যৌন হেনস্থার গুরুতর অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার শমীক অধিকারী। অনলাইনের রীল থেকে বাস্তবের কঠিন অন্ধকারে নামা যে এতটাই দ্রুত হবে, তা বোধহয় কেউ ভাবেনি।

শেষ আপডেট: 6 February 2026 16:30
দ্য ওয়াল ব্যুরো: যৌন হেনস্থার গুরুতর অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার শমীক অধিকারী। অনলাইনের রীল থেকে বাস্তবের কঠিন অন্ধকারে নামা যে এতটাই দ্রুত হবে, তা বোধহয় কেউ ভাবেনি।
অভিযোগ ওঠার পরপরই শমীক আচমকাই উধাও হয়ে যান। সঙ্গে ছিলেন তাঁর মা-বাবাও। কয়েকদিন ধরে তাঁদের কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর লুকিয়ে থাকা সম্ভব হয়নি। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে দমদম এলাকা থেকে শমীককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সেখান থেকে তাঁকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। শুক্রবার দুপুরে বেহালা থানা থেকে অভিযুক্তকে হাজির করা হয় আলিপুর আদালতে। সেই সময়ই আদালত চত্বরে উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে শমীক বলেন, ‘আমাকে ফাঁসানো হয়েছে’। (Shamik Adhikary , nonsane, sexual harrasement, assault)
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ২২ বছরের এক তরুণীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই এই মামলা দায়ের হয়। তরুণীর অভিযোগ, বেহালা এলাকার একটি ফ্ল্যাটে তাঁকে আটকে রেখেছিলেন শমীক। ২ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা পর্যন্ত সেই ফ্ল্যাটেই বন্দি করে রাখা হয় তাঁকে।
অভিযোগকারিণীর আইনজীবী অভিষেক দে বিশ্বাস জানান, শমীক তাঁর পরিচিত বন্ধু ছিলেন। বাড়ি বদলের সময় সাহায্য করবেন—এই অজুহাতে তাঁকে নিজের ফ্ল্যাটে ডেকে পাঠানো হয়। এরপরই তরুণীর মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ। অভিযোগপত্রে উল্লেখ, সেই রাত জুড়ে তাঁর উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। কোনওভাবে পরিস্থিতি সামলে পুলিশে অভিযোগ জানাতেই শমীক ফ্ল্যাট ছেড়ে পালিয়ে যান। সেই সময় থেকেই তাঁর মা-বাবারও খোঁজ মিলছিল না বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এই ঘটনার নির্মমতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে। মাত্র কয়েকদিন আগেই ‘বাটন’ নামে একটি ভিডিও প্রকাশ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিপুল প্রশংসা পেয়েছিলেন শমীক। অনেকেই তাঁকে সাহসী কণ্ঠস্বর বলে তুলে ধরেছিলেন। অনলাইনে যিনি তখন ‘নায়ক’, আজ তাকেই চাদরে মুখ ঢেকে পুলিশের গাড়িতে উঠতে দেখা যায়—এই দৃশ্য যেন হঠাৎ করে বদলে যাওয়া এক সিনেমার ফ্রেম। এই মুহূর্তে শমীক অধিকারীর তরফে কোনও বিবৃতি পাওয়া যায়নি। পুলিশ তদন্ত চালাচ্ছে, আদালতে চলছে অভিযোগকারিণীর গোপন জবানবন্দি।
তবে ঘটনাটি শুধু এখানেই থেমে থাকেনি। রাজনৈতিক রঙও লেগেছে এই মামলায়। অনেকের ধারণা, ‘বাটন’ ভিডিওটি সরাসরি না হলেও তৃণমূল কংগ্রেসকে আক্রমণ করেই তৈরি করা হয়েছিল। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এর পেছনে বিজেপির ইন্ধন থাকতে পারে। শমীক গ্রেপ্তার হওয়ার পরই তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ আঙুল তোলেন বিজেপির আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্যের দিকে।
কুণাল ঘোষের অভিযোগ, শমীকের অপরাধ আড়াল করতে চাইছেন অমিত মালব্য। একটি পোস্টে তিনি লেখেন, ধর্ষকদের পক্ষে সওয়াল করা মানুষ হিসেবে পরিচিত অমিত এই ঘটনায় অভিযুক্ত কনটেন্ট ক্রিয়েটরের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কুণালের দাবি অনুযায়ী, অমিত প্রশ্ন তুলেছেন কেন অভিযোগকারিণী এতদিন পরে মুখ খুললেন, কিংবা এত বড় ঘটনা ঘটলে কেউ জানত না কেন। অথচ অভিযোগে স্পষ্ট বলা আছে, ২ ফেব্রুয়ারি রাতে ঘটনাটি ঘটে, প্রায় ১২ ঘণ্টা তরুণীকে একটি ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল, এবং পরে তিনি পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। ৪ ফেব্রুয়ারি এফআইআর নথিভুক্ত হয়।
সব মিলিয়ে এই ঘটনা যেন এক নির্মম বাস্তবের আয়না। যেখানে অনলাইনের জনপ্রিয়তা মুহূর্তে তৈরি হয়, আবার মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে। ক্যামেরার সামনে যে মুখটি সাহস আর প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, আজ সেই মুখই ঢেকে যায় চাদরে। রয়ে যায় প্রশ্ন, নেটদুনিয়ার আলো-ছায়ার আড়ালে আর কত অজানা অন্ধকার লুকিয়ে থাকে।