স্ত্রী অলকাকে, “আমি মারা গেলে তোমরা কিছুতেই কোনও স্টুডিয়োতে আমার মরদেহ নিয়ে যাবে না।”

শেষ আপডেট: 3 September 2025 20:01
কমেডিয়ানের তকমা ভেঙে অনুপ কুমারকে নবজন্ম দিয়েছিল 'পলাতক' ছবির বসন্ত চরিত্রটি। যাকে সংসারে বাঁধা যায় না। পরোপকারে বসন্ত কোনও ভেদাভেদ মানত না। বাস্তবেও অনুপকুমার ছিলেন ঠিক এমন।
মানুষ হিসেবে সবার উপরে রাখতেই হয় অনুপ কুমারকে। সবার সুখ দুঃখে পাশে থাকতেন তিনি।
/indian-express-bangla/media/media_files/2025/06/17/ZzzbRep94sfqjiXLoBOk.jpg)
হাসপাতালে ঋত্বিক ঘটক যখন মারা যাচ্ছেন, তখন ওঁর শিয়রে মৃণাল সেনের সঙ্গে আর যে ছিল, সে অনুপ কুমার।
বিকাশ রায় মারা যাওয়ার পর অনুপ টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োতে গিয়ে হাতজোড় করে বলেন, “আজ দয়া করে কাজ বন্ধ রাখুন।” কেউ শোনেনি অনুপ কুমারের কথা। খুব আহত হয়েছিলেন চেনা লোকদের এই ব্যবহারে।
পরে বলছিলেন স্ত্রী অলকাকে, “আমি মারা গেলে তোমরা কিছুতেই কোনও স্টুডিয়োতে আমার মরদেহ নিয়ে যাবে না।”

এতবড় অভিনয় জীবনে বহু মোটা দাগের চরিত্র করেছেন সেগুলো করার কারন হিসেবে বলেছেন,“আমার কাছে তখন অর্থ উপার্জনটা বিশেষ প্রয়োজনীয় ব্যাপার ছিল। অনেক খরচের দায়িত্ব আমার ওপরে এসে পড়েছিল। কাজেই সিলেক্টেড ছবি করার সুযোগ আমার জীবনে কখনও আসেনি। যদি নিজের ইচ্ছেমতো ছবিতে কাজ করতে পারতাম, তাহলে আমার আজকের পরিচয়টা অন্য এক মাত্রা পেত।”
অনুপের কাছে কোনোদিনই বাছাবাছির সুযোগ ছিল না। সব ছবি করতে বাধ্য হতেন। বারো বছর বয়েস থেকে রোজগার করতে হয়েছে। সাত ভাই, পাঁচ বোনের সংসার। নিজের পাওয়া সোনার মেডেল বন্ধক দিয়েও টাকা এনেছে বাড়িতে।পরিবারের লোকদের জন্য সমস্ত দায়িত্ব পালন করেছেন নিজ রোজগারে।তথাপি কোনো দুঃস্থ মানুষকে সাহায্য করতে কখনও ভোলেননি।
বাংলা ছবির রত্ন অভিনেতা তুলসী চক্রবর্তী একবার শীতে কষ্ট পাচ্ছিলেন বলে, অনুপকুমার তুলসী চক্রবর্তীকে একটা কোট কিনে দিয়েছিলেন। সেটা পেয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন সন্তানহীন তুলসী চক্রবর্তী। অনুপকুমারকে জড়িয়ে ধরেছিলেন ছেলে হিসেবে।
মাধবী মুখোপাধ্যায় জীবনে প্রচুর চলচ্চিত্র দেখেছেন সব ভাষায়।কোনোটাই দুবার দেখেননি কিন্তু দুটো চলচ্চিত্র উনি দুবার মনযোগ সহকারে দেখেন বিভোর হয়ে। একটি হলিউড মুভি 'সাউন্ড অফ মিউজিক' আর একটি তরুণ মজুমদারের 'পলাতক'। অনুপ কুমারের অভিনয় আর গ্রাম বাংলা নিয়ে অত সুন্দর ছবি দাগ কেটে গিয়েছে মাধবী কাননে মননে।

অনুপকুমার যদি নির্বাচিত ছবি করতেন তাহলে অনুপ কুমার সন্ধ্যা রায় জুটি আরও লেজেন্ডারি হত।
কিন্তু তরুন মজুমদার, রাজেন তরফদার, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় বাদে আর কজন ভাবলেন অনুপকে নায়ক করা যায়? কজন সে সাহস দেখালেন?
আর অর্থের জন্য অনুপ যা ছবি পেতেন সেটা ফেরাতেন না। কিন্তু যত ছবিতে দর্শক ধরে রাখতে হত, পরিচালকদের অনুপকে ছবিতে রাখতেই হত।
রবি ঘোষ তাঁর আর এক সহকর্মীর মৃত্যুর পর জটায়ু চরিত্র অনুপ কুমার করেন। সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে সেভাবে কাজ না করলেও সত্যজিৎ পুত্র সন্দীপ রায়ের পরিচালনায় সত্যজিত-কাহিনিতে জটায়ু করেন অনুপ কুমার।
১৯৯৬ সালে সিপিএম প্রার্থী হিসেবে কাশীপুর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। কিন্তু জয়ী হতে পারেননি।আসলে পরোপকারের ইচ্ছেটাই আসল।

সব জয় পরাজয়ের ঊর্ধ্বে ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে‚ মাত্র ৬৮ বছর বয়সে অনুপ কুমারের প্রয়াণ ঘটে।
তিনি সেই শিশু অভিনেতা হয়ে পথ চলা থেকে শুরু করে ৫৫ বছর নিরবচ্ছিন্ন অভিনয় জীবন চালিয়ে যান। কজন পারে?
"তোমার ঘরে সুখের বাতি যেন নেভে না নাকো
আনন্দ পাখিটা তুমি বন্ধু বন্দি করে রাখো
সুখে থাকো তুমি বন্ধু আমি চলে যাই..."