
জয়া ভাদুড়ি , অপর্ণা সেন
শেষ আপডেট: 4 May 2025 15:50
দুটি ছবিই রিমেক। কিন্তু পুরস্কার ও বক্সঅফিস ভরালো দুটি ছবিই। এমনকি দুটি ছবি থেকেই শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জিতলেন দুই নায়িকা। একটি হিন্দি ছবি আর একটি বাংলা ছবি। কোন সে দুই ছবি?
১৯৭৪ সাল। বম্বের সবথেকে ঐতিহ্যশালী পুরস্কার আজও ফিল্মফেয়ার। তখন ফিল্মফেয়ার বাংলা ছবির জন্যও দেওয়া হত বম্বে থেকে। বাংলার পরিচালক, অভিনেতারা বম্বে গিয়েই সেই ফিল্মফেয়ার পুরস্কার নিতেন। ১৯৭৪ সালে ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেত্রী হলেন জয়া ভাদুড়ি, 'কোরা কাগজ' ছবির জন্য। আর ফিল্মফেয়ার বাংলা শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পেলেন অপর্ণা সেন, 'সুজাতা' ছবির জন্য।
মজার বিষয়, 'কোরা কাগজ' অতীতের কালজয়ী বাংলা ছবির রিমেক। আর বাংলা ছবি 'সুজাতা' অতীতের কালজয়ী হিন্দি ছবির রিমেক।
সত্যিই কি অতীতের ছবিগুলোকে ছাপিয়ে গেছিল নতুন রিমেকগুলো ? নতুন যুগের অভিনেত্রী অপর্ণা আর জয়া কি অতীতের অভিনেত্রীদের ছায়া থেকে বেরতে পেরেছিলেন?
অনিল গাঙ্গুলির 'কোরা কাগজ' ।তৈরি হয়েছিল আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস নিয়ে অজয় করের পরিচালিত 'সাত পাকে বাঁধা' ছবির অনুকরণে। সাহিত্য গল্প বারবার করাই যায়। কিন্তু তখন বাংলার ছবি ফ্রেম টু ফ্রেম নকল করত বলিউড। বম্বের বাঙালি পরিচালক অনিল গাঙ্গুলির প্যাশন ছিল বাংলা নামকরা ছবিগুলির হিন্দি রূপ দেওয়ার। 'মহানগর', 'বালুচরী', 'সাত পাকে বাঁধা','সাহেব' একের পর এক বাংলা ছবির হিন্দি রূপ দিয়েছেন তিনি । হিট হলেও বাংলার ধারেকাছ দিয়েও যেত না অনিল গাঙ্গুলির হিন্দি ছবি গুলি।

সুচিত্রা সেন-সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনীত 'সাত পাকে বাঁধা'র হিন্দি রূপ ছিল 'কোরা কাগজ'। সুচিত্রার রোলে জয়া ভাদুড়ি আর সৌমিত্রর রোলে বিজয় আনন্দ। নায়কের বয়স অনেক বেশি বাংলাতে ছিল না, কিন্তু হিন্দিতে তা হল। যে কারণে জয়ার বিপরীতে দেব আনন্দ, রাজেন্দ্র কুমার, সুনীল দত্তকে অফার করা হলেও তাঁরা খারিজ করে দেন। সঞ্জীব কুমার প্রথম চয়েস হলেও তিনি ব্যস্ত ছিলেন 'শোলে','মৌসম' ছবি নিয়ে।
শেষমেশ অধ্যাপক চরিত্রে পরিচালক বিজয় আনন্দ অভিনয করেন। জয়ার সিরিয়াস অভিনয় প্রশংসিত হলেও, অর্চনা চরিত্রে মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পাওয়া সুচিত্রা সেনকে পার করতে পারেনি। আসলে অনিল গাঙ্গুলি বেশি বাণিজ্যিক করতে গিয়ে, অহেতুক গানের প্রয়োগ করে ছবিটিকে খেলো করে ফেলেন। একমাত্র প্রাপ্তি ছবির শীর্ষসঙ্গীত কিশোর কুমারের 'মেরা জীবন কোরা কাগজ'। লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া 'রুঠি রুঠি পিয়া' সে বছর জাতীয় পুরস্কার পেলেও এ গান কেউ মনে রাখেনি। বরং গানটি ছবির গভীরতা নষ্ট করে।
অনিল গাঙ্গুলি বিনোদনমূলক ছবির জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। অথচ এ ছবি বিনোদনের নয়। বম্বতে 'কোরা কাগজ' সফলতা পেলেও সুচিত্রা-সৌমিত্রর 'সাত পাকে বাঁধা' দেখা বাঙালির তেমন ভাল লাগেনি এই ছবি। তাঁরা তখন বলেছিলেন,শুধু জয়াকে ভারী চশমা পরালেই ছবি মননশীল হয় না।
অন্যদিকে ১৯৭৪ সালে বাংলা ছবি থেকে ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পান অপর্ণা সেন, পিনাকী মুখোপাধ্যায়ের 'সুজাতা' ছবির জন্য। এটি ছিল ১৯৫৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বিমল রায়ের হিন্দি ছবি 'সুজাতা' র বাংলা রূপ। লেখক সুবোধ ঘোষের কাহিনি। সুজাতা এক অস্পৃশ্য অনাথ মেয়ের গল্প, যাকে এক ভদ্র শিক্ষিত বাঙালি পরিবার নিজেদের মেয়ের সঙ্গে আশ্রয় দিয়ে বড় করে। অপর্ণা সেন, সুমিত্রা মুখোপাধ্যায় ও দীপঙ্কর দে র এই ছবি ১৯৭৪ সালে সুপারহিট হয়েছিল। কিন্তু বিমল রায় আর নূতন-সুনীল দত্তের সেই ম্যাজিক জমেনি বাংলায়। অপর্ণা সেনের অভিনয় কিছুটা হলেও পিছিয়ে ছিল নূতনের থেকে। তবু অপর্ণার নামে ছবি চলেছিল। পর্দায় এখানে স্নিগ্ধ অপর্ণা। সুব্রতা চট্টোপাধ্যায় তরুণী বয়সেই মা-র রোলে চমৎকার অভিনয় করেন। আসলে যখন সুনীল দত্ত ফোনে অশ্রুসজল নূতনের জন্য গাইছেন ' জ্বালতে হ্যায় জিসকে লিয়ে ' ঐ মায়া বাংলা 'সুজাতা'য় সৃষ্টি হয়নি। তবু অপর্ণা সে বছর বাংলার সব অভিনেত্রীকে হারিয়ে ফিল্মফেয়ার পান। যা বাঙালির গর্বের।
'সুজাতা' ওয়ান ওয়াল থিয়েটার ,আটের দশকে সন্ধ্যা রায় ও সংঘমিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায় করেছিলেন। সেটিও সুপারহিট ছিল।
১৯৭৪ সালে লাক্স সাবান ফিল্মফেয়ারের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ছিল। লাক্স জয়া আর অপর্ণাকে বিজয়ীর শুভেচ্ছা জানিয়ে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছিল।
পঞ্চাশ বছর পরে 'কোরা কাগজ' আর 'সুজাতা' ছবি দুটিকে ফিরে দেখা একটা নস্টালজিক আবহ তো তৈরি করেই !
