
প্রতুল মুখোপাধ্যায়। গ্রাফিক্স- শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 15 February 2025 15:09
মানুষের প্রয়োজনে কবিতা তার পাশে দাঁড়ায়। মুহূর্তের বাঁকবদলে সহজ জীবনচারণকে উপলব্ধি করেছিলেন সঙ্গীতশিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায়। 'গালে যখন গালটা ঠেকাই তোর, তখন ছিল ভোরের চেয়েও ভোর', বাংলা ভাষার সঙ্গে তাঁর এই ঘনিষ্ঠ আচরণে থাকত মাটির গন্ধ।
সামগ্রিক কাঠামোয় গানের যে সুরকেন্দ্রিক অংশ শ্রোতার মননে প্রথম ঘা দেয়, তা আদপে গানের কাব্যাংশ বা লিরিকসেরই অর্থবহ অনুসারী। গানকে তিনি দেখেছেন মূলত বাণী হিসাবে, সুর তার বাহক। তবে এই ক্ষেত্রেও, গানের কথাকেই অধিকতর গুরুত্ব দেওয়ার ফলে শিল্পীর সম্পূর্ণ মূল্যায়ন সম্ভব হয়নি। কারণ তাঁর অধিকাংশ গানই অন্যের কথায়।
মাতৃভাষায় কথা বলার, কাজ করার, লেখাপড়া করার অধিকার চেয়েছিল বাঙালি। সংবিধান-বিশেষজ্ঞদের মতে এই অধিকার মৌলিক। কিন্তু শাসকের ভাষার সন্ত্রাসী আধিপত্য কিংবা হিন্দি ভাষার আগ্রাসন পদে পদে সেই মৌলিক অধিকার খর্ব করেছে। করছেও। সেই সুতোয় দাঁড়িয়ে প্রতুল মুখপাধ্যায়ের সমান্তরাল আলপথে হেঁটে যাওয়া কোনও রাখালেরই মতো দুরন্ত। যখন বাংলা ভাষাকে ক্রমে হারিয়ে ফেলার বেদনাবিধুরতাটুকুও বাঙালিকে স্পর্শ করে না… সেই অসাড় সময়কালে প্রতুলের 'বাংলায় গান গাই' যেন শরীরী আবেদন।
খুব অল্প বয়স থেকেই বুঝেছিলেন, কণ্ঠে রয়েছে সুরের জলছাপ। তবু প্রথম প্রথম নিজে গান লেখার চেষ্টা করেননি। কবিতা-ছড়ায় সুর বসিয়ে গেয়েছেন। কবিতার ধ্বনিমগ্নতা তাঁকে স্পর্শ করেছিল তখনই। ধীরে ধীরে গান লেখাও শুরু হয়। সারা জীবন গান তাঁকে ঘিরে রেখেছে। তবু গানকে সঙ্গে করেই এগিয়ে গিয়েছে জীবন।
কবীর সুমন, রঞ্জনপ্রসাদ, অরুনেন্দু দাস, এদের সমসাময়িক যে নামটা উঠে এসেছিল তিনি প্রতুল। প্রতুল শব্দের অর্থ প্রাচুর্য। সেই মান রেখেছেন শিল্পী। না হলে ১২ বছর বয়সে কবি মঙ্গলাচরণের 'ধান কাটার গান গাই'-কবিতায় সুরারোপ করতে পারে কেউ? জীবনে পল্লবিত সবুজপাতা আজ ঝরে গেছে ঠিকই, কিন্তু ছায়া কালো মেঘমুক্ত সুনীল-সুন্দর আকাশে সাদা মেঘের ভেলার সঙ্গে প্রতুলের গানও ভেসে বেড়ায় দিকদিগন্তে। আজীবন।