
অন্নপূর্ণা ফিল্ম সমালোচনা
শেষ আপডেট: 25 April 2025 16:53
ছবি: অন্নপূর্ণা
চরিত্র চিত্রণে: অনন্যা চট্টোপাধ্যায়, দিতিপ্রিয়া রায়, ঋষভ বসু, অর্ণ মুখোপাধ্যায়
পরিচালনা: অংশুমান প্রত্যুষ
প্রযোজনা: অশোক ধানুকা, হিমাংশু ধানুকা
দ্য ওয়াল রেটিং: ৭ / ১০
চৈত্র মাসে নয়, এবার বৈশাখে রুপোলি পর্দায় মা অন্নপূর্ণা হাজির। অন্নপূর্ণা দাসশর্মা। অন্নপূর্ণার ভূমিকায় অনন্যা চট্টোপাধ্যায়। বহুদিন পর ছবি জুড়ে মুগ্ধ হয়ে দেখলাম এই জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত অভিনেত্রীর অভিনয়। মায়ের চরিত্র কিন্তু তাঁকে ঘিরেই গল্প। আরও ভাল লাগল বন্ধ চার দেওয়ালের বাইরে বেরিয়ে লন্ডন শহর জুড়ে বিলেতে ছবির গল্প। লন্ডনে এক বাঙালি মায়ের স্বপ্নপূরণের গল্প এই ছবি।
ছবির শুরুতে মনে হবে নায়িকা অন্নপূর্ণার সুখের সংসার। স্নান সেরে স্বামীর সঙ্গে খুনসুটি দিয়ে শুরু হয় ছবির গল্প। কিন্তু সিঁদুর পরতে গিয়েও মুছে ফেলে অন্নপূর্ণা। দর্শক পড়ে ধন্দে। তখনই গল্প নেমে আসে বাস্তবের মাটিতে। স্বামী বহুদিন প্রয়াত বিধবা অন্নপূর্ণার। মেয়ে-জামাই বিলেতে সেটল। বনেদি বিশাল শ্বশুরবাড়ি একাই আগলে রেখেছেন অন্নপূর্ণা। এখনও এই বাড়ির দুর্গা পুজো অন্নপূর্ণা ধরে রেখেছেন। কিন্তু সারা বছর অন্নপূর্ণার একাকীত্বের সংসার। তবে তাঁর একাকীত্বের সঙ্গী, মনের সাহস তাঁর স্বামী শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়। যিনি প্রয়াত হলেও স্ত্রীর অবচেতন মনে সঙ্গেই থাকেন।
পরাবাস্তবের স্বামীর বাস্তবে রয়ে যাওয়া ছবিটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ইতিমধ্যে মেয়ে-জামাই দেশে ফিরে মাকে লন্ডনে নিয়ে যাবার প্রস্তাব দেয়। নিয়েও যায় জোর করে। মেয়ে-জামাইয়ের সংসারে বিদেশে গিয়ে অন্নপূর্ণা বুঝতে পারেন তাঁর একাকীত্ব থেকে মুক্তি নেই। মেয়ে-জামাইয়ের বাড়ির কুক কাম কেয়ারটেকার হয়ে থেকে যেতে হচ্ছে তাঁকে। এখানেই শেষ নয়, শাশুড়ির বনেদি বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে সেই টাকা হাতাতে চায় বিপদে পড়া জামাই। সে কথা তাদের অজান্তেই অন্নপূর্ণার কানে আসে।
এমন সময় অন্নপূর্ণার সঙ্গে পরিচয় হয় রনির। বাঙালি রনি লন্ডনে জীবিকা নির্বাহের জন্য লড়াই করছে। রনির মধ্যেই অন্নপূর্ণা খুঁজে পান তাঁর প্রথম মৃত পুত্র সন্তানকে। যে কদিনের জন্যেই এসেছিল মায়ের কাছে। মৃত ছেলের নামে রাঁধা পায়েস বিলেতে রনিকে খাইয়ে দেন অন্নপূর্ণা। আর এই রনি অন্নপূর্ণাকে মা বলে ডেকে এক নতুন দিনের আলো দেখায়। প্রৌঢ়ত্বে শুরু হয় নতুন ব্যবসা। লন্ডনে বাঙালি রান্নার ব্যবসা। এরপর লন্ডনে মায়ের হেঁশেল কতখানি হিট করে সেটা দেখতেই দেখতে হবে এ ছবি। এক মধ্যবয়স্কা নারীর বিদেশের মাটিতে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।
অভিনয়ে এই ছবির প্রাণপ্রতিমা অনন্যা চট্টোপাধ্যায়। তাঁর অভিনয়ের জন্যই এই ছবি মন ভরায়। শান্ত স্নিগ্ধ অভিনয়ে ছবির রাশ অনন্যা ধরে রেখেছেন। মেয়ে আনন্দী দিতিপ্রিয়া নতুন লুকে বেশ যথাযথ, স্মার্ট অভিনয় করেছেন। কিন্তু ছবিতে মা-মেয়ের রসায়ন সে ভাবে জমেনি। যদিও না জমার কারণ এই ছবিতে রক্তের সম্পর্কের বাইরে হঠাৎ পাওয়া সম্পর্কগুলিকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। সেটাই এই ছবির ইউএসপি।
ঋষভ বসু রনি চরিত্রে মন জয় করে নিয়েছেন। অনন্যার পর এই ছবিতে ঋষভের সাবলীল অভিনয় সবথেকে ভাল লাগে। লন্ডনে মা অন্নপূর্ণার বাহন যেন রনি। নিজের মেয়ে জামাই যখন স্বার্থ নিয়ে চলে তখন একদম বিপরীত চরিত্র ঋষভ আর তাঁর বিদেশিনী বান্ধবী। বিদেশিনী বান্ধবীর চরিত্রে আলেকজান্দ্রা টেলর বেশ ভাল করেছেন। ঋষভ আর আলেকজান্দ্রার রসায়ন বেশ জমেছে।
কিন্তু ছবিতে অর্ণ মুখোপাধ্যায় প্রায় ভিলেন হয়েই রয়ে গেছেন। যদিও পরিস্থিতি জামাইকে ভিলেন বানায়। প্রথমত অর্ণ সে ভাবে সুযোগ পাননি এবং তাঁর মঞ্চ অভিনয়ের ছাপ পর্দাতেও এসে যাচ্ছে। অন্নপূর্ণার প্রয়াত স্বামীর ভূমিকায় শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়ের বলিষ্ঠ অভিনয় ছবির মান বাড়ায়। এই ছবিতে রক্তের সম্পর্কের বাইরে অনেক চরিত্র আছে যেমন মুন্নি অনুষ্কা বিশ্বনাথন, বেশ প্রাণবন্ত অভিনয় করেছেন। যদিও এই চরিত্রটির বিকাশ হয়নি চিত্রনাট্যে। কাঞ্চন মল্লিক কমেডি ছেড়ে পরোপকারী চরিত্রে ভাল করেছেন।
ছবির গানগুলি ভাল কিন্তু গানের মাত্রা অত্যাধিক। তবে সোমলতা আচার্য চৌধুরী, ইমন চক্রবর্তী, অঙ্কিতা ভট্টাচার্য সবাই ভাল গেয়েছেন। কিন্তু গানের সুরের রেশ পরে আর থাকে না।
বিদেশের মাটিতে রান্না দিয়েই এক মায়ের নিজের পরিচয় খুঁজে পাওয়া এবং রক্তের সম্পর্কের বাইরেও যে আসল ভরসা বাইরের সম্পর্কে খুঁজে পাওয়া যায়, এটাই 'অন্নপূর্ণা' ছবির প্রাপ্তি।
কিন্তু ছবির প্রথমার্ধে যে টানটান চিত্রনাট্য ছিল, দ্বিতীয়ার্ধের ঘটনা প্রবাহ আগে থেকেই দর্শকরা আন্দাজ করতে পারবেন। প্রকৃত নারীমুক্তিও ছবিতে ঘটে না। অন্নপূর্ণা বিদেশের মাটিতে নিজের হেঁশেলের ব্যবসায় সফল হলেও মেয়ে-জামাইয়ের বন্ধন ত্যাগ করতে পারলেন না। স্নেহ অতি বিষম বস্তু। মায়েরা তো এমনই। তাই অন্নপূর্ণার স্বাধীন রন্ধন ব্যবসাতেও অংশীদার হতে চায় মেয়ে-জামাই।
এক নারীর উত্তরণ এককভাবে দেখালে ছবিটি আরও দৃঢ় হত। মাকে মহান দেখানোতেই যে বিশ্বাস আমাদের। পরিচালক সেই সেন্টিমেন্ট ধরেই এগিয়েছেন। তবু অংশুমান প্রত্যুষ আশা জাগালেন ভাল ছবির।