পুজো বক্সঅফিসে ‘হ্যাট্রিক’ করে ফেলেছেন। পরপর তিন বছর আবীর সুপারহিট। ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’-এর প্রচারে থাকতে পারেননি। আক্ষেপ আছে। এই প্রথম খোলামেলা কথোপকথন ‘দ্য় ওয়াল-এ’।

আবীর চট্টোপাধ্যায়।
শেষ আপডেট: 11 October 2025 14:51
শুভ বিজয়া আবীর।
আবীর: শুভ বিজয়া।
এই বছরের পুজো কেমন কাটল?
আবীর: অন্যবারের মতো কেটেছে। ব্যতিক্রম কিছুই হয়নি। যা কাজ ছিল, তা পরিকল্পনামাফিক করতে পেরেছি, আশঙ্কা ছিল, যেন বৃষ্টি আসে। পুজোর মধ্যে যে বড় রকমের বিপর্যয় আসেনি, সেটাই ভাল ছিল।
গোটাটাই কি ছবিতে-ছবিতে? মানে হল ভিজিট...
আবীর: গত ছ’বছর ধরে সিনেমাহল ভিজিট আমি করি না।
প্রথমেই আপনাকে অনেক ‘এক্সট্রা’ শুভেচ্ছা, কারণ আপনি এখনও অবধি এই ‘পুজোর সুপারস্টার’-এর খেতাব এবং হ্যাট্টিক ‘রেকর্ড’ এখনও অবধি ধরে রেখেছেন...
আবীর: আমি আগেও এ কথা বলেছি। একজন অভিনেতা হিসেবে ছবির সাফল্য তো বিভিন্ন ভাবে মাপা যায়। অবশ্যই তার একটা বক্স অফিস সাফল্য আছে। সমালোচকদের প্রশংসা আছে। যাঁরা ছবি দেখেন তাঁদের মতামত আছে। কিন্তু যেহেতু আমি ছবির প্রযোজক নই, তাই ছবির কত ব্যবসা হল। কত ফুটফল হল, তার হিসেব আমার কাছে থাকে না। তা থাকার কথাও নয়। আমি তা নিয়ে আলোচনা করি না। যাঁরা আমার ছবি দেখেছেন, তাঁদের প্রতিক্রিয়া পাই, তাই খেতাব, ইত্যাদি, আমি তৈরি করিনি। তাই যাঁরা ভালবেসে বলেন, নিন্দে করে বলেন, তাঁরা বলতে পারবেন।
দুটো ছবি নিয়েই দর্শকদের প্রতিক্রিয়া কী পেলেন?
আবীর: আমার ক্ষেত্রে, শুধু অপরিচিতরাই যে ছবিগুলো দেখে, তা নয়। পরিচিতরাও দেখে, লেখাপত্তরেও জানতে পারি। আমার এটা ভাল লাগছে, ছবি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। খারাপ-ভাল দুই হচ্ছে। এটা স্বাস্থ্যকর। আমার কাছে আরও এক মাপকাঠি হচ্ছে, প্রযোজক-পরিচালক আমাকে তাঁর কাজে রিপিট করেন, সেটাও আমার কাছে মাপকাঠি।
‘রক্তবীজ-২’ কিংবা ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’—একটিও ছবি দেখা হয়েছে?
আবীর: ডাবিং করার পর আমি আর নিজের ছবি দেখি না। এটা একটা অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। আর দেখলেও তা বহু বছর পর।
অনীক দত্তর (পরিচালক) সঙ্গে কথা হয়েছে?
আবীর: আমার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। হাসানদা (ফিরদৌসুল হাসান, প্রযোজক) অনীকদা দু’জনের সঙ্গেই। কিছু-কিছু বিষয় যা আমার মনে হয়েছিল, বলেছিলাম। চলতি সপ্তাহে একটা কাণ্ড ঘটল, সোশ্যাল মিডিয়ায় দু’টো পাইরেটেড লিঙ্ক ঘুরছিল। ‘রক্তবীজ-২’ এবং ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’, আমি টিমকে রিপোর্ট করি। সেটা নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এক সাক্ষাৎকারে অনীকবাবু জানালেন, ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’ তাঁর পরিচালিত শেষ ছবি, খবর পেয়েছিলেন?
আবীর: সে তো শুনছি, উনি সবাইকেই বলছেন। এটা একেবারে সুখকর খবর নয়। ছবি পরিচালনার জন্য যে শারীরিক ধকল, তা হয়তো উনি নিতে পারছেন না। কিন্তু আমার চাই, উনি সুস্থ হয়ে আবার কাজে ফিরুক। ওঁর দর্শক এটাই চায়।
‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’-এর শুটিংয়ে শারীরিক সমস্যার কারণে উপস্থিতও থাকতে পারেননি...
আবীর: সেটা সম্ভব চিল না, আমরাও চাইনি। অনীকদার আরও দুঃশ্চিন্তা কাজ করছিল, আসলে পরিচালক সশরীরে না থাকলে স্বাভাবিকভাবে চাপ ছিল ওঁর। কিন্তু বাকি টিম দারুণ কাজ করেছে। সবাই অতিরিক্ত চাপের মুখে কাজ করেছে। কিন্তু রিহার্সালে দামিনী কিংবা সোহাগদি অনেকটা কাজ সহজ করে তুলেছে।
এক লক্ষণীয় বিষয় এ বছরের পুজোর ছবির এই প্রতিযোগিতায় দেখা গেল। অভিযোগ, কর্পোরেট বুকিং থেকে ফলস রিভিউ, বক্সঅফিসে তুলকালাম নম্বর গেম! আবার সব কটি ছবির আর্থিক সাফল্যও নেহাত কম নয়। হিসেব বলছে, বাংলা ছবি সামগ্রিকভাবে প্রায় ১৫ কোটির কাছাকাছি ব্যবসা করে ফেলেছে!
আবীর: অর্থনৈতিক মাপকাঠিতে ছবি মাপা হলে তা নিয়ে কথা বলা এক্তিয়ারের বাইরে। সামগ্রিকভাবে এটা বলতে পারি যে চারটে ছবি, দর্শকদের কথা রেখে তৈরি করেছেন, তা তাঁদের কাছে পৌঁছেছে। শুধু এটা মনে হয়েছে, এই ছবি নিয়ে প্রতিযোগিতার ছলে যে প্রচুর উত্তেজনা ইত্যাদি হচ্ছে, তা খানিক সংযত হলে ভাল হয়। আর যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁরা প্রত্যেকে ইন্ডাস্ট্রির অংশ। কারোর সাময়িকভাবে রাগ হচ্ছে, অভিমান হচ্ছে। মনে হয় না, ওটা দীর্ঘস্থায়ী হবে। সবাই আগামীদিনে সবার সঙ্গে কাজ করবে, এবং আরও ভাল কাজ হবে।
শুনলাম, ২৮ দিন পেরোতে, ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’-এর একটি স্পেশাল স্ক্রিনিং আয়োজন করা হচ্ছে, আপনি থাকবেন?
আবীর: আমি খবর পেয়েছি, আমার একটা অন্য কাজও আছে, যদি তার থেকে বেরোতে পারি, তাহলে নিশ্চয়ই উপস্থিত থাকব।
আপনি একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’ নিজ গুণে সাফল্যের মুখ দেখবে, এবং তা যে খুব ভুল নয়, তাও প্রমাণিত, গোঁদা বাংলা ভাষায় ছবি ভাল চলেছে। কিন্তু এটাও তো ঠিক ছবির প্রচারে আবীর চট্টোপাধ্যায় থাকতেন, তাহলে সাফল্যের যে হার ছবি যা দেখছে, তা বাড়ত নিশ্চয়ই....
আবীর: এটা স্বতঃসিদ্ধভাবে বলা খানিক মুশকিল। আমি শুধু আমার কথা বলছি না, যাঁরা ছবির কাজ করছি, তাঁদের সকলের ভেবে দেখা উচিৎ, যে ভাবে ভাবছি, প্রচাপ, বিপণন করে দর্শকের কাছে পৌঁছব, সেটাই কি একমাত্র উপায় নাকি অন্যান্য অল্টারনেটিভ উপায় আছে। কারণ আমরা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ছবির প্রচার করি, কিছু নিয়ম নতুন হয়, সেটা আবার একটা প্রথা ভাঙে। আমার মনে হয়েছে, ছবির কনটেন্ট যদি ভাল হয়, সেক্ষেত্রে, প্রচার কম হলেও মানুষের মুখে-মুখে ফিরবে। আমার এটাও মনে হয়, একেবারে শুরুর দিকে প্রচার গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একবার ছবিটা রিলিজ হয়ে গেলে, মুখে মুখে মানুষের মতামত, বা সংবাদমাধ্যমের লেখা, বা ব্যক্তিগত পরিসরে লেখা তা গুরুত্ব পায়। ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’র ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছিল। তবে এটা বলতে পারি টেকনিক্যাল কারণে আমি প্রচারে থাকতে পারিনি, সে কারণে উদ্বিগ্ন ভাব বা মনখারাপ ছিল। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, ছবি নিজগুণে চলাটাই কাম্য। সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
আচ্ছা, একজন অভিনেতা হিসেবে নয়, এই প্রশ্ন একেবারে একজন বাংলা ছবির দর্শক হিসেবে জিজ্ঞেস করছি, এই যে চার-চারটি ছবি পুজোয় মুক্তি পেল, এটা অনেকের মতে ভোট কাটাকাটি পরিস্থিতি, কী মনে হয়, যদি ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’ পুজোর সময় মুক্তি না পেত, তাহলে ব্যবসায়িক ফল আরও ভাল হওয়ার সম্ভাবনা থাকত?
আবীর: এটা নিয়ে আমি আগেও বলেছিলাম, সিনেমার মজাটা এখানেই, আমরা সুপার শিওর হয়ে সব বলতে পারি না। আমাদের বিভিন্ন হাঞ্চ কাজ করে। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে একটা জায়গায় পৌঁছনোর চেষ্টা করি। কিন্তু এই যে যা বলা হচ্ছে, পুজোর সময় কিংবা ছুটির সময় এতগুলো ছবি রিলিজ হচ্ছে, তা নিয়ে আমি বলতে পারি, ছুটির সময় বেশি সংখ্যক মানুষ দেখবেন, তা ঠিক, কিন্তু অন্য সময় মানুষ দেখবেন না, তা নয়। এই বছরেই এমন অনেক ছবি আছে, যা ছুটিতে রিলিজ করেনি, কিন্তু তাও নিজগুণে তা ভাল চলেছে। আবার এমন হয়েছে, ছুটির সময়ে রিলিজ করেও তা চলেনি, এটাও হয়েছে। এটা একটা কনস্ট্যান্ট ট্রায়াল এরর মেথডে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় ‘দ্য ওয়াল’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘শাহরুখ-সলমন একই দিনে ছবি রিলিজ করবে না’...
আবীর: কাদের সঙ্গে কাদের তুলনা করছেন, যাঁদের কথা বলছেন, তাঁরা ৩৫ বছর ধরে রাজত্ব করছেন, বিপুল ফ্যানবেস। ওঁদের উপর লগ্নি অনেক বেশি। ওঁদের সঙ্গে আমাদের ইন্ডাস্ট্রির তুলনা করতে পারি। প্রত্যেক ইন্ডাস্ট্রির একটা আলাদা পদ্ধতি আছে
শেষ প্রশ্ন, নিজেকে পুজোর ‘বক্সঅফিস স্টার’ শুনলে কেমন লাগে?
আবীর: আমার এই আলোচনায় ঢুকতে ইচ্ছে করে না। কারণ আমার সিনেমা করার একটা অন্য এক্সাইটমেন্ট আছে। বয়স এবং অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে বুঝতে পারছি, দায়িত্ব এবং প্রত্যাশা বাড়ছে, যার ফলে শুধুই আমার এক্সাইটমেন্ট-পছন্দ একমাত্র নির্ণায়ক নয়। এই যে ট্যাগগুলো যদি কেউ ভালবেসে দেন, সেটা তার ভালবাসা, বা শুভেচ্ছা, অনেকে টোন কাটতে বা কাঠি করতেও দেন, সেটা বুঝতে পারি। সেটা নিয়ে যদি আমি ভাবতে বসি, তাহলে আমার কাজটা নিয়ে ভাবা আর হবে না।