অভিনেতা ও বিজেপি বিধায়ক হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় বিয়ের কয়েকটি ছবি সমাজমাধ্যমে প্রকাশ্যে আসতেই বিস্ফোরণ ঘটে—ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছাপিয়ে তা পৌঁছে গেল অভিযোগ, যন্ত্রণা ও পাল্টা বক্তব্যের প্রকাশ্য মঞ্চে।

শেষ আপডেট: 21 January 2026 20:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অভিনেতা ও বিজেপি বিধায়ক হিরণ চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় বিয়ের কয়েকটি ছবি সমাজমাধ্যমে প্রকাশ্যে আসতেই বিস্ফোরণ ঘটে—ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছাপিয়ে তা পৌঁছে গেল অভিযোগ, যন্ত্রণা ও পাল্টা বক্তব্যের প্রকাশ্য মঞ্চে। বেনারসের ঘাটে সাত পাকে বাঁধা পড়ার সেই মুহূর্তের রেশ কলকাতায় এসে আটকে গেল আইনি বৈধতা, মানসিক আঘাত আর নৈতিক প্রশ্নের জটিল জালে।
প্রথমে মুখ খুললেন হিরণের প্রথম স্ত্রী অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায়। সংবাদমাধ্যমে তাঁর কণ্ঠে ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ আর ভাঙা মনের হাহাকার। তাঁর স্পষ্ট দাবি—এই বিয়ে সম্পূর্ণ বেআইনি, এর কোনও আইনি মূল্য নেই। তিনি বললেন, যে মানসিক আঘাত তাঁকে ও তাঁর মেয়েকে সহ্য করতে হয়েছে, তা ভাষায় ধরা কঠিন। বাইরে থেকে হাসিখুশি ভ্লগ, সমাজমাধ্যমে আনন্দের ছবি—সবকিছুর আড়ালে নাকি ছিল ভয়ানক মানসিক ভাঙন। তাঁর কথায় উঠে আসে ঘুমের ওষুধ খাওয়ার প্রসঙ্গ, গভীর মানসিক ক্ষয়ের ইঙ্গিত। অনিন্দিতার দাবি, এই দীর্ঘ মানসিক চাপের প্রভাব সরাসরি পড়েছে তাঁদের মেয়ের শরীরেও—হৃদস্পন্দনের সমস্যা দেখা দিয়েছে, ডাক্তার দেখাতে হয়েছে। (Ritika giri, Hiran Chatterjee, Anidita chatterjee)
একজন বাবার কাছ থেকে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ মেনে নেওয়া কঠিন—এই কথাটাই বারবার ফিরে এসেছে তাঁর বক্তব্যে। দুঃখের সঙ্গেই তিনি বলেন, বাবা-মাকে মানুষ বেছে নেয় না, আর সেই কারণেই হয়তো এমন একজন মানুষের সঙ্গেই জীবন কাটাতে হয়েছে, যিনি সবচেয়ে কাছের মানুষদেরই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেন। তিনি আরও দাবি করেন, হিরণের দ্বিতীয় স্ত্রী তাঁদের মেয়ের বয়সের থেকে সামান্যই বড়। সেই প্রসঙ্গে তিনি কটাক্ষের সুরে বলেন, কোনও ভদ্র পরিবারের মেয়ে কি কখনও জেনেশুনে একজন বিবাহিত পুরুষের জীবনে প্রবেশ করে? একসময় শুনেছিলেন, ওই তরুণী নাকি পার্টি পলিটিক্স করতেন—১৮ বছর বয়সে কোন ঘরের মেয়েরা রাজনীতিতে জড়ায়, তা তিনি জানেন না বলেই মন্তব্য করেন অনিন্দিতা। পরে যোগ করেন, রাজনীতি না হলেও অন্য ধরনের ‘পলিটিক্স’ যে ছিল, সেটাও এখন পরিষ্কার। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি আঙুল তোলেন মূল অভিযুক্তের দিকেই—তাঁর মতে, অন্যায়টা নিশ্চিতভাবেই করেছেন হিরণ।
এই উত্তাল পরিস্থিতির মাঝেই প্রথমবার প্রকাশ্যে নিজের অবস্থান জানালেন হিরণের দ্বিতীয় স্ত্রী হৃতিকা গিরি। ইনস্টাগ্রামে দেওয়া একটি দীর্ঘ বিবৃতিতে তিনি সংবাদমাধ্যমের কাছে আপাতত মুখ না খোলার আবেদন জানান। তাঁর লেখায় উঠে আসে শারীরিক অসুস্থতা ও মানসিক অস্থিরতার কথা—সাম্প্রতিক একটি অপারেশনের পর চিকিৎসকের পূর্ণ বিশ্রামের নির্দেশে রয়েছেন বলেই জানান তিনি। তবে অনিন্দিতার বক্তব্যের কিছু অংশ নিয়ে তিনি ব্যাখ্যা দেওয়া জরুরি মনে করেন।
হৃতিকার দাবি অনুযায়ী, তাঁর বয়স নিয়ে ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে। তিনি জানান, হিরণ ইতিমধ্যেই ডিভোর্সের আইনি নোটিস পাঠিয়েছেন। এই বিয়ে হঠাৎ করে নয়—অনেক আগেই তাঁদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। গত পাঁচ বছর ধরে তাঁরা একসঙ্গেই ছিলেন, এবং এই সম্পর্কের কথা অনিন্দিতাও জানতেন বলেই দাবি তাঁর। কোনও কিছুই লুকোনো ছিল না—হিরণের সব অ্যাকাউন্ট ছিল প্রকাশ্য। তাই এত বছর পরে প্রশ্ন তোলার কারণ নিয়েই তিনি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন।
হৃতিকা আরও বলেন, সম্প্রতি ছয় মাস একসঙ্গে থাকার যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভুল। ওই সময়ের মধ্যে হিরণ তাঁর মেয়ের সঙ্গেই ছিলেন—২০২৪ সালের ৯ নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। শুধুমাত্র কিছু ব্যক্তিগত কাজের সূত্রে মেয়ের জন্মদিনের সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে জানান হৃতিকা।

নিজেদের বিয়েকে তিনি ব্যাখ্যা করেন একান্ত মানসিক শান্তির খোঁজ হিসেবে। কোনও আড়ম্বর, কোনও বিলাসিতা ছিল না। আগুনকে সাক্ষী রেখে, বেনারসের মতো পবিত্র স্থানে, গঙ্গার সামনে বৈদিক রীতিতে এই বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে বলেই জানান তিনি। কাশী বিশ্বনাথ ধাম থেকে পাওয়া ভস্ম তাঁর কাছে আশীর্বাদের প্রতীক, আর সমস্ত পূজার সামগ্রী এসেছে বৃন্দাবন ও মা বরনাসা মায়ের মন্দির থেকে। ষোলো সিঁদুর আর বিশ্বাস—এই নিয়েই তাঁদের নতুন জীবন শুরু।
বিবৃতির শেষে হৃতিকা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, যদি কেউ মনে করেন এই বিয়ে অবৈধ, তবে আইনি পথে এগোনোর জন্য তিনি প্রস্তুত। এর বেশি কিছু বলার নেই বলেই জানান তিনি, সকলকে প্রণাম জানিয়ে আপাতত এখানেই ইতি টানেন।
এই সব কোলাহলের মাঝেই কৌতূহল বাড়ে—কে এই হৃতিকা গিরি? খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি মেদিনীপুরের মেয়ে। আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, সাম্মানিক স্নাতক ডিগ্রি রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। যোগব্যায়ামে জাতীয় স্তরে সোনা জয়ের কৃতিত্বও আছে। ইনস্টাগ্রামে চোখ রাখলেই দেখা যায় নানা ছবি ও ভিডিও—সেখান থেকেই ধীরে ধীরে উঠে আসে তাঁর বহুমুখী পরিচয়। ২০১৯ ও ২০২২ সালে দুটি সুন্দরী প্রতিযোগিতায় সেরা হওয়ার খবরও মিলেছে। পাশাপাশি, একাধিক মিউজিক ভিডিওতে তাঁর উপস্থিতি জানান দেয়—নিজের মতো করে পরিচিতি গড়ার পথেই ছিলেন তিনি।
একদিকে আইনের প্রশ্ন, অন্যদিকে আবেগের ভার—এই মুহূর্তে হিরণের জীবনের এই অধ্যায় শুধু একটি বিয়ের গল্প নয়, বরং বহু মানুষের মানসিক ক্ষত, অভিযোগ আর আত্মপক্ষ সমর্থনের এক জটিল দলিল। আগুনকে সাক্ষী রেখে শুরু হওয়া এই সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত কী রায়ে দাঁড়াবে—সেটা কি আদালত বলবে, নাকি সময়ই দেবে তার চূড়ান্ত উত্তর?