কলকাতা থেকে কাজের সূত্রে চন্দনপুরে এসে পড়েছে এক তরুণী, প্রীতি। পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। শহরের চাকচিক্য ছেড়ে ছোট্ট শহরে প্রথমে খানিক অস্বস্তি হলেও, মায়ের পরামর্শেই পা বাড়ায় শৈশবস্মৃতিতে ভরা দাদু-দিদার পুরনো বাড়িতে।

আমিষ
শেষ আপডেট: 30 August 2025 15:05
কলকাতা থেকে কাজের সূত্রে চন্দনপুরে এসে পড়েছে এক তরুণী, প্রীতি। পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। শহরের চাকচিক্য ছেড়ে ছোট্ট শহরে প্রথমে খানিক অস্বস্তি হলেও, মায়ের পরামর্শেই পা বাড়ায় শৈশবস্মৃতিতে ভরা দাদু-দিদার পুরনো বাড়িতে। ভেবেছিল, নির্ভরতার এক শান্ত ছায়া পাবে সেখানে। কিন্তু ঘরে প্রবেশের পরই শুরু হল অদ্ভুত এক খেলা—সময়ের, স্মৃতির আর অদৃশ্য শক্তির। কখনও দেখা যায় দিদা-দাদু ব্যস্ত মাছ-মাংস সাজাতে, আবার খাবার টেবিলে কেবল ভাত-ডাল। বিভ্রান্ত প্রীতি যেন অদৃশ্য এক গোলকধাঁধায় আটকে পড়ে।
ক্রমে ঘটনাচক্রে প্রীতি বুঝতে পারে, এই বাড়ি তাকে আটকে রেখেছে এক অদ্ভুত সময়চক্রে—যার সামনে আছে একটি বন্ধ ঘর। দিদার সাজানো সেই আমিষের থালা যেন তাকে টেনে নিয়ে যায় অতীতের অন্ধকারে। সেই অন্ধকারে লুকিয়ে আছে এক ভয়ঙ্কর পাপ, আর তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক গভীর পাপবোধ। সমাজের শ্রেণীভেদে এক মানুষের মৃত্যু। যে বহু বছর ধরে “কাজের মেয়ে” বলে হেয় শুনে এসেছে। তার যন্ত্রণার অগ্নিস্রোতই আজও ঘিরে রেখেছে বাড়িটিকে।
ছবির বিষয়বস্তু শক্তপোক্ত, ভাব ধরার আয়োজন যথাযথ। তবে কিছু দুর্বলতাও চোখে পড়ে। প্রথমত, প্রীতি ঠিক কোন কাজে যুক্ত তা বোঝানো হয়নি। ব্যাকস্টোরি যেন অসম্পূর্ণ। প্রথম দৃশ্যে দেখা যায়, সেক্টর ফাইভের বিলাসবহুল হাইফাই চাকরিরত প্রীতি হঠাৎই সাধারণ দূরপাল্লার বাসে, সানগ্লাস পরা লোক ও মুরগি হাতে যাত্রীর পাশে বসে যাচ্ছে—যা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। আরও প্রশ্ন থেকে যায়—মাঠ পেরিয়ে ‘ছোট দিদা’ ও ‘ছোট দাদু’র বাড়িতে কেন মা প্রিয়াঙ্কা প্রীতিকে পাঠালেন? কারণ, অতীতের সেই কাজের মেয়ের ঘটনার কথা তিনি জানতেনই। তাহলে কি মায়েরই ইচ্ছা ছিল মেয়েকে এই যন্ত্রণার মুখোমুখি দাঁড় করানোর? উত্তর অস্পষ্ট। পাশাপাশি লক্ষ্যণীয়, দিদার বয়স বেড়েছে, অথচ দাদু অর্থাৎ প্রিয়নাথের বয়স সেভাবে বাড়েনি—যা চোখে পড়ার মতো।
আরও একটি অসঙ্গতি স্পষ্ট। গোটা বাড়ি ভগ্নপ্রায়, অথচ প্রীতি যে খাটে শোয়, তার চাদর একেবারে বম্বে ডাইং-এর মতো ঝকঝকে। এমনকি গায়ে দেওয়ার ঢাকাও নতুন। যা পরিবেশের সঙ্গে মোটেই মানানসই নয়। তবে বাকি সবকিছু—কালার গ্রেডিং, সাউন্ড, কালার প্যালেট—ছবির মুডের সঙ্গে একেবারে খাপে খাপ।

অভিনয়ের দিক থেকে প্রায় প্রত্যেকেই সাবলীল। প্রীতি খানিক লাউড মনে হলেও পরে বোঝা যায় চরিত্রের স্বভাবই সেটি। ছোট্ট প্রীতিও একেবারে মানানসই। সবচেয়ে বড় চমক ‘কাজের মেয়ে’ মনিকা পালের অভিনয়—চোখে পড়ার মতো এবং কাবিলেতারিফ। গীতা দোষীর উপস্থিতি এবং কাজের মেয়ের মেকআপও অসাধারণ। মেকআপ আর্টিস্ট দুই প্রসেনজিৎ নিখুঁতভাবে সাজিয়েছেন মুখগুলো।
পরিচালক অরুণাভ খাসনবিসের এটি প্রথম ছবি নয়। তাই গল্পের টানটান বাঁধুনি এক্সপেক্টেডই ছিল— শেষ পর্যন্ত ভরসা নড়বড়েই থেকে গেল। প্রযোজক গৌরব তপাদারের প্রথম পদক্ষেপ সত্যিই প্রশংসনীয়। স্বাধীন ছবি মানেই স্বাধীন মনের দুঃসাহস—‘আমিষ’ সেই সাহসিকতারই প্রমাণ।

৩২ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডের এই শর্ট ফিল্ম সময়ের দিক থেকে ছোট হলেও ভাবনার গভীরতায় একেবারেই ছোট নয়। ছবিটি যদি বড় পর্দায় মুক্তি পেত, তবে তার অভিঘাত আরও তীব্র হতো। পাপবোধ, যন্ত্রণা আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম জুড়ে চলা শ্রেণীভেদের অপরাধ, যা এই গল্প দর্শকের মনে থেকে যেতে পারে।