হঠাৎ করেই সুমনের লেখা কিছু লাইন মনে পড়ে গেল। ‘তিনি বৃদ্ধ হলেন… বৃদ্ধ হলেন…বনষ্পতির ছায়া দিলেন সারাজীবন’। আর মনে পড়ল আর এক কবির দু’লাইন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি

প্রভাত রায়
শেষ আপডেট: 20 May 2025 15:37
শুভঙ্কর চক্রবর্তী
গুগল সার্চে শুধুমাত্র ‘প্রভাত রায়’ বাংলায় অথবা ইংরেজিতে লিখলে, প্রচুর খবর। কবে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, কী কারণে ভর্তি হয়েছেন, কবে ছাড়া পেলেন, কতটা সুস্থ তিনি, কতটা অসুস্থ ছিলেন। গত ৫ মে থেকে ১৭ মের মোটামুটি বিবরণ। সবটাই। বেশ কিছু প্রতিবেদনে, প্রভাতবাবুর ‘কন্যা’ একতার বক্তব্যও রয়েছে। কোথাও তিনি বলছেন, ‘স্থিতিশীল’ কোথাও ‘রক্তের রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছি’, কোথাও ‘কয়েকদিন পর্যবেক্ষণে রাখা হবে’।
এত প্রতিবেদন, খবর এবং ‘ফেক’ খবর পেরিয়ে প্রভাতবাবু এক সকালেই বাড়ি ফিরলেন। ১৮ তারিখ। পুরোপুরি সুস্থ তিনি নন। তা হতে খানিক সময় লাগবে। ১৯ তারিখ ছিল আবারও ডায়ালিসিস। আগামিকাল অর্থাৎ ২০মেও রয়েছে। প্রভাতবাবুর ছায়াসঙ্গী হিসেবে গত ৭ তারিখ থেকে আজ পর্যন্ত যিনি ছিলেন তিনি তাঁর ‘কন্যা’ একতা। তিনি বললেন, ‘৫ মে থেকে ৭ মে বাবি (প্রভাত রায়) হাসপাতালে ভর্তি ছিল। তখন আমার বাবা পুরোটা সামলেছেন। আমি হায়দ্রাবাদ ছিলাম। ৮ তারিখ বাবি বাড়ি ফিরল। আমিও সেদিন ফিরেছি। ৮ তারিখ দেখলাম ওঁর হাত-পা কাঁপছে। আমরা তখন মনে হয়েছে, কোথাও সংক্রমণ এখনও রয়ে গিয়েছে।’
৯ তারিখ, পরিচালক হরনাথ চক্রবর্তীর সঙ্গে একতা যোগাযোগ করেন, চেষ্টায় ছিলেন কোনওভাবে যদি তাঁকে এসএসকেএম-এর উডবার্নে ভর্তি করানো যায়। পরিচালককে ভর্তি করার জন্য তেমন অবস্থায় প্রায় ২ ঘন্টা অপেক্ষার করেন একতা, কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। একতা বলেন, ‘আমি তখন ভয় পাচ্ছি, সংক্রমণ বাড়তে পারে। তাই অপেক্ষা করিনি, বেসরকারি হাসপাতালে ওঁকে নিয়ে যাই।’
একতা জানালেন, ‘দুটো বড় সার্জারি হয়েছে। পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লাগবে। শরীর দূর্বল। দাঁড়ানোর ক্ষমতা একেবারেই নেই। কথা বলছে, খাওয়াদাওয়া করছে। ভীষণ টক্সিন বেড়ে গিয়েছিল। অক্সিজেনও কমে গিয়েছিল শরীরে। এখন থেকে সপ্তাহে তিনদিন ডায়ালিসিস চলবে।’ কিন্তু এখনও কপালে ভাঁজ রয়েছে একতারও, বললেন, ‘আবার এমন পরিস্থিতি হতে পারে, সংক্রমণ আবারও হতে পারে। কীভাবে তা ছড়াবে কেউ জানে না! এটাই ভয়!’ চুপ করে যায় একতা।
প্রভাত রায় এক সিনেমাজগতের এক অধ্যায়। তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। সাতের দশকে প্রথম কাজ শুরু সহকারী পরিচালক হিসেবে। পরিচালক শক্তি সামন্ত। প্রথম ছবি করলেন প্রতিদান (১৯৮৭)। তারপর থামেননি, ছবি করে গিয়েছেন। সে ছবি হিট হয়েছে, সুপারহিট হয়েছে আবার মুখ থুবড়ে পড়েছে বক্সঅফিসে। থেমে থাকেননি। আবার নেমে পড়েছেন ক্ল্যাপস্টিক’ নিয়ে। কিন্তু শুধু ছবি নির্মাণের মাধ্যমেই তাঁর নাম যে জ্বলজ্বল করছে তা নয়, সান্নিধ্যে ছিলেন এমন সব মানুষের, যাঁরা এক একজন ‘মায়েস্ত্রো’! এক সময় বাংলার এক নামী সংবাদপত্রে নিয়মিত কলাম লিখতেন প্রভাতবাবু। সেই সব লেখায় টলিউডের অন্দরে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা কত টুকরো স্মৃতি সুখপাঠ্য হয়ে উঠেছে নিমেষে। শুধু তাই নয়, এক সময়ে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের অধিকাংশ দায়ভার ছিল প্রভাতবাবুর কাঁধে। আজ তাঁর বয়স ৮১। জীবনের এমন পর্যায়ে এসেও ফের একবার ছবি পরিচালনার কাজে হাত দিতে চলেছেন প্রভাতবাবু। জন্মদিনে ঘোষণা হয় সেই ছবির। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কত কত নামকরা সব সিনেমার মানুষজন। কেক কেটে প্রভাতবাবুর জন্মদিনে আনন্দ উদযাপন হয়েও ছিল ঘটা করে...
আজ প্রভাতবাবুর শরীর শীর্ণ হয়েছে। তিনি দুর্বল। বিছানা ছেড়ে ওঠানামা দুষ্কর হয়ে উঠেছে। একতা বলছিলেন, ‘এই প্রথম এত সিরিয়াস হয়ে গিয়েছিল পুরো বিষয়টা। মন বারবার শক্ত করছিলাম। মনে হচ্ছিল, এই গোটা ১০-১২টা দিন আমার কাছে যুদ্ধ ছিল। বুঝে উঠতে পারছিলাম না, কী করব। গোটাটা একা আমি, আরে কেউ নেই!’
স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠে আসল, একা আপনি মানে? খোঁজখবর, দেখা সাক্ষাৎ কেউ করেননি, কেউ আসেননি? চুপ করলেন একতা, বললেন, ‘বাবিকে দেখতে এসেছিলেন দু’জন। বাল্মিকী চট্টোপাধ্যায়, অভিনেতা মৃণাল মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী বাসবদত্তা মুখোপাধ্যায়, আর যে দিন অভিনেত্রী দোলন রায় এবং সুদেষ্ণা রায়ের হাসপাতালে দেখা করতে আসার কথা ছিল, সেদিনই বাবিকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।’ কারা ফোনে যোগাযোগ করেছিলেন? উত্তরে বললেন, ‘চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, সুদীপ্তা চক্রবর্তী, মিঠু চক্রবর্তী, টোটা রায়চৌধুরি, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, প্রেমেন্দু বিকাশ চাকি।’
প্রভাত রায় যে ছবিতে আবারও ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে চলেছেন, সেই গল্প রবি ঠাকুরের। ‘বলাই’। সুর বাঁধছেন কবীর সুমন। হঠাৎ করেই সুমনের লেখা কিছু লাইন মনে পড়ে গেল। ‘তিনি বৃদ্ধ হলেন… বৃদ্ধ হলেন…বনষ্পতির ছায়া দিলেন সারাজীবন’। আর মনে পড়ল আর এক কবির দু’লাইন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি।’