শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
এ ছবি রিলিজের আগেই ছবির গান সুপারহিট হয়ে গেছিল। ‘পিউ বোলে পিয়া বোলে’র বোলে মেতেছিল গোটা দেশ। অনেকদিন পরে হটকেকের মতো বিকিয়েছিল এই গানগুলির অ্যালবাম। সবাই অপেক্ষা করছিলেন, বাঙালি পরিচালক প্রদীপ সরকারের নতুন ছবির। অনেকেই অবশ্য জানতেন না, পর্দায় আসছে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'পরিণীতা'।
সেই পরিণীতা আজ দেড় দশক পার করে ফেলল! ২০০৫ সালের ১০ জুন রিলিজ় করেছিল এ ছবি।
এখনও অনেকের মনের মণিকোঠায় উজ্জ্বল এই ছবি, বলিউড মেলডির প্রথমদিকেই এখনও রাজত্ব করছে এই সিনেমার গানগুলি। ২০০৫ সালের এই দিনেই রিলিজ় করেছিল প্রদীপ সরকারের 'পরিণীতা'। ছবির মুখ্য ভূমিকায় ললিতা চরিত্রে বিদ্যা বালান। এই ছবি দিয়েই বলিউডে সকলে চিনেছিলেন বিদ্যাকে। একের পর এক ফ্লপ ছবির পরে এই সাফল্য এসেছিল বিদ্যার। কেমন ছিল সে সাফল্যের গল্পটা?

কলেজ পাশ করার পর ছবিতে কাজ করার স্বপ্ন নিয়ে আসেন বিদ্যা। কিন্তু কেরিয়ারে একটিও ভাল ছবি নেই তখন। বাবা, মা আর বোনের সহযোগিতা থাকলেও, সময় বড় কঠিন ছিল। বিদ্যা অবশ্য সরে আসেননি নিজের নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় থেকে। বাড়ির সামনের মন্দিরে সাঁই বাবার কাছে প্রার্থনাও করেতেন তিনি। ১৫-১৬টি টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে এবং ইউফোরিয়া ও সুভা মুদ্গলের মিউজিক ভিডিওতে মডেল হিসেবে কাজ করে খানিক মুখ চিনিয়েছিলেন বিদ্যা। এগুলির অধিকাংশের পরিচালক আবার সেই প্রদীপ সরকারই।
তিনিই মাস্টারপিস এক ছবি করলে বিদ্যাকে নিয়ে। তখনও ক্যাসেট যুগ শেষ হয়নি, সিডি প্লেয়ারের রমরমা। পরিণীতার গানের অ্যালবাম প্রতিটা মিউজিক স্টোরে প্রথম সারিতে। ক্যাসেট ও সিডি দুই-ই হু হু করে বিক্রি হতে থাকল। তখন টিভিতেও মিউজিক চ্যানেলগুলোর খুব রমরমা। সেখানেও পরিণীতার মিউজিক ভিডিও বারবার মুগ্ধ করছে শ্রোতা-দর্শকদের। ফিরে ফিরে আসছে গঙ্গা, হাওড়া ব্রিজ, নৌকায় সেফ আলি খান আর বিদ্যা বালান। বাঙালি প্রেমের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করল বলিউডের এই ছবি।

শরৎচন্দ্রের পরিণীতা কিন্তু আগেও বহুবার সিনেমা হয়েছে হিন্দি ও বাংলায়। ১৯৪২ সালে প্রথম হিন্দি ছবি পরিণীতা করেন পশুপতি চট্টোপাধ্যায়। ১৯৫৩-তে বিমল রায় হিন্দিতে আবারও করেন এই ছবি। অভিনয়ে অশোক কুমার-মীনাকুমারী। ১৯৬৯ সালে অজয় কর বাংলা ছবি করেন পরিণীতা, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে। এর পরে বাংলাদেশেও ১৯৮৬ সালে আলমগীর কবির করেন এই ছবি। কিন্তু ২০০৫-এর ছবি ভেঙে দেয় সব রেকর্ড। এ ছবির চিত্রনাট্যকার বিধু বিনোদ চোপড়া ও প্রদীপ সরকার। প্রযোজনা করেছিলেন বিধু বিনোদ চোপড়া ।
তবে এর আগে নায়িকা রূপে বিদ্যার মুখে প্রথম সিনেমার আলো পড়েছিল কিন্তু বাংলা ছবি দিয়েই। ২০০৩ সালে গৌতম হালদার পরিচালিত "ভাল থেকো" ছবিতে আনন্দী নামের এক জাতিস্মর নারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন বিদ্যা। স্ক্রিন শেয়ার করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। সঙ্গে পরমব্রত ও জয় সেনগুপ্ত। 'ভালো থেকো' তে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কারও পান বিদ্যা।
ছবিটা আলোচিত ও প্রশংসিত হলেও ব্যবসা সফল হয় না। কিন্তু ঐ বাংলা ছবিতে বিদ্যার অভিনয় দেখেই প্রদীপ তাঁকে পরিণীতা ছবির নায়িকা ললিতার জন্য ভাবেন। এর আগে তো একসঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিলই। কিন্তু ভাল থেকো দেখার পরে, বিদ্যা বালানের উপস্থিতি অনিবার্য হয়ে ওঠে প্রদীপের পরিণীতায়। ঢলোঢলো বাঙালি লক্ষ্মীশ্রী মুখ, লম্বা বেণী, লাজুক হাসি, বড় লাল টিপ-- সব মিলিয়ে পারফেক্ট 'পরিণীতা' হয়ে ওঠেন বিদ্যা। ছবি রিলিজ়ের আগে পোস্টারে বিদ্যার ছবি আসতেই তা মন কেড়ে নেয় দর্শকদের।

অন্যদিকে সেফ আলি খানের কেরিয়ারের মরা গাঙেও জোয়ার এনেছিল এই ছবির শেখর চরিত্র। একসময় সেফকে শুনতে হতো, ওঁকে টিপ পরিয়ে দিলেই শর্মিলা ঠাকুরের মতো দেখতে লাগবে। তাই 'ওলে ওলে' গানে হিট দিলেও বেশিরভাগ ছবিতেই ফ্লপ নায়ক তকমা জোটে তাঁর। আর কোনও ছবি হিট হলে তাতে সেফ থাকতেন সহনায়ক রূপে। নবাবী চেহারার সেফ শেষমেশ 'পরিণীতা'র শেখর চরিত্র দিয়েই মন জয় করলেন আপামর দর্শকের।
পরিণীতা রিলিজের পরেই সুপারহিট করে এবং বক্সঅফিসে ঝড়ও তোলে। পাশাপাশি বিতর্কও ওঠে, শরৎ চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনিকে প্রদীপ সরকার বিকৃত করেছেন বলে। সে বিতর্ক টেকেনি। বরং নতুন প্রজন্মের কাছে শরৎ ক্লাসিককে প্রেমের আইকন করে তোলে এ ছবি।

ছবিতে আদর্শবাদী নারী ললিতা (বিদ্যা) ও পুঁজিবাদী ব্যবসায়ী পুত্র মিউজিশিয়ান শেখরের (সেফ আলি খান) সম্পর্কের ওঠাপড়া স্পর্শ করে যায় সকলকে। কোনও দিন শরৎচন্দ্র না পড়া দর্শকও উপভোগ করেন ছবি। এ চলচ্চিত্রে বিদ্যার অভিনয়ও সমালোচকদের সন্তুষ্ট করে। অসংখ্য পুরস্কারও পান বিদ্যা। শেখরের দাম্ভিক পিতার ভূমিকায় ছিলেন সব্যসাচী চক্রবর্তী, যা ছিল তাঁর দারুণ এক বলিউড কাজ। সঞ্জয় দত্ত ছিলেন গিরিশের রোলে। রাইমা সেন চোখের বালির পরে পরিণীতায় বড় ব্রেক পান ললিতার বাল্যবন্ধু বোন কোয়েলের রোলে।
একটি বিশেষ ক্যামিও চরিত্রে আইটেম গানে ক্যাবারে রূপে রেখার নাচ, 'ক্যায়সি পেহলি' ছিল এই পরিণীতা ছবির বড় আকর্ষণ। যা ছবির বক্সঅফিসে আরো ঝড় তোলে। রাইমা পরে রেখাকে বলেছিলেন, তিনি রেখাজির সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করতে পেরে ধন্য। রেখা রাইমাকে বলেছিলেন, তিনিও আনন্দিত সুচিত্রা সেনের নাতনির সঙ্গে কাজ করতে পেরে।

প্রদীপ সরকার ছবিটি পরিচালনার জন্য ৫৩তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কারও লাভ করেন। এছাড়া ছবিটি পাঁচটি বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, পাঁচটি বিভাগে ভারতীয় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরস্কার, দু'টি বিভাগে জি সিনে পুরস্কার ও দু'টি বিভাগে স্ক্রিন পুরস্কার লাভ করে।
ছবির একটি সাহসী রোম্যান্টিক দৃশ্য বিদ্যা বালান এবং সেফ আলি খানের শরীরি প্রেম অপূর্ব ভাবে দৃশ্যায়ন করেছিলেন প্রদীপ সরকার। দর্শককে থমকে দিয়েছিল মূলধারার ছবিতে এমন দৃশ্য। রোম্যান্স উপচে পড়ছে, অথচ কোনও অস্বস্তিকর যৌনতার ইঙ্গিত নেই। লজ্জা, ব্রীড়া, আবেগ, তৃপ্তি মিলিয়ে এক অনন্য মিলনদৃশ্য উপহার পায় দর্শকরা।

ছবিতে দুর্গাপুজো কেন্দ্রিক যে দৃশ্য ছিল, সেগুলোর শ্যুট করা হয় মধ্য কলকাতার বিখ্যাত লাহা বাড়িতে। এই ছবিতে প্রচুর বাংলার অভিনেতাকে সুযোগ দেন প্রদীপ সরকার। হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়, কুমকুম ভট্টাচার্য, গীতা দে, খরাজ মুখার্জী-- সকলে চুটিয়ে অভিনয় করেন।

ছবির একটি দৃশ্যে দোলনায় দুলেছিলেন বিদ্যা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নষ্টনীড় অবলম্বনে সত্যজিৎ রায়ের চারুলতায় যেমন দোলনায় দুলতে দুলতে মাধবী মুখার্জী গুনগুন করে গেয়েছিলেন 'ফুলে ফুলে ঢোলে ঢোলে', ঐ দৃশ্যপটকেই একই সুরে হিন্দিতে ব্যবহার করেন প্রদীপ সরকার। বিদ্যা ওই গানটিই গান দোলনায়। এই দৃশ্যটি ছিল রবি ঠাকুর এবং সত্যজিৎ রায়কে প্রদীপ সরকারের ট্রিবিউট।

আবার 'কস্তো মজা' গানে যে ট্রেনটিতে সেফ আলি খান শ্যুট করেন, সেই ট্রেনটিতেই শর্মিলা ঠাকুর 'আরাধনা' ছবিতে 'মেরে সপনে কা রাণী' গানে শ্যুট করেছিলেন। সেই দার্জিলিং টয় ট্রেনটিকেই পরিণীতার জন্য ব্যবহার করা হয় আবারও। সব মিলিয়ে বাস্তবে ও পর্দায় পুরাতনীকে ছুঁতে ছুঁতে এ সিনেমা নির্মাণ করেন প্রদীপ সরকার।

সুরকার শান্তনু মৈত্ররও বলিউডে বড় ব্রেক 'পরিণীতা'। তাঁর সুর করা সব ক'টি গান হিট হয়। স্বয়ং গুলজার প্রশংসা করেন শান্তনু মৈত্রর কাজের। সেরা সুরকার হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরস্কারও পান তিনি এই ছবির জন্য।
আজ, ২০২০ সালের ১০ জুন প্রদীপ সরকারের ছবি 'পরিণীতা' পনেরোটি বসন্ত পার করল। রোম্যান্টিক মিউজিকাল ড্রামার ঘরানা হিসেবে এ ছবি আজও পারফেক্ট। এখনও এ ছবির দৃশ্য বা গান পর্দায় এলে টিভির চ্যানেল চেঞ্জ করতে ভুলে যান অনেকে।