Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
রহস্য আর মনের অন্ধকারে ঢুকে পড়ল ‘ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড’! টিজারে চমকজিৎ-প্রযোজক দ্বন্দ্বে আটকে মুক্তি! ‘কেউ বলে বিপ্লবী, কেউ বলে ডাকাত’-এর মুক্তি বিশ বাঁও জলে?কিউআর কোড ছড়িয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ! কীভাবে রাতারাতি নয়ডার বিক্ষোভের প্ল্যানিং হল, কারা দিল উস্কানি?নয়ডা বিক্ষোভ সামাল দিতে 'মাস্টারস্ট্রোক' যোগী সরকারের! শ্রমিকদের বেতন বাড়ল ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত Jeet: ভুয়ো প্রচার! ভোট আবহে গায়ে রাজনীতির রঙ লাগতেই সরব জিৎ৪ হাজার থেকে নিমেষে ১ লক্ষ ৮৫ হাজার ফলোয়ার! এক স্পেলেই সোশ্যাল মিডিয়ার নতুন তারকা প্রফুল্লসামনে কাজল শেখ, মমতা কথা শুরু করতেই হাত নেড়ে বিরক্তি প্রকাশ অনুব্রতর! সিউড়িতে কী ঘটলEPL: নায়ক ওকাফর! ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ৪৫ বছরের অভিশাপ মুছল লিডস, রক্ষণের ভুলে ডুবল ম্যান ইউAsha Bhosle: 'এত ভালবাসার সবটাই তোমার...,' ঠাকুমার স্মৃতি আঁকড়ে আবেগঘন পোস্ট নাতনি জানাইয়েরSupreme Court DA: ডিএ নিয়ে সময়সীমা বৃদ্ধির আর্জি, বুধবার রাজ্যের মামলা শুনবে সুপ্রিম কোর্ট

'অঞ্জন চৌধুরী'র কালীপুজো এখনও চলছে! মুখে হাসি, চোখে জল নিয়ে স্মৃতির ভার বইছে বেহালা

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় মহানায়ক উত্তমকুমারের প্রয়াণের পরে ভেঙে পড়া টালিগঞ্জ পাড়ায় অন্নদাতা রূপে যিনি অবতীর্ণ হন তিনি অঞ্জন চৌধুরী (Anjan Chowdhury)। চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক অঞ্জন চৌধুরীর সংলাপের জোরে ছবি হাউসফুল হিট। তখন টালিগঞ্জ পা

'অঞ্জন চৌধুরী'র কালীপুজো এখনও চলছে! মুখে হাসি, চোখে জল নিয়ে স্মৃতির ভার বইছে বেহালা

শেষ আপডেট: 25 October 2022 11:57

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

মহানায়ক উত্তমকুমারের প্রয়াণের পরে ভেঙে পড়া টালিগঞ্জ পাড়ায় অন্নদাতা রূপে যিনি অবতীর্ণ হন তিনি অঞ্জন চৌধুরী (Anjan Chowdhury)। চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক অঞ্জন চৌধুরীর সংলাপের জোরে ছবি হাউসফুল হিট। তখন টালিগঞ্জ পাড়া টলিউড হয়নি। বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প বলেই বাজিমাত করলেন অঞ্জন চৌধুরী। অভিনেতা থেকে টেকনিশিয়ানসদের রুজি-রোজগার হত যে লোকটার কলমের জোরে, তিনিই অঞ্জন চৌধুরী। তবে শুধু টালিগঞ্জ পাড়াতেই নয়, নিজের বাড়ির বেহালার পাড়াতেও সবার প্রিয় মানুষ ছিলেন অঞ্জনদা। বেহালা অঞ্চলের রায় বাহাদুর রোডের ওপর কালী পুজো মহাসমারোহে শুরু করেছিলেন অঞ্জন চৌধুরী। সেই পুজো আজও অঞ্জন চৌধুরীর নামে হয়ে চলেছে। বহু সেলেব্রিটির পুজোতেই এমন রমরমা হয়, তবে শিল্পীর মৃত্যুর পরে সে পুজোর আর অস্তিত্ব থাকে না। কিন্তু অঞ্জন চৌধুরী সেই বিরল মানুষ, যাঁর মৃত্যুর ১৫ বছর পরেও তাঁর নামে কালীপুজো হয়ে চলেছে।

ক্লাবের নাম 'দেশবন্ধু ব্যায়ামগার'। এই ব্যায়ামগার ও পাড়ার লোকেরা মিলেই শুরু করেন এই কালী পুজো। কিন্তু অঞ্জন চৌধুরী হাল ধরার পর এই পুজোর গ্ল্যামার অনেক বেড়ে যায়। আট-নয়ের দশকে এই পুজোতেই এসেছেন টলিউডের তারকা শিল্পীরা। অঞ্জন চৌধুরী প্রয়াত হয়েছেন ২০০৭ সালে। তার আগে পর্যন্ত 'দেশবন্ধু ব্যায়ামগার' ক্লাবের পাশে চিরকাল ছিলেন তিনি।

বেহালা জেমস লঙ রোড ছাড়িয়ে রায় বাহাদুর রোডে সেই অঞ্জন চৌধুরীর কালীপুজো ঘুরে দেখল 'দ্য ওয়াল'।

পরিচালকের ছায়াসঙ্গী ও গীতিকার মোহিনী চৌধুরীর পুত্র শ্রী দিগ্বিজয় চৌধুরী এদিন আবেগঘন হয়ে বলছিলেন, 'অঞ্জন চৌধুরী নামটাই যেন হেরে যাওয়া মানুষদের কাছে অনুপ্রেরণা। একদম শূন্য থেকে শুরু করেছিলেন অঞ্জনদা এবং নিজের কলমের জোরে শীর্ষস্থানীয় হয়ে দেখান। যে লোকটা পরের বেলা কী খাবে জানতেন না, হাতে কোনও পয়সা ছিল না, তিনিই সিনেমা বানিয়ে গাড়ি-বাড়ি করে দেখিয়েছিলেন। অঞ্জন চৌধুরীর উত্থান এই রায় বাহাদুর রোড থেকেই। যে গলিতে ওঁর বাড়ি, সেই গলির মুখেই এই পুজো হয়।

উদ্বোধনে অঞ্জন তনয় সন্দীপ ও আরও অনেকে।

আগে অঞ্জন চৌধুরী এই রাস্তার উল্টোদিকে ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। সেখানে তিনি নিজের 'অল প্রিন্ট' প্রেস খোলেন। তার উল্টোদিকে ছিল ক্লাইড ফ্যানের কারখানা। এখন তো সেখানে ফ্ল্যাট হচ্ছে। খুব অল্প পুঁজি নিয়ে অঞ্জনদা প্রিন্ট ব্যবসায় নামেন। তবে সেই প্রেস খুব হিট করেছিল। এরপর টাকা পয়সা হলে দেশবন্ধু ব্যায়ামগারের গলিতে অঞ্জনদা নিজের বাড়ি করেন। এই অঞ্জনদার বাড়িতে গলিতে ওঁর প্রচুর ছবির শ্যুটিংও হয়েছে। কোনও চিটফান্ড না করেও যে একজন গরিব লোক রাজা হতে পারেন, সেটা অঞ্জনদা করে দেখিয়েছিলেন।

অঞ্জনদা বড় নাম হওয়ার পরেও তাই এই রায় বাহাদুর রোডেই গলির ভিতর বাড়ি করেন। আদতে ওঁর বাড়ি করার কথা ছিল রঞ্জিত মল্লিকের গল্ফ ক্লাবের রোডের বাড়ির পাশে। কিন্তু অঞ্জনদা বলেছিলেন, রায় বাহাদুর রোডে আমার বাড়ি করাটা লোকের কাছে একটা অনুপ্রেরণা মতো হবে। এই অঞ্চলেই আমি জিরো থেকে হিরো হয়েছি। মানুষ বুঝবে, সততার পথে থেকেও বেঁচে ওঠা যায়। যে লোকটা প্রতি মুহূর্তে অন্নের চিন্তা করত, সে লেখালেখি বেচে এতগুলো গাড়ি বাড়ি করতে পেরেছে।

রঞ্জিত মল্লিক ও অঞ্জন চৌধুরী, দু'জনেরই বাড়ি অবশ্য একই প্যাটার্নে তৈরি। পরমেশ্বর নামের এক রাজমিস্ত্রি দু'জনেরই বাড়ি তৈরি করেছেন।'

এই 'দেশবন্ধু ব্যায়ামগার' পুজো শুরু করেন দুই মানিকজোড়, শিশির আর বুদুন। তাঁরাই পরে অঞ্জন চৌধুরীর ডান হাত হয়ে ওঠেন। এঁদের একসময় বেশ প্রতিপত্তি ছিল এলাকায়। আজ বয়স হয়েছে. তবু অঞ্জনদার নাম শুনলেই সোনালি দিনের কথা ভেবে চোখ চিকচিক করে ওঠে তাঁদের।

বুদুন অর্থাৎ অমল শর্মা বললেন, 'অঞ্জনদাই ছিলেন আমাদের এই পুজোর সর্বেসর্বা। দাদার কত কাজ যে আমরা করে দিয়েছি, তেমনই আমাদেরও বিপদেআপদে পাশে দাঁড়াতেন দাদা। এই গলি দিয়েই দেখেছি বড় বড় স্টারদের যেতে। এই গলির উপর দাঁড়িয়ে মিঠুন চক্রবর্তী 'বাঙালি বাবু' ছবির শ্যুটিং করেছিলেন। 'বড় বউ' ছবির শ্যুটিং-ও এই গলিতে। মিঠুনদার কাছে যেতে পেরেছি অঞ্জনদার জন্যই।

অঞ্জনদার স্ত্রী জয়শ্রী বৌদি এ বছর চলে গেলেন, সেটাও আমাদের কাছে খুব দুঃখের। অঞ্জনদার দুই মেয়ে চুমকি চৌধুরী আর রিনা চৌধুরী আমাদের ঘরের মেয়ে। পরিচালক অমল রায় ঘটক কাছেই থাকেন, আসতেন এই পুজোতে। কত সহকারীকে অঞ্জনদা বড় পরিচালক বানিয়েছেন। বাবলু সমাদ্দার থেকে হরনাথ চক্রবর্তী তো আমাদের সঙ্গে বসে আড্ডা দিয়েছেন, কত কাজ করেছেন। বহু সাধারণ মানুষকে অঞ্জনদা বিখ্যাত বানিয়েছেন।'

শিশিরের কথায়, 'অঞ্জনদার পুজোয় স্টার আনতে হবে। আমরা অঞ্জনদার লোক হয়ে সব শিল্পীদের এখানে নিয়ে আসতাম। একবার তো অঞ্জনদা আমায় বলেছিলেন, 'সংঘর্ষ' ছবিতে ভিলেনের রোল দেবেন। সে আর ভাগ্যের ফেরে হল না। তবু মানুষটা ছিলেন আমাদের কাছে ভগবান। পুজোটা তো আমরা তাঁর স্মৃতিতেই করে চলেছি।'

অঞ্জন চৌধুরী নিজেও কিন্তু ছিলেন কালী ভক্ত। সারা বাড়িতে ছিল অজস্র মা কালীর ছবি। রোজ সকালে উঠে, স্নান সেরে, খালি গায়ে অঞ্জন চৌধুরী জবার মালা দিতেন সব ক'টি মা কালীর ছবিতে। নয়ের দশকে ওঁর বাড়িতে রোজ প্রায় দু'শো টাকার ফুল আসত। তাই পাড়াতেও কালীপুজো করতেন ঘটা করে।

তবে পনেরো বছর হয়ে গেল, অঞ্জন চৌধুরী নেই। তাঁর মারা যাওয়ার পরে এই পুজো কিছুটা নিষ্প্রভ হয়ে গেছিল। তারপর এল করোনা ঝড়। পুজো প্রায় বন্ধ হওয়ার জোগাড়। সেই সময়ে অঞ্জনদার অবর্তমানে পুজোর হাল ধরেন অঞ্জন ভক্ত রতন হোড়, পাড়ার এক বিশিষ্ট জন।

রতন হোড় বলেন, '২০২২ সালের পুজোয় অঞ্জনদাকে ফিরিয়ে আনব ঠিক করি। এ বছর তাই 'দেশবন্ধু ব্যায়ামগার' পুজোতে করেছি 'অঞ্জন চৌধুরী মঞ্চ'। পুজোর উদ্বোধন করেছেন অঞ্জন চৌধুরী পুত্র সন্দীপ চৌধুরী ও বিশিষ্ট কাউন্সিলররা। সঙ্গে ছিলেন জয় ভট্টাচার্য ও রানা মুখার্জী-- দুই অভিনেতা।

অঞ্জনদা ওঁর ঘরে ডেকে আমায় সিনেমার স্ক্রিপ্ট শোনাতেন। বলতেন, কোথাও কোনও সাজেশন থাকলে বল। অত বড় একটা মানুষ হয়েও উনি আমার মতো নগণ্য মানুষের মতামত নিতেন। এই পুজোর সঙ্গে আমিও বহু বছর জড়িয়ে। এই পুজোতে এসছেন মুনমুন সেন, প্রসেনজিৎ, রূপা গাঙ্গুলি, সন্ধ্যা রায় থেকে শুরু করে কতজন! রঞ্জিত মল্লিক তো অনেক বার এসছেন। মাঝে ভাটা পড়েছিল পুজোতে। এবার আমরা সেই গ্ল্যামার কিছুটা হলেও ফেরানোর চেষ্টা করেছি। রোজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আছে অঞ্জন চৌধুরী মঞ্চে। আগামীকাল এখানে আসবেন কল্যাণী মণ্ডল-সহ সন্দীপ চৌধুরী পরিচালিত 'উড়ন তুবড়ি' সিরিয়ালের অভিনেতা অভিনেত্রীরা।

কত বড় বড় আর্টিস্টকে এই গলি দিয়ে যেতে দেখেছি। সেটাই আমাদের যৌবনে ছিল বড় আকর্ষণ। মিঠুনদা রাস্তায় নেমে আমাদের সঙ্গে গল্প করে গেছেন। আমরা চাই' দেশবন্ধু ব্যায়ামগার' এর পুজোর কথা সারা বাংলার অঞ্জন চৌধুরীর ছবির ভক্তরা জানুক।'

ব্যাঙ্ককর্মী ইন্দ্রজিৎ দাশশর্মা এই গলিতে ইউনাইটেড ব্যাঙ্কের রায় বাহাদুর রোড ব্রাঞ্চে চাকরি করতে এসেছিলেন। তিনিও ধীরে ধীরে এই পুজোর আপনজন হয়ে উঠেছেন। তিনিও এক অঞ্জন চৌধুরী ভক্ত। বললেন, 'পাড়ার লোকেদের কাছে অঞ্জন চৌধুরীর কথা শুনে শুনে আমিও মানুষটার ফ্যান হয়ে পড়ি এবং এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত আছি অনেকদিন। পুজোটার কথা সবাই জানতে পারলে সেটাই আমাদের কাজের সার্থকতা।'

অঞ্জন চৌধুরীর ছবি হয়তো বিদেশি পুরস্কার পায়নি, সমালোচকরা তাঁর ছবি নিয়ে হাসিঠাট্টাও করেন। কিন্তু আসল বিচারক তো জনতা জনার্দন, যেটা খুব মানতেন অঞ্জন নিজেও। আর সেটাই তিনি প্রমাণ করে যাচ্ছেন মৃত্যুর পনেরো বছর পরও। সাধারণ মানুষের মুখে মুখে আজও ফেরে তাঁর নাম, পাড়ার পুরনো লোকেদের মুখে আজও অঞ্জনদা বলতেই হাসি ফুটে ওঠে। পরমুহূর্তেই অবশ্য দুঃখে বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে ওঠে তাঁদের, মানুষটাই যে আর নেই।

পুজো মণ্ডপে প্রতিবেদক শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদুন, রতন হোড়, শিশির ও দিগ্বিজয় চৌধুরী।

অঞ্জন চৌধুরীর পাশের বাড়ির প্রতিবেশী, ৮০ পেরোনো এক বৃদ্ধের মুখে-চোখে সেই ভাবই ফুটে উঠল। এই সর্বস্তরের মানুষের হৃদয়ে একজন পরিচালকের কাছের মানুষ হয়ে থাকা কম কথা নয়। পরিচালকরা তো নেপথ্যের মানুষ, তাঁরা তো পর্দার সামনের জনপ্রিয়তা পান না নায়কদের মতো। কিন্তু অঞ্জন চৌধুরী সেই স্টার পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার, যাঁর মৃত্যুর পনের বছর পরও তাঁর পুজো সমারোহ হচ্ছে বেহালায়। এ ঘটনা সত্যি বিরল।

৭৭ ছুঁলেন অপর্ণা সেন, আজও বাঙালির আপন রূপশাস্ত্রের নায়িকা তিনিই


```