প্রযোজক হিসেবে কয়েকটি ভুল প্রযোজনার কারণে তিনি ধীরে ধীরে সর্বস্ব হারান। বাধ্য হয়ে নিজের বিলাসবহুল বাংলো, গাড়ি এবং এমনকি প্রিয় বইগুলো পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়। শেষ জীবনে তিনি মালাডের একটি ছোট ফ্ল্যাটে থাকতেন।

অমিতাভ-ভারত ভূষণ
শেষ আপডেট: 16 May 2025 15:39
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বলিউডের ইতিহাসে রাজেশ খান্না প্রথম ‘সুপারস্টার’ হিসেবে খ্যাত হলেও, তার আগেই রূপালী পর্দায় নিজের অনন্য উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দিলীপ কুমার। তবে সেই সময়েই আরেক প্রতিভাবান অভিনেতা উঠে আসছিলেন নিজের যোগ্যতায়—তিনি হলেন মিরাটের ভারত ভূষণ। ১৯৫০-এর দশকে 'বৈজু বাওরা' ও 'মির্জা গালিব'-এর মতো কালজয়ী ছবিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে তিনি রাতারাতি খ্যাতির শিখরে পৌঁছে যান।
কিন্তু তার সেই খ্যাতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। প্রযোজক হিসেবে কয়েকটি ভুল সিদ্ধান্ত ও ক্ষতিতে ধীরে ধীরে আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েন তিনি। বাধ্য হয়ে বিক্রি করে দিতে হয় নিজের বিলাসবহুল বাংলো, গাড়ি এবং প্রিয় বইপত্র পর্যন্ত। শেষ জীবনে তিনি ঠাঁই নেন মুম্বইয়ের মালাডের একটি ছোট্ট ফ্ল্যাটে। ১৯৯২ সালে নিঃসঙ্গভাবে মৃত্যুবরণ করেন এক সময়ের এই জনপ্রিয় তারকা। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় উপস্থিত ছিলেন মাত্র সাত-আটজন মানুষ।
ভারত ভূষণের জীবনের এই করুণ পরিণতি কেবল এক ব্যক্তির গল্প নয়, বরং বলিউডের গ্ল্যামার জগতের এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি—যেখানে খ্যাতি যেমন হঠাৎ আসে, তেমনই নিঃশব্দে হারিয়েও যায়।
দু’দশক পর, যখন অমিতাভ বচ্চন বলিউডের সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত, তখন এক সকালে কাজের পথে যেতে যেতে তিনি দেখতে পান ভারত ভূষণকে—একটি বাসস্টপে একা, নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, আশপাশের কেউ তাঁকে চিনতেও পারছে না। অমিতাভ গাড়ি থামাতে চাইলেও সাহস পাননি। বহু বছর পর, ২০০৮ সালে নিজের ব্লগে এই ঘটনা তুলে ধরেন তিনি।
তিনি লেখেন, ‘আমি যখন এক সকালে সান্তাক্রুজ দিয়ে কাজে যাচ্ছি, হঠাৎ দেখি ৫০-এর সেই রোমান্টিক হিরো ভারত ভূষণ একটি বাসস্টপে একা দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ভিড়ের একজন সাধারণ নাগরিক। কেউ তাঁকে চিনছে না, কেউ জানতেও চাইছে না তিনি কে। আমি গাড়ি থামাতে চেয়েছিলাম, তাঁকে তুলে নিয়ে যেতে, কিন্তু সাহস পাইনি। ভেবেছিলাম হয়তো ওঁকে লজ্জা দেব। আমি চলে আসি। কিন্তু সেই দৃশ্য আজও চোখে লেগে আছে। এটা আমাদের সবার সঙ্গেই ঘটতে পারে।’
এই ঘটনার পর তিনি গুরুদত্তর ‘কাগজ কে ফুল’-এর বিখ্যাত গান মনে করেন— “ওয়াক্ত না কিয়া, কেয়া হসিন সিতাম… তুম রাহে না তুম, হাম রাহে না হাম…”
বচ্চনের এই স্মৃতিচারণ পাঠ করে অনেকেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। কেউ লেখেন, ‘তুমি নিজে কখনও এইভাবে অবহেলিত হওনি, তবুও সহকর্মীদের এমন পরিণতির প্রতি তোমার এমন সহানুভূতি সত্যিই অনন্য।” আরেকজন মন্তব্য করেন, “বলিউডে অনেক অভিনেতাই শেষ জীবনে এমন অজ্ঞাতপরিচয় অবস্থায় কাটিয়েছেন। আমি নিজেও রাস্তায় কিছু পরিচিত মুখকে ভিক্ষা করতে দেখেছি। তখন এমনই একটা অনুভূতি হয়েছিল।’

নার্গিস-ভারত ভূষণ
সাংবাদিক আলি পিটার জন লিখেছেন, দিলীপ কুমার ও নারগিস প্রথমে ‘বৈজু বাওরা’-তে কাস্ট হওয়ার কথা থাকলেও ব্যক্তিগত কারণে একসঙ্গে কাজ করতে চাননি তাঁরা। তখন সুযোগ পান ভারত ভূষণ। মীনা কুমারীর সঙ্গে জুটি বেঁধে তিনি সেই সিনেমায় দুর্দান্ত অভিনয় করেন। ছবিটি সুপারহিট হয়। কিন্তু প্রযোজক হিসেবে তাঁর ছবি ফ্লপ করতে থাকায় অর্থকষ্টে পড়েন। অবশেষে একরুমের ফ্ল্যাটে বসবাস শুরু করেন, ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করে কোনও মতে দিন কাটাতে থাকেন। মৃত্যুকালে প্রায় কেউ ছিল না তাঁর পাশে।
ভারত ভূষণের এই ট্র্যাজিক পরিণতি একটাই শিক্ষা দেয়—সাফল্যের চূড়ায় থাকলেও, সময় বদলাতে বেশি সময় লাগে না। অমিতাভ বচ্চনের মতো সুপারস্টারদের কাছেও এই বাস্তবতা হৃদয়বিদারক।