বক্স অফিসের অঙ্ক বলছে—‘ন্যারেটিভ পলিটিক্স’ এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই সেটাই নতুন ফর্মুলা। কিন্তু এই ফর্মুলা কি সত্যিই দর্শকের পছন্দ, নাকি দর্শকদের আবেগকে ছুঁয়ে যাওয়া এক সূক্ষ্ম কৌশল?

শেষ আপডেট: 26 March 2026 19:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বলিউডে এখন শুধু নায়ক-নায়িকার প্রেম নয়, চিত্রনাট্য়ের কেন্দ্রে উঠে আসছে দেশ, ইতিহাস আর মতাদর্শও। বক্স অফিসের অঙ্ক বলছে—‘ন্যারেটিভ পলিটিক্স’ এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই সেটাই নতুন ফর্মুলা। কিন্তু এই ফর্মুলা কি সত্যিই দর্শকের পছন্দ, নাকি দর্শকদের আবেগকে ছুঁয়ে যাওয়া এক সূক্ষ্ম কৌশল?
গত কয়েক বছরে একাধিক ছবি এই প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে। যেমন দ্য কাশ্মীর ফাইলস (The Kashmir Files), একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার উপর ভিত্তি করে তৈরি এই ছবি বক্স অফিসে বিপুল সাফল্য পায়। অনেক দর্শকের কাছে এটি ছিল ‘চোখ খুলে দেওয়ার’ মতো অভিজ্ঞতা, আবার সমালোচকদের একাংশ একে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলেও দাবি করেন।
একইভাবে দ্য কেরালা স্টোরি (The Kerala Story) নিয়েও শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। ছবিটি মুক্তির আগেই রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। ফলাফল? বিতর্কই যেন বাড়িয়ে দেয় দর্শকের কৌতূহল, আর সেটাই প্রভাব ফেলে বক্স অফিসে।
অন্যদিকে উরি: দ্য সারজিক্যাল স্ট্রাইক (Uri: The Surgical Strike) দেখিয়ে দেয়, দেশাত্মবোধক আবেগ কীভাবে সরাসরি দর্শকের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারে। “How’s the josh?” এই সংলাপই হয়ে ওঠে এক জাতীয় স্লোগান। একই ধারায় শেরশাহ (Shershaah)-এর মতো ছবিও দেশপ্রেমের আবেগকে সামনে রেখে দর্শকের মন জয় করে।
তবে সব ছবিই যে একই প্রতিক্রিয়া পায়, তেমনটা নয়। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, দেশাত্মবোধের ছোঁয়া থাকলেও যদি চিত্রনাট্য দুর্বল হয়, দর্শক তা সহজে গ্রহণ করে না। ফলে একটা বিষয় স্পষ্ট, শুধু ‘দেশপ্রেম’ থাকলেই সাফল্য নিশ্চিত নয়, তার সঙ্গে প্রয়োজন গল্প বলার দক্ষতা।
এই প্রবণতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ‘হিস্ট্রি বনাম ইন্টারপ্রিটেশন’। সম্রাট পৃথ্বীরাজ (Samrat Prithviraj) বা তানাজি (Tanhaji)-এর মতো ছবিতে ইতিহাসকে নতুনভাবে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে। কেউ তা গ্রহণ করেছেন গর্বের সঙ্গে, আবার কেউ প্রশ্ন তুলেছেন—‘ইতিহাস কি বদলে দেওয়া হচ্ছে?’
সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রবণতা আরও চোখে পড়ে ধুরন্ধর-এর চিত্রনাট্যে, অনেকেই এই ছবির সঙ্গে রিল-রিয়েল লাইভ গুলিয়ে ফেলছেন। আদিত্য ধর পরিচালিত ধুরন্ধর (Dhurandhar: The Revenge) যেমন মুক্তির আগে থেকেই আলোচনার কেন্দ্রে জায়গা করে নেয়। এর স্কেল, অ্যাকশন আর জাতীয়তাবাদী আবহ নিয়ে ইতিমধ্যেই দর্শক মনে তৈরি হয়েছে বিপুল উত্তেজনা। এখানেও বিশেষত সেই ‘দেশপ্রেম’। যা বক্স অফিসে ঝড় তুলেছে।
যদিও এই ট্রেন্ড কিন্তু একেবারে নতুন নয়। বর্ডার (Border) একসময় যুদ্ধের আবেগকে যেভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল, তা আজও স্মরণীয়। সেই ধারাই বজায় রেখে বর্ডার ২ (Border 2) প্রেক্ষাগৃহে দর্শক টানতে সফল হয়।
একইভাবে গদর (Gadar: Ek Prem Katha) এবং তার সিক্যুয়েল গদর ২ (Gadar 2) দেখিয়ে দিয়েছে, দেশভাগ, সীমান্ত আর জাতীয় আবেগ, এখনও দর্শকের মনে প্রবল সাড়া ফেলতে পারে। বিশেষ করে ‘গদর ২’-এর বক্স অফিস সাফল্য প্রমাণ করেছে, এই ফর্মুলা এখনও কার্যকর।
এখানেই তৈরি হচ্ছে মূল দ্বন্দ্ব—দর্শকের আবেগ বনাম প্রোপাগান্ডার অভিযোগ। একদিকে এই ছবিগুলি জাতীয় পরিচয় ও আবেগ জাগিয়ে তোলে, অন্যদিকে আশঙ্কা থাকে, সিনেমার ভাষা ব্যবহার করে দর্শকমনে কোনও নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হচ্ছে কি না।
ইন্ডাস্ট্রির দিক থেকেও এই ট্রেন্ড গুরুত্বপূর্ণ। বড় বাজেটের প্রযোজকেরা এখন বুঝে গিয়েছেন, এই ধরনের কনটেন্টে ঝুঁকি কম, কারণ বিতর্ক থাকলেও তা দর্শক টানে। ফলে ‘ন্যারেটিভ পলিটিক্স’ এখন অনেকটাই ‘সেফ বেট’।
কিন্তু বক্স অফিসের সাফল্যের শেষ কথা কি এটাই? ইতিহাস বলছে, দর্শক কখনও একঘেয়ে চিত্রনাট্যের হাত ধরে থাকতে চায় না। একসময় রোম্যান্স, তারপর অ্যাকশন, এখন ন্যারেটিভ পলিটিক্স, প্রতিটি ঢেউয়েরই একটা সময়সীমা থাকে। কারণ শেষ পর্যন্ত, আবেগ যতই শক্তিশালী হোক, দর্শক কিন্তু গল্পেই বিশ্বাস রাখতে চায়, প্রোপাগান্ডায় নয়।