
শেষ আপডেট: 5 September 2021 13:19
'অপরাজিত'তে কিশোর অপুর চরিত্রে অভিনয় করেন পিনাকী সেনগুপ্ত আর টিনএজ অপুর রোলে স্মরণ ঘোষাল। অপুর স্কুলজীবন আর এই মাস্টারমশাই পর্ব-তে দুই কিশোর অভিনেতাই অভিনয় করেন।
শিক্ষক মহাশয় তাঁর জ্ঞানভাণ্ডারের মণিমুক্তো তুলে দিয়েছিলেন অপুর হাতে। পিতৃহারা অপু মা সর্বজয়ার একার স্নেহেই বড় হচ্ছিল। কিন্তু অপুর মনের বিকাশ ঘটিয়েছিলেন এই শিক্ষক মহাশয়। যিনি অপুর জীবনে না এলে অপুর সার্বিক বিকাশে অনেকটাই খামতি থেকে যেত। তাঁর অপুকে নিয়ে অনেক আশা ছিল। তাই তিনি তাঁর বই-আলমারির ভালো ভালো বই অপুকে পড়তে দেন। আজকালকার দিনে এমন অভিভাবক, এমন পিতৃসম শিক্ষক খুঁজে পাওয়া বিরল। যিনি অপুকে নর্থ পোল লিভিংস্টোনের বই হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "বাংলাদেশের একটা রিমোট কর্নারে আমরা পড়ে আছি বলে, আমাদের যে মনটাকেও কোনঠাসা করে রেখে দিতে হবে এমন তো কোনও কথা নেই।"
শিক্ষক দিবস বললে অন্তত সত্যজিৎ-ভক্তদের কাছে সুবোধ গাঙ্গুলির মুখটাই প্রথমে মনে পড়ে। সুবোধ গাঙ্গুলি পেশাদার অভিনেতা ছিলেননা। কিন্তু তিনি ব্যক্তিজীবনে ফিল্ম জগতেরই মানুষ ছিলেন। প্রথম জীবনে উনি সিনেমাহলের অপারেটরের কাজ করতেন। পরে নিউ থিয়েটার্সের রসায়নাগারে অধ্যক্ষ হিসেবে ছিলেন। সুবোধ গাঙ্গুলির পরনের পোশাক দেখেই সত্যজিৎ ওঁকে 'অপরাজিত'র মাস্টারমশাইয়ের চরিত্রে ভাবেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর পোশাক পরিচ্ছদে সজ্জিত সুবোধবাবুকে দেখেই সত্যজিতের মনে হয় ইনি যথার্থ অপুর গ্রামের স্কুলের হেডমাস্টার।
শ্রী গাঙ্গুলি যেহেতু সিনেমা বানানোর কারিগরী দিকের কাজে যুক্ত ছিলেন তাই তিনি শ্যুটিং চলাকালীন সত্যজিৎ রায়ের ইউনিটের লোকদের নির্দেশ দিতেন। এমন ক্ষমতা কিন্তু সবার ছিলনা। সত্যজিৎ সুবোধবাবুর এসব নির্দেশ মেনেও নিতেন। হয়তো সত্যজিৎ রায় শট বোঝাচ্ছেন, এমন সময় ওঁর কথার মাঝখানেই সুবোধবাবু ক্যামেরাম্যান সুব্রতবাবুকে বলে উঠলেন– “ও সুব্রতবাবু, আমার মুখে রিফ্লেকটরটা কি ঠিক পড়ছে? আপনি একটু মেপে দেখুন তো। আমার মনে হয় ওটাকে কাত করে দিলে বোধহয়…"- এভাবে সত্যজিৎবাবু মেনে নিতেন ওঁর টুকটাক প্রস্তাব। সুবোধবাবুর প্রশংসায় সত্যজিৎ রায় লিখেছেন, "যখন সুবোধবাবু নিউ থিয়েটার্সে ছিলেন, সেই যুগ ছিল স্বর্ণযুগ। সেই সময় যে সব ছবি তৈরি হত, সেগুলোর ছিমছাম পরিপাট্য ছিল। যা তাদের একটা বিশেষ গুণ এবং এই গুণের কিছুটা যে সুবোধ গাঙ্গুলির প্রাপ্য তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
তাই অভিনয় না করলেও সিনেমার সঙ্গে সুবোধ গাঙ্গুলির সম্পর্ক বহুদিনের। যখন অরোরা ল্যাবরেটরিতে তিনি কর্মরত, তখন সত্যজিত রায়ের সঙ্গে তাঁর দেখে হয়।
সত্যজিৎ রায় সুবোধ গাঙ্গুলির পোশাক দেখেই মাস্টারমশাইয়ের চরিত্রে তাঁকে অভিনয় করার প্রস্তাব দেন। সুবোধবাবু একগাল হেসে এক কথাতেই রাজি হয়ে যান এবং বলেন "রোলটা বুঝি কমিক? আমি কিন্তু আয়নায় চেহারা দেখে নিজেকে অনেক সময় চ্যাপলিন বলে কল্পনা করেছি।"
সুবোধ গাঙ্গুলির 'হেডমাস্টার' চরিত্রটা দেখলেই যে কেউ তাঁর স্কুলজীবনকে মেলাতে পারবেন। মনে পড়বে আমাদের ষাণ্মাসিক বা বার্ষিক পরীক্ষা দেবার দিনগুলোর কথা। তিন ঘণ্টার মধ্যে প্রশ্নপত্রের সব উত্তর লেখা হয়ে উঠবে তো? সব প্রশ্ন পড়ার মধ্যে থেকে আসবে তো? আরও একটা ছাত্রমনের ভয় পরীক্ষায় গার্ড কতটা কড়া পড়বে?
আবার মনে পড়ে যায় কখনও স্কুলে পরিদর্শক আসবার দিনগুলোর কথা। মাস্টারমশাইরা আগে থেকে সব বলে রাখতেন চুপচাপ ভদ্র নম্র হয়ে ক্লাস করতে। একটু পরেই পরিদর্শক আসবেন।
'অপরাজিত' ছবির সেই দৃশ্যের কথা মনে পড়ছে? যখন স্কুল-পরিদর্শক আসবেন আর সুবোধ গাঙ্গুলি পায়চারি করতে করতে প্রতেক ক্লাসের সামনে গিয়ে বলছেন, "আর আধ ঘণ্টা, half an hour, half an hour।"
ঠিক এর পরেই একটি গরু স্কুল কম্পাউন্ডে ঢুকে গেলে, উনি তালি দিয়ে গরুটাকে তাড়াচ্ছেন। আর তারপরেই আসছেন স্কুল পরিদর্শক।
স্কুল পরিদর্শক সব ছাত্রদের মধ্যে অপুর কণ্ঠে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের 'বাংলাদেশ' কবিতাপাঠ শুনে অভিভূত হয়ে যান।
'কোন্ দেশেতে তরুলতা সকল দেশের চাইতে শ্যামল? কোন্ দেশেতে চলতে গেলেই দলতে হয় রে দুর্বা কোমল? কোথায় ফলে সোনার ফসল, সোনার কমল ফোটেরে? সে আমাদের বাংলাদেশ, আমাদেরই বাংলা রে।'
আর ছাত্র অপুর গর্বে বুকটা ফুলে ওঠে হেডমাস্টার সুবোধ গাঙ্গুলির। পরবর্তীকালে সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে অভিনয় করার সেভাবে আর সুযোগ ঘটেনি সুবোধবাবুর। শুধু 'পরশপাথর' ছবির ককটেল পার্টির দৃশ্যে একটি ছোট্ট চরিত্রে অভিনয় করেন সুবোধ গাঙ্গুলি, তুলসী চক্রবর্তীর সঙ্গে। ব্যস তারপর কালের গর্ভে হারিয়ে গেছেন এই শিল্পী। তাঁর খোঁজ আমরা পাইনি। হয়তো নিজেকে রূপোলি পর্দার লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশনের আড়ালেই রাখতে ভালোবেসেছেন সুবোধ গাঙ্গুলি। তবু যুগোত্তীর্ণ আদর্শ শিক্ষক রূপে রয়ে যাবেন তিনি।