কলকাতার ব্যস্ত রাস্তায়, উৎসবের ভিড়ের মাঝেই নজর পড়ে এক মানুষের দিকে। মাথার চুল পাকা, শরীরে দুর্বলতা, মুখে কালো মাস্ক, গায়ে সাদা পাঞ্জাবি।

দেব
শেষ আপডেট: 27 September 2025 18:31
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কলকাতার ব্যস্ত রাস্তায়, উৎসবের ভিড়ের মাঝেই নজর পড়ে এক মানুষের দিকে। মাথার চুল পাকা, শরীরে দুর্বলতা, মুখে কালো মাস্ক, গায়ে সাদা পাঞ্জাবি। এক হাতে লাঠি, অন্য হাতে স্টিলের বাটি। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যে দৃশ্য হৃদয় কাঁপিয়ে দেয় তা হল গলায় ঝোলানো একখানা পোস্টার। সেখানে লেখা—“আমি ক্যান্সার-এর রোগী। বর্তমানে বিপদমুক্ত। আমি শারীরিক কোনো কাজ করতে পারি না। আমার একমাত্র সন্তান মৃত। আমি বেঁচে থাকার জন্য আপনাদের কাছে সামান্য অর্থ ভিক্ষা চাইছি।” একই বার্তা ইংরেজিতেও লেখা, যেন একবার চোখ পড়লেই মানুষ বুঝে যায় তাঁর যন্ত্রণা।
জানা গিয়েছে, এই বৃদ্ধের নাম চিরঞ্জিত সেনগুপ্ত। দুটি ছবিতে ধরা পড়েছে তাঁর জীবনের করুণ কাহিনি। একসময় কলা বিক্রি করে সংসার চালাতেন তিনি। ঘরে ছিল স্ত্রী আর একমাত্র ছেলে। সংসার ভালোই চলছিল। কিন্তু হঠাৎই আঘাত নামল জীবনে। হৃদরোগে চলে গেলেন স্ত্রী। তারপর একই কারণে চলে গেলেন একমাত্র ছেলেও। তার কিছুদিন পর ধরা পড়ল ক্যান্সার। সমস্ত দিক বন্ধ হয়ে গেলে একসময় ঠিক করেছিলেন আত্মহত্যা করবেন। কিন্তু তখনই মনে পড়ে—ছেলে-বউ কেউ নেই, তাহলে নাতনিকে কে দেখবে? সেই চিন্তাই তাঁকে আবার টেনে রাখল জীবনের সঙ্গে।
আজ অসুস্থ শরীর নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে হয় তাঁকে। দুর্গাপুজোর কোলাহলে যখন হাতিবাগানে পা রাখার জায়গা নেই, তখন বিনোদিনী সিনেমাহলের সামনে দেখা গেল তাঁকে—পা ঘষতে ঘষতে লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটছেন, হাতে বাটি।
মহা চতুর্থীর রাতে, যখন হাজারো মানুষ নতুন জামা পরে দেবী দর্শনে মেতে উঠেছেন, তখন এই এক বৃদ্ধ মানুষের ছবি যেন উৎসবের আনন্দের মাঝেই নিঃশব্দে লিখে দিল জীবনের অনিশ্চয়তার কথা। পরিস্থিতি কার কখন কোন দিকে মোড় নেবে, সত্যিই কেউ জানে না।
এই ছবি পৌঁছে গেছে হাজারো মানুষের কাছে। আলোচনায় এসেছে রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সেলিব্রিটি, সাধারণ মানুষ পর্যন্ত। চোখ এড়ায়নি বাংলার মেগাস্টার দেবেরও। নিজের ফেসবুকে তিনি ছবিটি শেয়ার করে লিখলেন—“ কেউ কি আমাকে তাঁর নম্বরটি দিতে পারেন? আমি কৃতজ্ঞ থাকব। আমার টিম যোগাযোগ করে সব ব্যবস্থা করবে।” এতেই বোঝা যায়, তিনি শুধু পর্দার নায়ক নন, বাস্তবের মানুষদের দুঃখ-কষ্টেও তিনি পাশে দাঁড়াতে ভোলেন না।
দেব-এর এমন দৃষ্টান্ত নতুন নয়। করোনা সংক্রমণের সময় তিনি নিজের সাংসদ এলাকায় বিনামূল্যে খাবার পৌঁছে দিয়েছিলেন রোগীদের জন্য। বিদেশে আটকে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের কলকাতা ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায়ও সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি। করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিজের সাংসদ এলাকা ঘাটাল থেকে এক কোটি টাকা অনুদান দিয়েছিলেন। পর্দার বাইরেও তিনি মানুষের ভরসা হয়ে উঠেছেন, আর এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে দেয় একটি শেয়ার বা একটি কল কতখানি জীবনদায়ী হতে পারে।
রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই বৃদ্ধ মানুষটির ছবিটি আমাদের চোখ বন্ধ করতে দেয় না। তাঁর গলায় ঝোলানো দুঃখের কাগজ আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবন চলমান, আর সেই চলমান জীবনে কখন যে সাহায্যের হাত প্রয়োজন হয়ে ওঠে তা বলা যায় না। হয়তো একটুখানি সহানুভূতি, একটি ফোন নম্বর, একটি সহযোগিতা—এসবই তাঁর জীবনে কিছুটা আলো এনে দিতে পারে। বড় তৌফিক লাগে এগিয়ে আসতে, একটি কল, একটি শেয়ার, একটি করুণা কখনো কখনো হয়ে ওঠে কারও বেঁচে থাকার একমাত্র আশ্রয়। দেব বলেছেন—“ আমি কৃতজ্ঞ থাকব।”—এবং সেই কথার ভেতরেই লুকিয়ে আছে মানবিকতার অমূল্য বার্তা।