
বলিউড ফিল্মস-নস্টালজিয়া
শেষ আপডেট: 6 May 2025 16:09
দ্য ওয়াল ব্যুরো: যেখানে হিন্দি ছবিগুলি একের পর এক বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ছে, সেখানে ঠিক উল্টো সাফল্য দেখাচ্ছে আঞ্চলিক গর্ব আর লোককথায় ভর করা সিনেমা। অজয় দেবগনের ‘তানহাজি’ আর ঋষভ শেট্টির ‘কান্তারা’—এই দুই ছবি যেন এক নতুন ধারা গড়ে তুলেছে। লোককথা, ইতিহাস, সংস্কৃতি আর আবেগকে সিনেমার মোড়কে এমনভাবে পরিবেশন করা হচ্ছে যে, তা গোটা ভারতের দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছে। এই সাফল্য দেখে অনেক পরিচালক এখন ঝুঁকছেন ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক বিষয়বস্তুর দিকে। কারণ দর্শক এখন শুধু বিনোদন নয়, চায় আত্মপরিচয়ের খোঁজ, চায় শিকড়ের গল্প। অন্যদিকে, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের বিস্তারে এই রকম ‘রুটেড’ কনটেন্ট এখন পৌঁছে যাচ্ছে দেশের প্রতিটি প্রান্তে—জায়গা করে নিচ্ছে মনে আর হিট হয়ে উঠছে পর্দায়।
প্রশ্ন এখন একটাই: ভবিষ্যতের ব্লকবাস্টার কি তাহলে আঞ্চলিক গল্পেই লুকিয়ে?
বর্তমানে যখন হিন্দি ভাষার ছবি একের পর এক বক্স অফিসে হোঁচট খাচ্ছে, তখন একেবারে ভিন্ন ছবি উঠে আসছে আঞ্চলিক সিনেমার পরিসরে। ঐতিহাসিক গর্ব, সাংস্কৃতিক পরিচয় আর লোককথা নির্ভর গল্প ভর করে তৈরি হওয়া সিনেমাগুলো শুধু টিকে থাকছে না—বরং ঝড় তুলছে দেশের সর্বত্র।
‘তানহাজি’তে সূচনা, ‘কান্তারা’য় আন্দোলন!
অজয় দেবগনের ‘তানহাজি: দ্য আনসাং ওয়ারিয়র’ (২০২০) ছিল এক বিশাল টার্নিং পয়েন্ট। মরাঠা বীর তানাজি মালুসারেকে নিয়ে বানানো এই ছবি শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক ড্রামা নয়, এটি ছিল মরাঠাদের গর্বের উদযাপন। প্রায় ২৮০ কোটি আয় করে এটি জাতীয়স্তরে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ছবি যেমন মরাঠি দর্শকদের আবেগ ছুঁয়েছে, তেমনই জাতীয়তাবাদ ও গ্ল্যামারে মোড়ানো গল্প ভারতজুড়ে সাড়া ফেলেছে। এরপর এল ঋষভ শেট্টির ‘কান্তারা’। কর্ণাটকের উপকূলীয় জনপদের লোককথা, প্রকৃতি এবং মানুষের বিশ্বাস নিয়ে গড়া এই কন্নড় ছবি রীতিমতো সর্বভারতীয় হিট হয়ে ওঠে। বিশাল কোনও প্রচার না থাকলেও, ‘ডিভাইন পজেশন’ ঘেরা আবেগঘন ক্লাইম্যাক্স দর্শকদের মুগ্ধ করে দেয়। ভারতেই আয় ছাড়ায় ৩০০ কোটি! এর সাফল্যের পর ঘোষণা হয়েছে এর প্রিক্যুয়েল ও সিক্যুয়েলের।
শিবাজি মহারাজকে নিয়ে নতুন আগ্রহ
মজার বিষয়, শুধু মরাঠি সিনেমা নয়—বলিউডও ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের জীবনের উপর ফোকাস করছে। ভিকি কৌশল ‘ছাভা’ ছবিতে শিবাজির বীর সন্তান ছত্রপতি শম্ভাজি মহারাজের ভূমিকায় অভিনয় করলেন। পরিচালনায় লক্ষ্ণণ উটেকর। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে আবেগ, যুদ্ধ আর রাজনীতি মিলিয়ে তৈরি হল এক বিশাল ক্যানভাস।
রীতেশ দেশমুখও তার মরাঠি হিট ‘বেদ’-এর পর শিবাজি মহারাজকে নিয়ে একটি বড় বাজেটের প্রোজেক্টে হাত দিয়েছেন। অন্যদিকে, ‘কান্তারা’র পর ঋশভ শেট্টি নিজেও এখন শিবাজির ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, একটি নতুন ঐতিহাসিক ছবিতে।
‘কন্নাপ্পা’: ভক্তি, বলিদান আর ভিএফএক্সের যুগলবন্দি
দক্ষিণী ইন্ডাস্ট্রি থেকেও আসছে মহাভারতীয় গন্ধমাখা ছবি। বিষ্ণু মাঞ্চু প্রযোজিত ও অভিনীত ‘কন্নাপ্পা’—একটি পৌরাণিক ছবি, যেখানে শিবভক্ত এক শিকারির নিজের চোখ উৎসর্গের কাহিনি তুলে ধরা হবে। ছবিতে প্রভাস, মোহনলাল, নয়নতারা, অক্ষয় কুমার প্রমুখ অভিনয় করছেন। বিশাল সেট, আধুনিক ভিএফএক্স, এবং ধর্মীয় আবেগ—এই ছবি হতে চলেছে পরবর্তী ‘বাহুবলী’ ধাঁচে। মানে একেবারে প্যান-ইন্ডিয়া এন্টারটেইনার। মুক্তি: ২৭ জুন, ২০২৫।
সব আঞ্চলিক ছবি নয় সফল
পাঞ্জাবি অভিনেতা গিপ্পি গ্রেওয়ালের ‘আকাল’—যদিও মহারাজা রঞ্জিত সিংহ-পরবর্তী সময়ের ইতিহাস তুলে ধরেছে, তবুও ছবিটি বক্স অফিসে ভালো ফল করতে পারেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ছবিতে আবেগ ছিল, ঐতিহাসিক বিশুদ্ধতাও ছিল, কিন্তু অভাব ছিল কনটেন্টের গভীরতা আর আকর্ষণীয় উপস্থাপন।
গল্পই রাজা: শিকড় যত গভীর, ডানা তত বড়
চলমান প্রবণতা প্রমাণ করে যে, শুধু ‘রুটেড’ হওয়াই যথেষ্ট নয়। গল্প হতে হবে এমন, যা স্থানীয় সংস্কৃতির স্বাদ বজায় রেখেও সর্বভারতীয় দর্শকদের মন ছুঁয়ে যেতে পারে। ঋষভ শেট্টি বা ওম রাউতের মতো পরিচালকরা দেখিয়ে দিয়েছেন, কীভাবে স্থানীয় গল্পকে সর্বজনীন রূপ দেওয়া যায়। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম আর ‘ডাবিং’ সংস্কৃতির হাত ধরে, আজ একটি কন্নড় বা তেলেগু ছবি সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে গুজরাট বা আসামের ঘরে-ঘরে। আর এভাবেই ভারতীয় সিনেমা ধীরে ধীরে নিজের শিকড়ে ফিরে গিয়ে তৈরি করছে নতুন এক গোল্ডেন এরা।