
হরিসাধন দাশগুপ্ত, সুচিত্রা সেন
শেষ আপডেট: 16 April 2025 16:34
এই প্রজন্মের কাছে, এই সময়ের চলচ্চিত্র-তথ্যচিত্র ভাবনার ক্ষেত্রে ‘ইন্সপিরেশন’ হতে পারতেন যিনি, সেই কিংবদন্তি মানুষটির আজ জন্মদিন। অথচ তিনি অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছেন স্বল্প চর্চার কারণে, হারিয়ে গিয়েছে তাঁর বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ তথ্যচিত্র। গত বছর ২০২৪-এ তাঁর শতবর্ষ পার হয়েছে। তিনি প্রবাদপ্রতিম পরিচালক হরিসাধন দাশগুপ্ত।
হরিসাধন সেই সময়ে দাঁড়িয়ে হলিউড ঘরানায় বাংলা ছবি তৈরি করতে চেয়েছিলেন। আজ হরিসাধন দাশগুপ্তর ১০১ তম জন্মদিনে দ্য ওয়ালে স্মৃতিতর্পণে তাঁর পুত্রবধূ 'দূরদর্শন' খ্যাত স্বনামধন্য সঞ্চালিকা চৈতালী দাশগুপ্ত।
দেশ-বিদেশ ঘোরা হরিসাধন দাশগুপ্তর শেষ জীবন কেটেছিল শান্তিনিকেতনে। হরিসাধন পুত্র পরিচালক রাজা দাশগুপ্ত চৈতালীর স্বামী। চৈতালী 'দ্য ওয়াল'-কে বললেন, 'আমরা এখন শান্তিনিকেতনে। আমার শ্বশুরমশাইকে আমি বাবা বলেই ডাকতাম। বাবার জন্মদিনের কদিন আগেই শান্তিনিকেতন 'অর্থশিলা'-তে হরিসাধন দাশগুপ্তর 'কোনারক' তথ্যচিত্র ও 'একই অঙ্গে এত রূপ' ছবিটি দেখানো হল। যতটা হরিসাধন দাশগুপ্তর কাজের প্রচার হওয়ার ততটা তো হয়নি। আজও কতজন হরিসাধন দাশগুপ্তর নাম শোনেনি। বাবার সমসাময়িক বন্ধুদের যাঁদের নাম হয়েছে তাঁরা কিন্তু শুরুর দিকে বাবার সঙ্গেই কাজ করেছেন। যেমন বাবা প্রথমে 'ঘরে বাইরে'র স্বত্ব কিনেছিলেন। সেটির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন সত্যজিৎ রায়। এসব 'পথের পাঁচালী'র বহু আগের কথা বলছি।'
এ তথ্য অনেকের কাছেই চমকপ্রদ যে সত্যজিৎ রায়ের বহু আগে হরিসাধন দাশগুপ্ত 'ঘরে বাইরে' করবেন ঠিক করেছিলেন। চৈতালী দাশগুপ্ত এ প্রসঙ্গে বললেন, 'সত্যজিৎ রায় হরিসাধন দাশগুপ্তকে বলেছিলেন কলা ভবনে ওঁর এক জুনিয়র আছেন সোনালী সেন রায়। তাঁকে বিমলা মানাতে পারে।' পছন্দও হল বিমলা। কিন্তু 'ঘরে-বাইরে' আর হল না। হরিসাধন দাশগুপ্ত তাই লিখেছিলেন, 'ঘরে-বাইরে হল না, কিন্তু বিমলা আমার ঘরে এল।'
সোনালী সেন রায় হয়ে গেলেন সোনালী দাশগুপ্ত।
আরো একটা ভুল তথ্য চতুর্দিকে ঘুরছে, জ্যঁ রেনোয়ার 'দ্য রিভার' ছবিতে সত্যজিৎ রায় সহকারী ছিলেন। কিন্তু এটা একদম ভুল তথ্য। হরিসাধন দাশগুপ্ত চিফ অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন। সত্যজিৎ রায় ক’দিন অবজার্ভার হিসেবে কাজ করেছিলেন। হরিসাধন দাশগুপ্ত আর রামানন্দ সেনগুপ্ত চিফ অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন 'দ্য রিভার' ছবির। সত্যজিৎ রায় হরিসাধন দাশগুপ্তর বন্ধু হিসেবেই গেছিলেন শ্যুটিং দেখতে।'
হরিসাধন দাশগুপ্ত সর্বাধিক যে ছবি দিয়ে মানুষের কাছে জনপ্রিয়, সেই ছবিটি হল উত্তম-সুচিত্রার 'কমললতা'। চৈতালী দাশগুপ্ত সুচিত্রা সেন ও হরিসাধন দাশগুপ্ত-র রসায়ন কেমন ছিল তা জানালেন।
চৈতালীর কথায়, 'বাবাকে যখন সুচিত্রা সেন ফোন করতেন, আমি অনেকবার ফোন ধরেছি। সেটা 'কমললতা'র অনেক পরে। 'হরি কী আছেন?' বলতেন শ্রীমতী সেন। তবে অনেকেই জানেন না, 'কমললতা'র শ্যুটিং তিন মাস বন্ধ ছিল। বাবার সঙ্গে সুচিত্রা সেনের মতবিরোধ হয়েছিল। কমললতার চরিত্রে সুচিত্রা সেনকে চড়া মেক আপ করতে অনুমতি দেননি হরিসাধন দাশগুপ্ত। হরিসাধন দাশগুপ্ত মিসেস সেনকে বলেছিলেন, কমললতা হয়ে উঠতে হাতের নখ কাটতে, অত চড়া আই মেকআপ না করতে। কিন্তু উনি শোনেননি। আরও কিছু কারণ ছিল। সে কারণে তিন মাসের বেশি ছবির শ্যুটিং বন্ধ ছিল। সুচিত্রা সেন বাবার কথা শোনেননি শেষ অবধি। চড়া মেক আপ করেই উনি অভিনয় করলেন। ছবির কাজ শেষ করতে বাবা মিসেস সেনের সঙ্গে আর তর্কে জড়াননি।'
এত বছর পরে হরিসাধন দাশগুপ্তর নেতিবাচক প্রচার পুত্রবধূ চৈতালী চান না। পরবর্তী প্রজন্ম যেন তাঁর বাবার কাজ, বাবার সৃষ্টির কদর করে, সেটাই তাঁর চাওয়া।