুজনের জুটি ভীষণ হিট। খুবই রোমাঞ্চকর যাত্রাপালা রচনা করেছেন অনল চক্রবর্তী। অভিনয়ে তিনি যখন মঞ্চে আসছেন, তখন তা সত্যি মহানায়কোচিত। পোশাক থেকে ব্যক্তিত্ব, সবেতেই অনল দুর্দান্ত। আর কাকলি চৌধুরী মঞ্চে এলেই আগুন ধরিয়ে দিচ্ছেন। নাচে-গানে-অভিনয়ে কাকলি সুপার ওম্যান। সাবলীল অভিনয়ে এই জীবনমুখী পালা সাজিয়েছেন তাঁরা। টানটান অভিনয়ে আর সাহসী চিত্রনাট্যে 'জোড়াদিঘীর চৌধুরী বাড়ি' যাত্রা এখনকার বাংলা ধারাবাহিকের থেকেও গুণগত মান ও ডেডিকেশনে অনেকটা এগিয়ে রয়েছে বলা যায়। মনে হয় যেন মঞ্চে চলচ্চিত্র দেখছি। যেমন আলোর কাজ, তেমনই দুরন্ত শব্দের খেলা।

মিতালি চক্রবর্তী তাঁর লক্ষ্মী প্রতিমার মতো মুখশ্রীর জন্য বাংলার যাত্রাপ্রেমীদের নয়নের মণি। নতুনভাবে নতুন উদ্যোমে মিতালি ফিরেছেন তাঁর নতুন পালা ''রাধার চোখে জ্বলছে আগুন" নিয়ে। পালাকার উৎপল রায়ের অনবদ্য নিবেদন এটি। মিতালি ও কাকলিদের অভিনয় দেখে হাউসফুল রবীন্দ্রসদনে দর্শকরা করতালি দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছেন। পিয়ালী বসুর নির্দেশনা ও অভিনয়ে পালাকার মঞ্জিল বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'ফুলেশ্বরীর ফুলসজ্জা' মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো পালা।
যাত্রার লক্ষ্মী হলেন কাকলি আর মিতালি। দুজন দুই ছন্দে নিজেদের স্বকীয়তার ছাপ রেখে যাচ্ছেন মঞ্চে। বিশেষ করে নারীসুলভ অভিনয়ের বাইরে দমদার পুরুষোচিত অভিনয়েও কাকলি দুর্দান্ত। যেমন সংলাপ বলার জাদু, তেমনই নাচে অনন্যা তিনি। কাকলির মা যাত্রাভিনেত্রী কাজল চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন উৎসবে। তিনি বললেন "বত্রিশ বছর আগে আমি আর আমার মেয়ে এই রবীন্দ্রসদনে একসাথে যাত্রা করেছিলাম। আজ কাকলির অভিনয় দেখে চোখে জল আসছে। অনেক কষ্ট পেয়েছে জীবনে, সব কষ্ট অভিনয়কে সমর্পণ করে কাকলি আজ স্বয়ংসিদ্ধা। এ কারণেই চিৎপুরে আরেকটা কাকলি চৌধুরী জন্মায়নি।"
যাত্রা উৎসবে একতারা মঞ্চে যাত্রা নিয়ে মনোজ্ঞ আলোচনা থেকে যাত্রাপালার গানের আসর বসেছিল। ছিল যাত্রা ইতিহাসের প্রদর্শনীও। শুধু তাই নয়, সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যেক যাত্রাশিল্পীকে মঞ্চে সম্বর্ধনা দেওয়া হয়। সঙ্গে যাত্রার আড়ালে থাকা কারিগরদেরও সম্মানিত করা হয়। রবীন্দ্রসদনে যাত্রা দেখতে হাজির ছিলেন টলিউডের বেশ কিছু চেনা মুখ। তমাল রায়চৌধুরী থেকে সুদীপ্তা চক্রবর্তীর মতো বিদগ্ধ অভিনেতা-অভিনেত্রীরা ছিলেন দর্শকাসনে।
মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ও ইন্দ্রনীল সেন দর্শকদের সঙ্গে বসেই যাত্রা দেখলেন। রবীন্দ্রসদনে যাত্রা যেভাবে সম্মান পেল এবং সমাজের তথাকথিত এলিট ক্লাসে জায়গা করে নিল, তা সত্যি নতুন ইতিহাস তৈরি করল। রামকৃষ্ণদেব বলেছিলেন থিয়েটারে লোকশিক্ষা হয়। কথাটা যাত্রার ক্ষেত্রেও সত্যি। বরং যাত্রা চিরকালই আমজনতার অনেক নিকটবর্তী।