ছয়ের দশকের তিন সাহিত্যিকের তিনটি গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে 'ভূত'পূর্ব ছবি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'মণিহারা', বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'তারানাথ তান্ত্রিক' আর মনোজ সেনের 'শিকার'। এই তিনটি ছবিতেই মূল বিষয় লোভ আর অতৃপ্ত আত্মার খোঁজ

কতটা জমল ভূতপূর্ব? গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 27 June 2025 22:56
ছবি: 'ভূত'পূর্ব
অভিনয়: সুহোত্র, সত্যম, অমৃতা,সন্দীপ্তা, রূপাঞ্জনা,সপ্তর্ষি
পরিচালনা- কাকলি ঘোষ ও অভিনব মুখোপাধ্যায়
দ্য ওয়াল রেটিং: ৭.৫/১০
'সাহিত্য নিয়ে আজকাল আর বাংলা ছবি হয় না' এবার এ কথা নিয়ে আফসোস করার দিন শেষ। সাহিত্যধর্মী বাংলা ছবি 'ভূত'পূর্ব তিনটি সাহিত্য গল্পকে একসূত্রে বেঁধেছে। এই ছবিতে পেলাম ভূতের ভয়, রহস্য রোমাঞ্চ আর স্বর্ণযুগের ছবির সেই রেশ। তিনটি গল্প নিয়ে একটিই ছবি।
সত্যজিৎ রায় রবীন্দ্রনাথের তিনটি গল্প নিয়ে 'তিনকন্যা' ছবিটি তৈরি করেছিলেন। সেই প্রথম কন্যা মণিমালিকা আবার ফিরে এল কাকলি ঘোষ আর অভিনব মুখোপাধ্যায়ের 'ভূতপূর্ব ছবির প্রথম গল্পে। ছয়ের দশকের তিন সাহিত্যিকের তিনটি গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে 'ভূত'পূর্ব ছবি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'মণিহারা', বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'তারানাথ তান্ত্রিক' আর মনোজ সেনের 'শিকার'। এই তিনটি ছবিতেই মূল বিষয় লোভ আর অতৃপ্ত আত্মার খোঁজ।
এক বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় তিন পুরুষ গল্প বলতে শুরু করে। বিভূতিভূষণের (সপ্তর্ষি মৌলিক) বাড়িতে অতিথি হয়ে এসেছে নীলকণ্ঠ (সত্যম ভট্টাচার্য) ও শশধর (সুহোত্র মুখোপাধ্যায়)। তিনজনের তিনটি গল্পেই মূল চরিত্র অতৃপ্ত আত্মা। ছবির শেষে জানা যাবে এই তিন পুরুষ আদতে কারা? সেই রহস্যের সুর ধরেই ছবি শুরু।

প্রথম গল্প 'মণিহারা' বললেই আমাদের মনে পড়ে মণিমালিকা কণিকা মজুমদারের মুখ। আর এই ছবির মণিমালিকা অমৃতা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কণিকা মজুমদারের অদ্ভুত মিল। পর্দায় অমৃতা যেন নিখুঁত মণি। অন্ধকার ঝুল বারান্দায় সালঙ্কারা বেশে ঘোমটা পরিহিতা মণির মোমবাতি হাতে হেঁটে আসা ভয় ধরায় দর্শক মনে। কণিকার থেকে অমৃতা অনেক কোমল মণিমালিকা। দুটি রবীন্দ্রনাথের গানের দৃশ্যে অমৃতার দিক থেকে চোখ সরে না। ক্রমশ যেন পরিপূর্ণ অভিনেত্রী হয়ে উঠছেন তিনি। মাথায় ঘোমটা দিয়ে ব্যক্তিত্বপূর্ণ চলাফেরা, সোনার অলঙ্কারের আতঙ্কের অভিব্যক্তি, তেমনই চাউনিতে রহস্য ধরে রাখাতে অমৃতা ভীষণ নিখুঁত। তাঁর সঙ্গে ফণীভূষণ রূপে যোগ্য নায়ক সত্যম ভট্টাচার্য। স্ত্রীর জন্য একাকীত্ব তিনি সংযত অভিনয়ে তুলে ধরেছেন। অমৃতা-সত্যমের যুগলবন্দী অসাধারণ। সত্যজিৎ রায়ের পর এত নিখুঁত 'মণিহারা' এই প্রথম পাওয়া গেল।
দ্বিতীয় গল্প বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের তারানাথ তান্ত্রিক (সপ্তর্ষি মৌলিক) আর মাতু পাগলির (রূপাঞ্জনা মিত্র)। তারানাথ শ্মশানে মাতু পাগলির খোঁজ পায়,যাকে তন্ত্রগুরু মা বানাতে চায় তারানাথ। মাতু পাগলি তারানাথের মনে বিভ্রম তৈরি করে। তারানাথ দেখতে পায় শব সাধনায় মাতু পাগলির ভিতর ষোড়শী ও মহা ডামরির ভয়াবহ রূপ। মহা ডামরির বিকটদর্শনা রূপ দেখে ভয় পায় তারানাথ। শেষ অবধি মাতু পাগলি আসলে কে সেই খোঁজ দেয় এই ছবি। সপ্তর্ষি সহজাত অভিনয় করেছেন কিন্তু চরিত্রের তুলনায় সে বেশি আধুনিক। মাতু পাগলির এমন ভয়াবহ চরিত্রে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন রূপাঞ্জনা মিত্র। তেমনই তাঁর মেকআপ।

শেষ গল্পটি আরও চমকপ্রদ মনোজ সেনের শিকার। পূর্নেন্দুর মতো ধূসর চরিত্রে সুহোত্র মুখোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ অভিনয়। চিরকাল উন্মুক্ত নারী শরীরকেই বিপণন করা হয়ে এসেছে চলচ্চিত্রে। এই ছবিতে সুহোত্র মুখোপাধ্যায়ের পুরুষ শরীরকে যেভাবে পর্দায় আনা হল তাতে সাহসের পরিচয় দিয়েছেন পরিচালক। জিমচর্চিত শরীর নয় খুব স্বাভাবিক শরীরেও যে এমন চাপা আবেদন থাকে তা বুঝিয়ে দিলেন সুহোত্র। তাঁর চোখের ভাষায় অভিনয় অর্ধেক হয়ে যায়। তেমনই বিধবা নারী তিলোত্তমার চরিত্রে স্নিগ্ধা সন্দীপ্তা সেন প্রশংসা পাওয়ার মতোই। নারীর অবদমিত কামনা কী কাল হতে পারে তা দেখায় এই গল্প। 'শিকার' গল্প নিয়ে এই প্রথম কাজ হল এবং তা অসাধারণ।
'ভূত'পূর্ব দেখে একবারও মনে হল না দুই নবাগত পরিচালক এ ছবি বানিয়েছেন। সাহিত্যের ভার পর্দায় ঠিক সেভাবেই উপস্থাপন করা হয়েছে। হোমওয়ার্ক কাকলি ও অভিনবর খুব ভাল। ছবির দুর্বলতা হল কিছু জায়গায় আলগা চিত্রনাট্য। বিশেষত মাতু পাগলির গল্পে। রূপাঞ্জনার অতি অভিনয় আর একটু নিয়ন্ত্রণ করলে ভাল হত। ছবিতে প্রস্থেটিক মেকআপ ব্যবহার করলে চরিত্রগুলো আরও উন্নত হত। তেমনই ভিএফএক্সে ভূতেরা আরও ভয়ার্ত হতে পারত। কিন্তু তবু বলব এই ছবি সাহিত্যধর্মী গল্পের এ সময়ের শ্রেষ্ঠ ছবি। কানের আরাম ইমন চক্রবর্তী ও তিমির বিশ্বাসের গান। অনেকদিন পর এত ভাল
সাহিত্য নির্ভর ছবি হল। দর্শক এই ছবি দেখুন, হতাশ হবেন না।