দুই নতুন হিরো নিয়ে পর্দা কাঁপাতে এল 'ব্রহ্মার্জুন'। এই নতুন ছবি কতটা আশাপূরণ করতে পারল?

ব্রহ্মার্জুন রিভিউ। গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 25 May 2025 16:17
ছবি: ব্রহ্মার্জুন
অভিনয়ে: রোহন, অনিন্দ্য, প্রেরণা, খরাজ, সুদীপ
পরিচালনা: শৌভিক দে
দ্য ওয়াল রেটিং: ৭/১০
দুই অনাথ কিশোরের স্ট্রাগল নিয়ে বাংলা ছবি হয়েছিল 'হীরে মানিক'। সেই কালজয়ী গান 'এই ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চলতে চলতে ঠিক পৌঁছে যাব, সেই চাঁদের পাহাড় দেখতে পাব'। শৌভিক দে পরিচালিত 'ব্রহ্মার্জুন' ছবিও দুই অনাথ কিশোরের বড় হবার গল্প বলে। কিন্তু তারা আর চাঁদের পাহাড় খুঁজে পায়না। অন্ধকার জগতের মাদক পাহাড়ে জড়িয়ে পড়ে। দুই নতুন হিরো নিয়ে পর্দা কাঁপাতে এল 'ব্রহ্মার্জুন'। এই নতুন ছবি কতটা আশাপূরণ করতে পারল?
![]()
অনাথ অর্জুন মণ্ডলকে দিয়ে গল্পের শুরু। সে হিন্দু হলেও বেড়ে ওঠে এক মুসলিম চাচার কাছে। অর্জুনের ভুল সে কৈশোরেই প্রেমে পড়ে মেহজমিনের। কিন্তু সেই কিশোরীর বাবা শেখমুলুকের চোরা কারবারি নেতা আলম শেখ। আলম শেখ অর্জুনকে মেরেধরে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেয়। ধর্মহারা, বাস্তুহারা হয়ে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয় অর্জুন। এইসময় সে আশ্রয় পায় ব্রহ্মার বাড়িতে। ব্রহ্মার মা নিজের সন্তানের সঙ্গে মানুষ করে অর্জুনকে। কিন্তু ক'দিন যেতেই মারা যায় ব্রহ্মার মা। দুই অনাথ কিশোর লক্ষ্মীর ভাড় ভেঙে দেখে তাদের জীবন এই কটা পয়সায় চলবে না। তাই তারা পথে বেরিয়ে পড়ে। তাঁদের আশ্রয় দেয় অন্ধকার জগতের নরেশ পাল। যে দুই কিশোরকে অন্ধকার জগতের নতুন ত্রাস তৈরি করে তোলে। এই নরেশ পালের বিপক্ষে রয়েছে আলম শেখ। যার মেয়েকে কৈশোরে ভালবেসে ঘরছাড়া হতে হয় অর্জুনকে। ব্রহ্মার মন বিনিময় হয় পুষ্পার সঙ্গে। কিন্তু হঠাৎই ব্রহ্মা বাঁধা পড়ে মেহজমিনের ওড়নায়। অর্জুন দেখে তার কৈশোর প্রেমের সেই মেয়েকেই ব্রহ্মার সঙ্গে অন্তরঙ্গ অবস্থায়। এই ঘটনার থেকে ব্রহ্মার্জুন জুটি ভেঙে পথ আলাদা হয়ে যায় দুই বন্ধুর। এখানেই ছবির বিরতি। দ্বিতীয়ার্ধে থাকে আরও চমক। সেটা দেখতে সিনেমাহলে যেতে হবে। আবার এক হবে কী ব্রহ্মার্জুন জুটি? নেবে কী প্রতিশোধ কৈশোরে তাঁদের উপর হওয়া অন্যায়ের?

'ব্রহ্মার্জুন' ছবির ইতিবাচক দিক দুই নবীন নায়ক ও নবাগত নায়িকাকে নিয়ে ছবির গল্প সাজানো হয়েছে। সিরিয়ালের অভিনেতাদের বড় পর্দায় রাজকীয় ভাবে তুলে ধরেছেন পরিচালক শৌভিক দে। তারকা হিরোর উপর নির্ভর না করে, কম বাজেটেও এমন বড় মাপের ভাবনা যে উপস্থাপন করা যায় তা দেখাল 'ব্রহ্মার্জুন'। ছবির টাইটেল কার্ড দেখানো থেকেই অভিনবত্বের শুরু, অ্যাকশন মুভিকে সেইমতোই নির্মাণ করা হয়েছে। সঙ্গে অনবদ্য গা ছমছমে আবহ মিউজিকের প্রয়োগ। শৌভিক দে ঝাড়খন্ডের পটভূমিতে যেভাবে এই ছবিকে নিয়ে এসেছেন তা প্রশংসনীয়।
অভিনয়ে রোহন ভট্টাচার্য নিজেকে নতুন করে গড়েছেন ব্রহ্মার চরিত্রে। জিমচর্চিত শরীর থেকে বডি ল্যাঙ্গোয়েজ ভীষণ নায়কোচিত রোহন। রোম্যান্টিক দৃশ্য থেকে অ্যাকশনে মন্দ লাগেনি। যদিও রোহনের ডায়লগ ডেলিভারিতে জড়তা রয়েছে। কিন্তু রোহনকে অভিনয়ে টেক্কা দিয়েছেন অর্জুন চরিত্রে অনিন্দ্য সেনগুপ্ত। এতদিনে সৃজিত মুখোপাধ্যায়, ইন্দ্রাশিস আচার্যর ছবিতে কাজ করে ফেলেছেন অনিন্দ্য। তাঁর অভিনয় অনেক বেশি বাস্তব লেগেছে। যদিও ছবির চিত্রনাট্যে গল্প একসময় শুধুই ব্রহ্মা রোহনকে ধরে এগোতে থাকে। তাঁর প্রেম জীবন নিয়ে মেতে ওঠে ছবি। অর্জুন ক্রমশ সহ-নায়ক হয়ে চিত্রনাট্যে। ছবির নামের সার্থকতা দুর্বল চিত্রনাট্যে রইল না। অনিন্দ্য তবুও সেই প্লটেই নিজের মতো চেষ্টা করে গেছেন।
পুষ্পা চরিত্রে প্রিয়াঙ্কা নজর কেড়েছেন। বিশেষতঃ রোহনের সঙ্গে প্রিয়াঙ্কার অন্তরঙ্গ দৃশ্যগুলি মন কাড়ে। তবে এই ছবিকে টেনে নিয়ে গেছেন মূল দুই অভিনেতা দুই ভিলেন খরাজ মুখোপাধ্যায় আর সুদীপ মুখোপাধ্যায়। দু'জন পাকা অভিনেতার খলনায়ক চরিত্র দুর্দান্ত।
মুম্বইয়ের একাধিক অভিনেতা কাজ করেছেন এই ছবিতে। মুকেশ তিওয়ারি, অমিত শেঠি নজর কেড়েছেন। কিন্তু জারিনা ওয়াহাব এই ছবি কেন করতে এলেন? এক অকিঞ্চিতকর মায়ের চরিত্রে টিবি রোগীর ভূমিকায় দু মিনিটের রোল। এই চরিত্র তো কলকাতার যে কেউ করে দিতে পারতেন। তার ওপর ৬৫ পেরনো জারিনা দুই কিশোরের মায়ের চরিত্রে বেমানান। চিত্রনাট্যের দাবী মিটিয়েছেন মাত্র। 'চিৎচোর' নায়িকার একমাত্র বাংলা ছবিতে প্রতিভার অপচয় হল। তবু যদি 'করণ-অর্জুন' ছবির রাখী গুলজারের মতো রোল পেতেন! হতাশ করলেন পরিচালক।
ততোধিক খারাপ নেতৃর ভূমিকায় ছবির প্রযোজিকা মীনা শেঠি মণ্ডলের অভিনয়। নিজে উদয় হয়ে নিজের ছবির মান তিনি নিজেই নামালেন। এ চরিত্রে আরও পোক্ত অভিনেত্রীর প্রয়োজন ছিল।

সঙ্গীতে এই ছবি মন ভরিয়েছে। গায়কীতে জাভেদ আলি, অনুপম রায়, অত্রী মুখার্জী উল্লেখযোগ্য। শীর্ষ সঙ্গীত 'ব্রহ্মা রে' তে অনবদ্য গেয়েছেন নাকাশ আর সৌম্যদীপ। ছবির গতি বাড়িয়েছে দুর্দান্ত আবহ মিউজিকের সঙ্গে চোখ ধাঁধানো সিনেমাটোগ্রাফি।
'ব্রহ্মার্জুন' কঠোর ভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের ছবি। তবে চিত্রনাট্যের দুর্বলতা ছবির মান মাঝেমধ্যেই নামিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ছোট পর্দার মুখদের বড় পর্দায় এভাবে এনে অ্যাকশন ছবি বানানোর জন্য পরিচালক ও প্রযোজক দুজনকেই সাধুবাদ। তাঁদের এই সাহসকে কুর্নিশ।