আজ ‘ওয়ার ২’তে কিয়ারা আডবানির বিকিনি পরা একটি শট নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড়। তবে, বলিউডের ইতিহাসে পিছিয়ে গেলে প্রথম বিকিনি গার্লের ছবিতে পড়ে রয়েছে জমে থাকা ধুলো। সেই ধুলো সরাতেই বেরিয়ে এল এক সাদা-কালো ছবি। ‘সংগ্রাম’ ছবির নায়িকা নলিনী জয়ন্ত।

নলিনী জয়ন্ত
শেষ আপডেট: 20 May 2025 18:30
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আজ ‘ওয়ার ২’তে কিয়ারা আডবানির বিকিনি পরা একটি শট নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড়। তবে, বলিউডের ইতিহাসে পিছিয়ে গেলে প্রথম বিকিনি গার্লের ছবিতে পড়ে রয়েছে জমে থাকা ধুলো। সেই ধুলো সরাতেই বেরিয়ে এল এক সাদা-কালো ছবি। ‘সংগ্রাম’ ছবির নায়িকা নলিনী জয়ন্ত।
বলিউডের স্বর্ণযুগ। ১৯৫০। এমন সব কিংবদন্তি অভিনেত্রী বলিউড কাঁপাচ্ছেন সে সময়ে, যাঁদের নাম শুনলেই আজও নস্টালজিয়ায় ভেসে যায় সিনেমাপ্রেমীরা। তবে, নার্গিস, মীনা কুমারী, মধুবালা, গীতা বালী, ওয়াহিদা রহমান এবং বৈজয়ন্তিমালার মতো তারকাদের তালিকায় এক জননন্দিত নাম আজ বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে—নলিনী জয়ন্ত।
সৌন্দর্য, অভিনয়ে নৈপুণ্যতা এবং তার সঙ্গে আত্মবিশ্বাস। এক অসামান্য সংমিশ্রণ ছিল নলিনীর চরিত্রে। ১৯৪০-এ কিশোরী বয়সে চলচ্চিত্রে পা রাখেন তিনি। মাত্র ১৪ বছর বয়সে ‘রাধিকা’ (১৯৪১) ছবিতে অভিষেক, গানও গেয়েছিলেন নিজেই। এরপর ‘বহেন’, ‘নির্দোষ’, ‘আঁখ মিচোলি’র মতো ছবিতে কাজ করে ধীরে ধীরে জায়গা করে নেন বলিউডের শীর্ষসারির নায়িকাদের তালিকায়।

দেব আনন্দের সঙ্গে। ছবি: ‘কালা পানি’
১৯৪৫ সালে বিয়ে করেন তাঁর প্রথম ছবি ‘রাধিকা’র পরিচালক বিরেন্দ্র দেশাইকে। কিন্তু সেই সম্পর্ক টিকেছিল অল্প ক'বছর। তারপর জীবনে এলেন অশোক কুমার—পর্দার সঙ্গে বাস্তবেও। ‘সমাধি’ (১৯৫০) ছবির মাধ্যমে দু’জনের জুটি দর্শকমনে এক স্থায়ী ছাপ ফেলে। একই বছর মুক্তি পায় ‘সংগ্রাম’, যে ছবিতে এক নতুন চমক দেখালেন নলিনী জয়ন্ত—বলিউডে প্রথমবারের মতো বিকিনি পরে এলেন পর্দায়। সে দিন তিনি সাহসের সঙ্গে গড়ে দিলেন ভবিষ্যতের ট্রেন্ড, বহুদিন আগে শর্মিলা ঠাকুরের ফটোশ্যুট বা জিনাত আমানের গ্ল্যামার আসার বহু আগেই।
সেই সময়, চলচ্চিত্র পত্রিকা ‘ফিল্মফেয়ার’-এর এক পাঠকদের পছন্দে নির্বাচিত হলেন ‘চলচ্চিত্র জগতের সবচেয়ে সুন্দরী নারী’ হিসেবে। কিংবদন্তি দিলীপ কুমার বলেছিলেন, ‘নলিনী জয়ন্ত, এমন একমাত্র অভিনেত্রী যিনি আমাকে ফাইনাল টেক-এ চমকে দিতে পারতেন।’
তবে ব্যক্তিগত জীবনে সুখী ছিলেন না নলিনী। অশোক কুমারের সঙ্গে গড়ে ওঠা সেই গভীর সম্পর্ক ভেঙে যায়, কারণ অশোক কুমার তাঁর স্ত্রীকে ছাড়তে চাননি। পরবর্তী সময়ে অভিনেতা প্রভু দয়ালের সঙ্গে দ্বিতীয়বার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন নলিনী।
১৯৬৫ সালের ‘বম্বে রেসকোর্স’-এর পর অভিনয় থেকে প্রায় বিদায় নেন তিনি। ১৮ বছর পরে, ১৯৮৩-তে তাঁকে দেখা যায় অমিতাভ বচ্চনের ‘নাস্তিক’ ছবিতে, যেখানে অভিনয় করতে গিয়ে প্রতারিত বোধ করেন তিনি। কেন? কারণ ছবির স্ক্রিপ্টে তাঁকে যে ভাবে তাঁর চরিত্রের বর্ণনা করা হয়েছিল, বাস্তবে সেটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারপরই তিনি স্থির সিদ্ধান্ত নেন—কখনও আর অভিনয়ে ফিরবেন না।

‘হাম সব চোর হ্যায়’তে নলিনী
২০০১ সালে স্বামী প্রভু দয়ালের মৃত্যু তাঁর জীবনকে আরও নিঃসঙ্গ করে তোলে। ক্রমান্বয়ে সমাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন নলিনী। ২০১০ সালের ২২ ডিসেম্বর, ৮৪ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান নলিনী জয়ন্ত। তাঁর মৃত্যুর খবর কেউ জানতে পারেননি তিন দিন পর্যন্ত। তাঁর পোষা কুকুরগুলো ডাকাডাকি শুরু করে। তারপর জড়ো হয় আসপাশের মানুষ।

সঙ্গে অশোক কুমার। ছবি: ‘নাজ’
এক প্রজন্মের আলো হয়ে ওঠা এই শিল্পী চলে গেলেন নিঃসঙ্গ নিঃশব্দে, রেখে গেলেন অনবদ্য কিছু চলচ্চিত্র, অভিনয়ের উদাহরণ এবং সাহসের ইতিহাস। আজ যখন বলিউডের ইতিহাস খোঁড়া হয়, তখন বেরিয়ে আসে সেই প্রথম বিকিনি পরা বাঙময় সৌন্দর্য, যার অভিনয় দক্ষতা ও ব্যক্তিত্ব আজও অনুপ্রেরণা হয়ে রয়ে গেছে নতুন প্রজন্মের অনেক অভিনেত্রীর কাছে।
নলিনী জয়ন্ত—এক বিস্মৃত জ্যোতিষ্ক, যাঁর আলো আজও নীরবে আলো ফেলে চলে বলিউডের ইতিহাসে।