Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তান

প্রিয়জন যখন প্রেত,'বাৎসরিক' ছবিতে শতাব্দীর সফল প্রত্যাবর্তন, গা ছমছমে ঋতাভরী

ভাই নেই, কিন্তু ননদ-ভাজে একসঙ্গে সংসার গড়ে তোলার গল্প বাংলা ছবিতে এই প্রথম, যা শুভবার্তা দিল।

প্রিয়জন যখন প্রেত,'বাৎসরিক' ছবিতে শতাব্দীর সফল প্রত্যাবর্তন, গা ছমছমে ঋতাভরী

'বাৎসরিক' রিভিউ । গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস

শেষ আপডেট: 8 June 2025 15:55

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

ছবি - বাৎসরিক 
পরিচালনা - মৈনাক ভৌমিক
অভিনয়ে- শতাব্দী রায়, ঋতাভরী চক্রবর্তী, ঈশান মজুমদার 
দ্য ওয়াল রেটিং - ৮/১০

ঋতুপর্ণ ঘোষের 'উনিশে এপ্রিল' ছবির মূল কাহিনি ছিল তাঁরই লেখা 'বাৎসরিক' গল্প অবলম্বনে। ঋতুপর্ণ 'বাৎসরিক' নামে ছবিটি বানাননি। এই সময়ের পরিচালক মৈনাক ভৌমিকের 'বাৎসরিক' ছবি সদ্য মুক্তি পেয়েছে। যে নাম শুনে মনে পড়ল ঋতুপর্ণর কথা। মৈনাকের 'বাৎসরিক' ছবিও দুই নারীর গল্প। তবে শুধুমাত্র সম্পর্কের গল্প মৈনাক বলেননি। সম্পর্কের মাঝেই এসে পড়েছে পিশাচ,প্রেতদের ছায়া। এতখানি ভয় দেখানো বাংলা ছবি বহু যুগ হয়নি। অলৌকিক ঘটনার পরতে পরতে গা ছমছম করে উঠল। অন্ধকার হলের ভিতর বুক ধুকপুক করে উঠল। মনে হল ভূত যেন পেছনে এসে দাঁড়িয়ে আছে। সত্যজিৎ রায়ের 'মণিহারা' বা তরুণ মজুমদারের 'কুহেলি'র পর এমন গা ছমছমে ভয় দেখানো বাংলা ছবি অনেকদিন পর এল। যে ভূতদের দেখে হাসি পায় না, সত্যি সত্যি ভয় করে।

শুধুমাত্র অলৌকিক গল্পের স্তরে ফেললে এ ছবিকে হবে না। রোজই তো আমরা খবরে শুনতে পাই একলা বাড়িতে তরুণীর মৃত্যু, বৃদ্ধার রহস্য মৃত্যু বা মৃত্যুর বহু দিন পর বাড়ি থেকে বেরল সেই একা মানুষের মরদেহ। মনে পড়ে আজও সেই কঙ্কাল কান্ডের ভূতুড়ে বাড়ি আর সেই বাড়ির স্মৃতি আগলে বসে থাকা একলা লোকটি। কালাজাদু, তন্ত্রমন্ত্র সেখানেও পাওয়া গিয়েছিল। প্রিয়জনকে যে মৃত্যুর পর ধরে বাঁচা যায় না তা দেখাল 'বাৎসরিক'।

স্বপ্না (শতাব্দী রায়) আর বৃষ্টি (ঋতাভরী চক্রবর্তী), ননদ-ভাজের গা ছমছমে গল্প। ছবির শুরুতেই বৃষ্টির বর নীল (ঈশান মজুমদার) গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান। গাড়িতে থেকেও বেঁচে যান বৃষ্টি। কিন্তু গাড়ি চালাচ্ছিলেন নীল। নীলের দিদি স্বপ্নার প্যানিক অ্যাটাক  হয়। দিদির ফোন পেয়েই ভাই জোরে গাড়ি চালাচ্ছিলেন, যা নিয়ে গাড়ির ভিতর তর্ক শুরু হয় নীল আর বৃষ্টির। তর্ক করতে করতেই, মদ্যপান করতে থাকেন নীল আর তারপর গাড়ি দুর্ঘটনা। কিন্তু বৃষ্টি কিছুতেই বেরতে পারেন না স্বামীর স্মৃতি থেকে। মৃত্যুর আগেই নীল কিনেছিলেন একটা মস্ত বাড়ি। সেখানে স্বামীর স্মৃতি আগলে একাই থাকেন বৃষ্টি। মরা স্বামীর শার্ট নিয়ে বিছানায় রোজ শুতে যান বৃষ্টি। 

আর ঠিক এ সময় অবিবাহিতা ননদ বৃষ্টির বাড়ি থাকতে চলে আসেন। মৃত ভাইয়ের 'বাৎসরিক' অবধি স্বপ্না থাকতে চান ভাইয়ের বৌয়ের সঙ্গে। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর জন্য বৃষ্টি ননদ স্বপ্নাকেই দায়ী করে চলেন। যদিও বৃষ্টির অন্তরে স্বপ্নার জন্য ভালবাসাও আছে। কিন্তু পিশাচ আত্মা বৃষ্টির ওপর ভর করে বৃষ্টিকে দিয়ে অতিপ্রাকৃত ঘটনা ঘটায়। সারা ফাঁকা বাড়িতে ঘুরতে থাকে তাঁর মৃত স্বামীর আত্মা। স্বপ্না চায় এমন দুঃস্বপ্নের বাড়ি বিক্রি করে বৃষ্টিকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে। তাই তন্ত্রসাধনা শুরু করেন স্বপ্না। এমন অবস্থায় ননদ ও ভাইয়ের বউয়ের সম্পর্কের সমীকরণ গল্পের মূল বিষয় হয়ে ওঠে। ঋতুপর্ণর ঘরানাতেই মৈনাক বরাবর পর্দায় সম্পর্কের গল্প বুনেছেন। তবে এবার অতিপ্রাকৃত বিষয় নিয়ে ছবি করলেন। অন্যদিকে শতাব্দীও সেভাবে হরর ঘরানার ছবিতে কাজ করেননি। এই প্রথম।

শতাব্দী রায়ের সফল কামব্যাক 'বাৎসরিক'। আটের দশক থেকে বাবলি গার্ল শতাব্দীকে দেখতে অভ্যস্ত দর্শক। কিন্তু স্বপ্না চরিত্রে এক অন্য শতাব্দী। যিনি অনেক বেশি পরিণত, পরিশীলিত। শতাব্দী সফল কবি, অসাধারণ বাচিকশিল্পী তেমনই একগুচ্ছ ছবি পরিচালনা করেছেন। সব মিলিয়ে শতাব্দীর এই অভিনয়ে ফেরা সার্থক। কারণ তাঁর অভিনয়ে এতটুকু মালিন্য পড়েনি। বহু নায়িকাই কামব্যাকে সহজাত অভিনয় ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। শতাব্দীর অভিনয় বরং আরও পরিণত। আর এমন কঠিন চরিত্রে শতাব্দী রায় প্রথম। যাতে তিনি সফল।

অন্যদিকে ঋতাভরী চক্রবর্তী বৃষ্টির ভূমিকায় অনবদ্য। নানা স্তর রয়েছে তাঁর অভিনয়ে। যত ছবি এগিয়েছে তত পরতে পরতে খুলেছে ঋতাভরীর অভিনয়ের ধার। তাঁর পৃথুলা চেহারাও বাদ বাকি পরিচালকদের মতো মৈনাক কমাননি। বরং একজন মানসিক অবসাদগ্রস্থ মহিলার চরিত্রে এই চেহারাও প্লাস পয়েন্ট হয়ে উঠেছে। যদিও ঋতাভরীর অভিনয় ক্ষমতা অন্যদিকে চোখ ফেরাতে দেয় না। শতাব্দী আর ঋতাভরীর রসায়ন 'বাৎসরিক' ছবির আসল চাবিকাঠি।

শতাব্দী কিন্তু ঋতাভরীর মা শতরূপা সান্যালের 'কালো মেম' টেলিফিল্মে কাজ করেছিলেন ২৫ বছর আগে। প্রিমিয়ারে শতরূপার সঙ্গে শতাব্দীর আবার রিইউনিয়ন হল। শতাব্দী যদিও মজা করে শতরূপাকে বললেন 'তুমি তো তোমার মেয়ের জন্য এসেছ ছবি দেখতে।' যদিও তারপর দু'জনেই হাসিতে ঝরে পড়লেন।

ঋতাভরীর স্বামীর ভূমিকায় ঈশান মজুমদারের একটি শ্রেষ্ঠ চরিত্র হয়ে রইল। তাঁকে দেখে সত্যি আঁতকে উঠবে দর্শক। অন্ধকার সিনেমাহলে টর্চ জ্বেলে বসতে হবে এতটাই ভয় পাইয়েছেন ঈশান। ঋতাভরী-ঈশান-শতাব্দীর কোনও সুখের দিনের দৃশ্য মৈনাক ফ্ল্যাশব্যাকে তাঁর ছবিতে রাখেননি। প্রেতকে প্রেত করে রাখাতেই ভয় আরও লেগেছে দর্শকদের।

তবে ছবির ডিটেলিং আরও বিশ্বাসযোগ্য হতে পারত। এই ননদ-ভাজ বা আগে স্বামীর অনুপস্থিতিতে বৃষ্টি সারা বাড়িতে একা। কিন্তু তাঁর প্রাত্যহিক কাজ গুলো করে দিতে কী সাহায্যকারিণী আসেন না। শুধুমাত্র একজন প্রতিবেশীর (জয়দীপ কুণ্ডু) আনাগোনা আছে এই বাড়িতে। তাঁকেও বৃষ্টি পছন্দ করেননা। যদিও বাড়ির অন্ধকার অন্দরমহলে সেই মানসিক অবসাদের ছাপ রেখেছেন শিল্প নির্দেশক রণদীপ ঘড়াই। তবে ঘরদোরে বাঙালি ছাপ কম। এই ছবির ভূতুড়ে আবহ সবথেকে বড় সম্পদ, যা অনবদ্য করেছেন শব্দে শিলাজিৎ চক্রবর্তী ও মিউজিকে স্যাভি। দুই নারীর পোশাক থেকে ভূতেদের পোশাক পরিকল্পনায় অনবদ্য ঋতুরূপা ভট্টাচার্য। সারা ছবিতে ভয় ধরে রাখতে মৈনাক-স্যাভি গানের ব্যবহার করেননি। ছবির শেষে একটি মাত্র রবীন্দ্রসঙ্গীত। যে মৈনাক 'বেডরুম' ছবিতে 'মায়াবনবিহারিনী' ব্যান্ডে সোমলতাকে দিয়ে গাইয়ে বিপ্লব হানেন, সেই 'বাৎসরিক' ছবিতে একেবারে রাবীন্দ্রিক ঘরানায় রবীন্দ্রনাথের গান রাখলেন। পুরনো বাড়ির আলো আঁধারি আরও রোমাঞ্চকর লাগে শুভদীপ নস্করের সিনেমাটোগ্রাফি আর সঙ্গে কালারিস্ট প্রসেনজিৎ ব্যানার্জীর মুন্সিয়ানায়।

অনেকের মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়, অলৌকিক কুসংস্কার প্রমোট করছেন মৈনাক ভৌমিক। কিন্তু প্রেত,তন্ত্র সব ছাড়িয়ে মৈনাক বার্তা দিয়েছেন যে প্রিয়জন চলে গেছে তাঁর হাত ধরে বাঁচা নয়, কষ্ট পাওয়া নয় বরং তাঁকে মনে রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। মনকে মানাতেই হবে যে চলে গেছে সে আর বিছানার পাশটিতে শোয় না, চেয়ারে বসে না। যারা রয়ে যায় তাঁদের এই মৃত্যুর পাহাড়ের ভার কাটিয়ে উঠতেই হবে। ভাই নেই, কিন্তু ননদ-ভাজে একসঙ্গে সংসার গড়ে তোলার গল্প বাংলা ছবিতে এই প্রথম, যা শুভবার্তা দিল।


```