শহরের এক পাঁচতারা হোটেলের সুপার ডিলাক্স রুমে পাশাপাশি রাখা দু’টি চেয়ার। একটিতে বসে আছেন পুজোর মরশুমে দর্শকদের ভরসার নায়ক আবির চট্টোপাধ্যায়। অন্যটিতে বয়স সত্তর ছুঁয়ে যাওয়া, তবু আজও টলিউড, বলিউড এমনকি হলিউডে সমান উজ্জ্বল ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়।

ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: 16 September 2025 18:14
এ বছর পুজোয় যে চার মহারথীর লড়াই হবে বক্স অফিসে তার মধ্যে রক্তবীজ-টু এরই মধ্যে সাড়া ফেলেছে। প্রথম ছবি হিট করলে এমনিতেই সিক্যুইল নিয়ে একটা আগ্রহ থাকে। তাই রক্তবীজ-২ নিয়ে স্বাভাবিক আগ্রহ রয়েছে। তার উপর ‘রঘু ডাকাত’ ও ‘দেবী চৌধুরানীর’ সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিম শিবপ্রসাদ যেভাবে প্রচারে নেমেছেন তাতে আরও মাত্রা যোগ হয়েছে।
বাংলা ছবিতে পলিটিক্যাল থ্রিলার ইদানীং প্রায় হয় না বললেই চলে। রক্তবীজ সেখানে মরুদ্যান। দেশের একমাত্র বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের কূটনৈতিক দর্শন রক্তবীজ-২ এর অন্যতম প্রতিপাদ্য। ছবিতে অবশ্য প্রণবের নাম নেই। তবে তাঁর ছায়া যে রয়েছে তা বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না।
এ ছবি মুক্তি পাওয়ার আগে কথা হচ্ছিল ছবির অন্যতম দুই চরিত্রের সঙ্গে। পাশাপাশি রাখা দু’টি চেয়ার। একটিতে বসে আছেন পুজোর মরশুমে দর্শকদের ভরসার নায়ক আবির চট্টোপাধ্যায়। অন্যটিতে প্রবীণ অভিনেতা ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়। বয়স সত্তর পেরিয়ে গেছে। তবু আজও টলিউড, বলিউড এমনকি হলিউডে সমান উজ্জ্বল তিনি।
আবির পরেছিলেন বটল গ্রিন টিশার্ট, সঙ্গে ডেনিম জিনস। আর ভিক্টরবাবু সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামায় শ্বেতশুভ্র, গলায় অসমিয়া গামছা। ছবিতে আবির অভিনয় করছেন আইজি পঙ্কজ সিংহের চরিত্রে, আর ভিক্টরবাবু রাষ্ট্রপতির ভূমিকায়— অনিমেষ চট্টোপাধ্যায়, যাঁর ছায়ায় আছে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতি।
প্রথম প্রশ্নটা ছিল ভিক্টরবাবুর কাছে— প্রস্তুতি কেমন ছিল? মানসিক নাকি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের শারীরিক অনুকরণেও সমান গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি? জবাব এল সোজাসাপটা— “প্রণববাবুকে দেখেছি। তবে ওনাকে ভেবে কাজটা করিনি। ওনাকে নকল করারও চেষ্টা করিনি। ওনাকে চিনতাম। ব্যস ওইটুকুই।”
কিন্তু মানসিক প্রস্তুতির সঙ্গে সঙ্গে ফিজিকাল প্রস্তুতিও তো থাকে! মানে কথা বলার ধরন বা হাঁটা..। এবারও বললেন, “একদম না, কোনও ভঙ্গী নকল করতে চেষ্টা করিনি। বলার কায়দাও চেষ্টা করিনি, কিস্সু না। অনুপম খের যেমন মনমোহন সিংকে অনুকরণ করেছিলেন, আমি তা করিনি। প্রণববাবুকে মাথায় রেখেও অভিনয় করিনি। শুধু জানতাম, তিনি কেমন মানুষ ছিলেন। আগের রক্তবীজ ছবিতে তাঁর চণ্ডীপাঠ, পুজোপাঠের বিষয়টা আমি ধরেছিলাম— সেটাই আমার কাছে দামী ছিল। কিন্তু এ ছবিতে তা নেই। তাই নকল করার প্রশ্নই ওঠে না।”
আলাপ ঘুরে গেল এক কল্পনামূলক এক প্রশ্নে। যদি রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রদর্শিত হত রক্তবীজ বা রক্তবীজ-২ এবং প্রণববাবু তা দেখতেন? ভিক্টরের উত্তর দৃঢ়— “আমার তা মনে হয় না, চাইতামও না।”
কথা গড়াল রাজনীতিতেও। মতাদর্শগতভাবে প্রণববাবু ও ভিক্টর ভিন্ন মেরুর। অথচ তাঁরই চরিত্রে অভিনয় করছেন ভিক্টর। আজকের সময়ে যেখানে পারস্পরিক বৈরীতা ও রেষারেষি এত তীব্র, সেই পরিবেশে একে কীভাবে দেখেন তিনি?
ভিক্টরের সোজা উত্তর— “অন্যজনকে সম্মান না দেওয়ার অর্থ নিজেকেও অসম্মান করা। এখন যা হচ্ছে তা অতুলনীয়। শুধু এদেশেই নয়, বাংলাদেশেও এমন ঘটছে, মাথা নত হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। কী করা যায়, আমি জানি না।”
তাহলে কি আশাহীন হয়ে পড়েন? চোখে দৃঢ়তার ঝিলিক নিয়ে ভিক্টরের জবাব—“না, আমি আশাহীন কথাটাই বিশ্বাস করি না। বাবা আর্মিতে ছিলেন। মারধর খেয়েছি, পড়াশোনা করেছি, বড় হয়েছি। সবসময় আশা থাকে। বিশ্বাস রাখতে হয়, খেলতে হয়, বাঁচতে হয়, জিততে হয়। আমরা জিতবই। এখন হারের সময় চলছে, গ্রহের চাপ চলছে।”
তার মানে গ্রহে বিশ্বাস করেন? ভিক্টরের হেসে উত্তর— “বাপ রে বাপ! না করলে কি দেশের এই অবস্থা হতো? গ্রহ ছাড়া অন্য চাপ কিছু নয়।”
আলোচনা শেষে থেকে গেল এক গভীরতা। সম্মান, বিশ্বাস আর আশা— এ তিনেই বাঁচেন আজকের ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়। যেন বললেন— “আমরা জিতবই, শেষ পর্যন্ত জিতবই।”