
শেষ আপডেট: 21 June 2023 14:59
মানুষ এবং হাতির এক মানবিক গল্প নিয়ে জনপ্রিয় অভিনেতা দেবদূত ঘোষের পরিচালিত দ্বিতীয় ছবি 'আদর' ২৩ জুন প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেতে চলেছে। রবীন্দ্র যুগের প্রথিতযশা লেখক প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় রচিত 'আদরিনী' গল্পের উপর ভিত্তি করেই এই ছবির কাহিনির বিন্যাস। এই বছর প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের জন্মের ১৫০ বছর পূর্তিতে ছবির মাধ্যমে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করবেন পরিচালক তথা অভিনেতা দেবদূত ঘোষ। তাঁর প্রথম পরিচালিত শিশুদের ছবি ছিল শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ছোট গল্প অবলম্বনে 'ভল্লু সর্দার'। ইতিপূর্বে ছোট পর্দা এবং মঞ্চে দেবদূতকে পরিচালকের ভূমিকায় দেখা গেছে ।



লেখকের এই গল্পের প্রতি আকর্ষিত হওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করতেই পরিচালক দেবদূত জানালেন, 'একজন মানুষ এবং পোষা হাতির মধ্যে সুন্দর সম্পর্কের গল্পটা যখন পড়ি তখন লেখক প্রভাতকুমারের অপূর্ব বর্ণনায় মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যাই। গল্পে একজন মানুষ এবং একটা প্রাণীর মধ্যে চিরন্তন বন্ধনের এক অপূর্ব ব্যাখ্যা তিনি তুলে ধরেছেন। যা বাবা মেয়ের মতোই একটা মিষ্টি বন্ধন এবং চিরকালীন এক সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে। গল্পটি শেষ হয় বাবা এবং তার পালিত কন্যা আদরের অসুস্থতা দিয়ে। পরবর্তীকালে তারা উভয়ই এমন একটি পৃথিবীতে চিরকালের জন্য মিলিত হয় যেখানে প্রজাতির মধ্যে কোনও বৈষম্য নেই। আমি গল্পের আবেগে এতটাই অনুপ্রাণিত হই যে তখনই সিদ্ধান্ত নিই এই গল্প নিয়ে আমি ছবি তৈরি করব। আমি এমন একটি অভিনব বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্র করতে চেয়েছি যার মধ্যে সর্বজনীন আবেদন রয়েছে।'



ছবিতে গল্পকে কতটা অবিকৃত রাখা হয়েছে প্রশ্নের উত্তরের পরিচালক জানান, 'সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আমাকে বলেছিলেন সাহিত্য নিয়ে যদি কাজ করিস সে ক্ষেত্রে গল্প নিয়ে কোনও কায়দা করবি না। গল্পের মধ্যে যে রসদ থাকে সেই জায়গাটা যেন নষ্ট না হয়। তাই এই গল্প পড়ার সময় আমি যেভাবে কল্পনা করেছি ঠিক সেই ভাবেই ছবির চিত্রনাট্য লিখেছি। বাবা মেয়ের গল্পে বাবা হলেন একজন মানুষ আর মেয়ে হল একজন হাতি। তাদের সম্পর্ক, ভালবাসা, বিচ্ছেদ গল্পের সেই জায়গাগুলো আমি অবিকল অবিকৃত রেখেছি। তবে সবশেষে পরিচালকের তো একটা দৃষ্টিকোণ থাকেই। সেখানে আমি বলতে চেয়েছি মানব মানবীর সম্পর্কই শেষ কথা নয়। পৃথিবীটা শুধু মানুষের একার নয়। গাছপালা, পশুপাখি, প্রকৃতি জন্তু-জানোয়ারের প্রতি যেন মানুষের একটা সহজ মন থাকে। পরিচালক হিসেবে ছবিতে এই জায়গাটা শুধু রেখেছি।'


হাতির সঙ্গে শ্যুটিং করার অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে পরিচালকের বক্তব্য, 'পুরো ছবির শ্যুটিং হয়েছে ত্রিপুরার কৈলাশহরে একটি পাহাড়ি অঞ্চলে। এখানে একটি পুরনো বাংলোকে আমরা সংস্কার করে সেখানে শ্যুটিং করেছি। হাতি যে মানুষের কথা এতটা বোঝে সেটা জানতাম না। কাজ করতে গিয়ে দেখেছি হাতিকে আদর করলে সে বুঝতে পারে, বিচ্ছেদ হলে সে কাঁদে যা ছবির দৃশ্যে ধরা পড়েছে। শ্যুটিং-এর সময় আমরা উপস্থিত সকলে সেটা উপলব্ধি করেছি। মানুষ সৃষ্টি হওয়ার অনেক আগে এই পৃথিবীতে হাতির সৃষ্টি হয়। কয়েক লাখ বছর ধরে হাতি এখানে রয়েছে। আমাদের ছবিতে যে অল্পবয়সি হাতি অভিনয় করেছে তার আসল নাম জয়মালা, ডাকনাম মণি। তিন ঘন্টা শ্যুটিং করার পর আমরা জয়মালাকে ছেড়ে দিতাম। ও ঘুরে বেড়াত, কলা গাছ খেত। আসলে হাতিকে নিয়ে টানা শ্যুটিং করা যায় না। সেজন্যই দু'বছর ধরে সময়ের ব্যবধান রেখে শ্যুটিং করতে হয়েছে। জয়মালা আসলে পোষ্য হাতি। ত্রিপুরার কৈলাশহরে ৩০ টি হাতি রয়েছে। এখানে যেমন মানুষ বাড়িতে গরু পোষেন ওখানে মানুষ হাতি পোষেন। যেদিন ছবির শ্যুটিং শেষ হয়ে গেল সেদিন খুব মন খারাপ হয়েছিল। মাঝে আমি আবার গিয়ে জয়মালার সঙ্গে দেখা করে এসেছি। ওকে কথা দিয়েছি আবার আমি ওর সঙ্গে দেখা করতে যাব।'



এই ধরনের গল্পে সংলাপ লেখা কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল ছবির সংলাপ রচয়িতা পদ্মনাভ দাশগুপ্তকে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি উত্তরে বলেন, 'সাহিত্য থেকে ছবির গল্পে চিত্রনাট্য বা সংলাপ লেখা নিঃসন্দেহে বড় চ্যালেঞ্জ তো বটেই। প্রথমত এই ধরনের খ্যাতনামা সাহিত্যিকদের লেখা নিয়ে যখন কাজ করতে হয় তখন তো আগের থেকেই একটা ভাল লাগা তৈরি হয়ে থাকে। সংলাপ লেখার ক্ষেত্রে চরিত্র অনুযায়ী সংলাপগুলো তৈরি করি। সেই চরিত্রগুলো গল্পের যে গতি বা মোচড় দিয়ে যাবে সেই অনুযায়ী তাঁদের প্রতিক্রিয়া ধরা পড়ে এমনভাবেই লেখা হয় সংলাপ। বাকিটা তো মূলত গল্প যেভাবে এগিয়ে চলে তার গতিকে এগিয়ে রাখার জন্য এবং ঘটনাগুলোকে একের পর এক জুড়ে দেওয়ার জন্য করা হয়। কিছুটা অবশ্য দেবদূতের সঙ্গে আলোচনা করেছি। ওর মাথায়ও ছিল কিভাবে চরিত্রের সংলাপগুলো হবে। আপাতদৃষ্টিতে ছবিতে রজতাভ দত্তের যে বাহ্যিক কাঠিন্য এবং তাঁর অন্তরে যে আবেগপূর্ণ একজন মানুষ বিরাজ করেন একটা সময় তাঁর কাছে নিজের মেয়ের মতোই হয়ে ওঠে আদরিনী, সেই জায়গাটা খুব সচেতন এবং যত্ন সহকারে আমাকে সংলাপ লিখতে হয়েছে। কারণ উল্টোদিকে যে আবেগের জায়গাটা রয়েছে অর্থাৎ আদরের কথা বলছি সেটা তো আমরা বোঝাতে পারব না। কারণ সে তো কথা বলতে পারে না। ফলে তার ছবির সাহায্যে যতটুকু এবং ছবির সংলাপ আর প্রভাত বাবু যতটুকু লিখেছেন সেভাবে আমি লিখেছি । তবে আমার মনে হয় এতটাই সংবেদনশীল একটা জায়গা যেটা খুব চমৎকারভাবে ছুঁয়ে গেছে আদরের আবেগ। তাকে ছুঁতে অথবা বুঝতে আশা করি দর্শকদের অসুবিধা হবে না।'

গল্প মোটামুটি এইরকম : আদর এক হাতির গল্প । ত্রিপুরার খারকাই নামে একটি ছোট গ্রামকে ঘিরে গল্প আবর্তিত হয়েছে। গল্প শুরু হয় শ্রী জয়রাম মুখোপাধ্যায় নামে গ্রামের এক আইনজীবীকে কেন্দ্র করে। জয়রাম একজন মাঝারি আয়ের ব্যক্তি। যিনি সেই এলাকার এক জমিদার পরিবারের অহংকারের যোগ্য প্রত্যুত্তর দিতে তাঁর পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করে রাখা সমস্ত অর্থ দিয়ে একটি হাতি কেনেন। হাতিটিকে নিজের মেয়ের মতো ভালবেসে নাম রাখেন আদর। আদর হয়ে ওঠে তাঁর পরিবারেরই সদস্য। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বন্ধুত্বপূর্ণ স্বভাবের জন্য গ্রামবাসীদের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে হাতিটি। কিন্তু ঘটনাচক্রে একদিন জয়রামকে সংকটময় পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে পরিবারের চাপে আদরকে বিক্রি করে দিতে হয়। এর পরের ঘটনা জানতে হলে ছবিটি দেখতে হবে।
জয়রাম মুখোপাধ্যায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন রজতাভ দত্ত। অন্যান্য শিল্পীরা হলেন তুলিকা বসু, বাসবদত্তা চট্টোপাধ্যায়, প্রদীপ চক্রবর্তী, বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়, মানসী সিনহা, বাসন্তী চট্টোপাধ্যায়, পারিজাত চৌধুরী প্রমুখ।
ছবিতে বিশেষ অতিথির ভূমিকায় দেখা যাবে সব্যসাচী চক্রবর্তী এবং জয়মালা (আদর) কে।
ছবির কাহিনি প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়।
চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন দেবদূত ঘোষ।
সংলাপ রচয়িতা পদ্মনাভ দাশগুপ্ত।
সুরারোপ করেছেন পণ্ডিত তন্ময় বসু।
সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন অর্ঘ্য কমল মিত্র। চিত্রগ্রহণ করেছেন অসীম বসু। ছবিটি প্রযোজনা করেছে শ্রেয়সী এন্টারটেইনমেন্ট।
‘রাঞ্ঝনা’র দশ বছরে নতুন ছবির ঘোষণা আনন্দ-ধনুশের! প্রকাশ্যে জ্বলন্ত টিজার