বাংলা ছবির একেবারে গোড়ায় গেলে দেখা যায়, ১৯১৯ সালের নির্বাক চলচ্চিত্র বিল্বমঙ্গল— সেখানে গান তো দূরের কথা, শব্দও ছিল না। দর্শকের মন টানতে প্রতিটি প্রেক্ষাগৃহে থাকত অর্কেস্ট্রার দল। দৃশ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাজত সুর। সবাক যুগ এলেও প্রথম দিকে বাংলা সিনেমা ঘুরপাক খেয়েছে বাঙালির জীবন, সাহিত্য, সমাজ ও ধর্মকে কেন্দ্র করে। দোল বা হোলির উৎসব কিন্তু সহজে জায়গা পায়নি।

শেষ আপডেট: 3 March 2026 11:05
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আজ দোল। চারদিকে আবিরের গন্ধ, রাঙা কপাল, বসন্তের হালকা উন্মাদনা। কিন্তু বাংলা সিনেমার পর্দায় যে দোল একসময় রঙ, সুর আর আবেগের এক বিশেষ ভাষা তৈরি করেছিল, সেই ঐতিহ্য আজ কোথায়? মজার বিষয়, আমাদের ছবির অধিকাংশ জনপ্রিয় ‘দোলের গান’-এ ‘হোলি’ শব্দটিই বেশি উচ্চারিত। কেউ বলতেই পারেন, নাম যাই হোক, উৎসব তো রং মাখামাখিরই। কথাটা মিথ্যে নয়। তবে সংস্কৃতি আর রুচির ভিন্নতায় উৎসবের উপস্থাপনও বদলে যায়। তবু ‘খেলব হোলি রং দেব না’ কিংবা ‘ও শ্যাম যখন তখন’— একান্ত আপন (১৯৮৭) ও বসন্ত বিলাপ (১৯৭২)-এর এই দুই গান যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম দোলের আবহে সমান জনপ্রিয়, তা নিয়ে বাঙালির মনে দ্বিধা নেই। কিন্তু এই দু’টি গানের বাইরেও কি কোনও ইতিহাস নেই?
বাংলা ছবির একেবারে গোড়ায় গেলে দেখা যায়, ১৯১৯ সালের নির্বাক চলচ্চিত্র বিল্বমঙ্গল— সেখানে গান তো দূরের কথা, শব্দও ছিল না। দর্শকের মন টানতে প্রতিটি প্রেক্ষাগৃহে থাকত অর্কেস্ট্রার দল। দৃশ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাজত সুর। সবাক যুগ এলেও প্রথম দিকে বাংলা সিনেমা ঘুরপাক খেয়েছে বাঙালির জীবন, সাহিত্য, সমাজ ও ধর্মকে কেন্দ্র করে। দোল বা হোলির উৎসব কিন্তু সহজে জায়গা পায়নি।
১৯৩৭ সালে প্রমথেশ বড়ুয়ার পরিচালনায় মুক্তি পায় মুক্তি। কানন দেবী ছিলেন নায়িকা, আর নায়ক নিজে বড়ুয়া। তাঁর কণ্ঠে ও লিপে রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘আজ সবার রঙে রং মেশাতে হবে’— এই গানটির হাত ধরেই অজান্তে বাংলা ছবিতে ঢুকে পড়ে দোলের রঙিন ইঙ্গিত। সুরারোপ করেছিলেন পঙ্কজ মল্লিক।
এরপর ১৯৫৬ সালে দেবকী কুমার বসুর নবজন্ম। সরাসরি দোলের দৃশ্য না থাকলেও এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল— অরুন্ধতীদেবী হারমোনিয়াম বাজিয়ে বৈষ্ণব পদে রাধিকার রূপগান শোনাচ্ছেন, আর প্রথমবার নিজের কণ্ঠে গাইছেন উত্তমকুমার। গান শেষে অরুন্ধতীর সংলাপ— “উঠি ঠাকুরপো, সামনে দোল আসছে, ঐদিন সকালে তোমার দোলের গান শুনব”— যেন আগাম বসন্তের আভাস।
১৯৬৩ সালের বিখ্যাত ছবি উত্তর-ফাল্গুনীতেও হোলির অনুষঙ্গ শোনা যায়। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘কৌন তারাহ সে তুম খেলাত হরি’— গানের কথায় হোলির উল্লেখ স্পষ্ট।
১৯৬৭ সালে তরুণ মজুমদারের বালিকা বধূ ছবিতে প্রথম স্পষ্টভাবে দোল উৎসবের দৃশ্য দেখা যায়। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা ‘লাগ লাগ লাগ লাগ রঙের ভেল্কি লাগ, পরানে লেগেছে ফাগুয়া’— সুর ও কণ্ঠে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। আজও ইন্টারনেটে এই গান শোনা যায়।
১৯৭০ সালে অগ্রদূত পরিচালিত মঞ্জরী অপেরা। অভিনয়ে উত্তম কুমার, সাবিত্রী চ্যাটার্জি, অজয় ব্যানার্জি, সত্য ব্যানার্জি, গীতা দে। সুধীন দাশগুপ্তের সুরে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘আজ হোলি খেলবো শ্যাম তোমার সনে’ জনপ্রিয়তার শিখরে ওঠে। কথায় ছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।
১৯৭৩-এ দীনেন গুপ্তর বসন্ত বিলাপ— রোমান্টিক-কমেডির এক অনবদ্য নিদর্শন। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা, সুধীন দাশগুপ্তের সুরে ‘ও শ্যাম যখন তখন, খেলো না খেলা এমন’— সাদাকালো ছবির মাঝেও রঙিন হয়ে ওঠা গান। অপর্ণা সেনদের ঠোঁটে লিপ, আরতি মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে প্রাণ পেয়েছিল।
দীনেন গুপ্ত ১৯৭৮-এ আবার আনলেন তিলোত্তমা। অভিনয়ে রঞ্জিত মল্লিক, কল্যাণী মণ্ডল, সুমিত্রা মুখার্জি। এখানে ‘রঙ শুধু দিয়েই গেলে আড়াল থেকে অগোচরে’— পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুরে, মান্না দে ও অরুন্ধতী হোম চৌধুরীর কণ্ঠে এক অন্যরকম হোলির আবহ।
একই বছর আলো সরকারের বন্দী— প্রথম রঙিন বাংলা ছবি যেখানে দোল উৎসব জায়গা পেল পূর্ণতায়। শ্যামল মিত্রর সুরে আশা ভোঁসলে ও কিশোর কুমারের গাওয়া ‘মনে রঙ না লাগলে তবে, এ হোলি কেমন হোলি’— উত্তম কুমার ও সুলক্ষনা পণ্ডিতের লিপে অন্য মাত্রা পায়।
১৯৮০ সালে তরুণ মজুমদারের দাদার কীর্তি। ভাগলপুরের পটভূমিতে প্রভাতফেরির হোলি দৃশ্য— ‘হোলি আয়ি রে’ গানটি গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শক্তি ঠাকুররা। কথায় পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় ও হৃদয়েশ পাণ্ডে।
১৯৮২-র পার্থপ্রতিম চৌধুরীর রাজবধূ ছবির ‘আজো রঙ্গ খেলত মেরে রঙ্গলাল’ও উল্লেখযোগ্য। সুর অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের, কণ্ঠে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। অনেকের মতে, বাঙালিয়ানা বজায় রেখে এটাই সম্ভবত শেষ চলচ্চিত্র যেখানে হোলির উৎসবকে পূর্ণতা দিয়ে দেখানো হয়েছিল।
এরপর ১৯৮৯-এ প্রণমি তোমায় ছবির ‘সকাল হতে না হতে কেন এলে রং দিতে’, ২০০৮-এ জনতার আদালত ছবির ‘শ্যাম নাচে রাধা নাচে’, ২০০৯-এ লক্ষ্যভেদ-এর ‘এলো রে এলো রে হোলি এল রে’, ২০১০-এ বদলা ছবির ‘অলিতে গলিতে’— দোল বা হোলিকে কেন্দ্র করে গান তৈরি হয়েছে বটে। কিন্তু সেই সুর, সেই আবেদন, সেই সাংস্কৃতিক রঙ— কোথায় যেন হারিয়ে গেল। আশির দশকের পর থেকেই বাংলা ছবির ভাষা পাল্টাতে শুরু করল। গানের দৃশ্য থেকে ধীরে ধীরে মুছে যেতে থাকল বাঙালির দোল খেলার নিজস্ব স্বাদ।
আজ যখন আবার দোলের সকাল, প্রশ্নটা ফিরে আসে। বাংলা সিনেমার পর্দায় কি আর ফিরবে সেই আবির মাখা বসন্ত? নাকি দোলের রং এখন শুধু স্মৃতির অ্যালবামেই আটকে থাকবে?