'ছাউ নৃত্য' পৃথিবীতে কেউ কোথাও দেখে থাকতে পারেন। আমি তো কোনওদিন দেখিনি। এখন বললে বলবে আমি তো আর হিরো হতে পারছি না তাই বলছি। এটা একদম অর্থহীন কথা। যেটা চোখের সামনে অন্যায় দেখছি, ভুল দেখছি সেটাই বলেছি।

গ্রাফিক্স দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 10 September 2025 18:00
'বাংলা ছবির পাশে দাঁড়ান' আজকাল এই কথা প্রায় ইন্ডাস্ট্রির সমস্ত তারকা থেকে পরিচালক, প্রযোজকরা বলে থাকেন। সব ছবির প্রমোশনের সময় কিছু গতানুগতিক কথাই বলা হয়, 'এই ছবি একদম অন্য রকম'। অথচ ছবি রিলিজ করার পর একেবারে বাঁকবদল ছবি কটা আর হচ্ছে! পুজো মানেই একঝাঁক পুজোর ছবি। ছবি রিলিজের আগেই চলছে সারা শহর জুড়ে চলছে বিভিন্ন আসন্ন ছবির প্রমোশন। তারকারা ঘোড়ায় চড়ছেন শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে, কেউ বা লোকনাচের নামটাই ভাল করে জানেন না। তারকাদের স্টারডমের গুরুত্ব কী হারিয়ে যাচ্ছে। কেন তারারা পাবলিকের এত কাছাকাছি চলে যাচ্ছেন? সেই প্রশ্ন তুললেন অভিনেতা ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। এসব প্রমোশনের ঢক্কা নিনাদ দেখে সামাজিক মাধ্যমে গর্জে উঠলেন অভিনেতা ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। দ্য ওয়াল যোগাযোগ করল অভিনেতার সঙ্গে।
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয়ের ভিতর স্বর্ণযুগের অভিনেতাদের মেজাজ ভীষণ ভাবে পাওয়া যায়। বিশেষত, উত্তমকুমার ছায়া মেলে ভাস্করের অভিনয়ে। ছোট থেকেই উত্তমকুমারের অভিনয় দেখে বড় হয়েছেন। ভাস্করের বাবা ছিলেন স্বর্ণযুগে টালিগঞ্জ পাড়ার অভিনেতা মন্টু বন্দ্যোপাধ্যায়।

ভাস্কর দ্য ওয়ালককে বললেন 'ছোটবেলায় সিনেমার পোকা ছিলাম। উত্তর কলকাতার বনেদি পাড়া কালচারে বড় হওয়া। রকে বসে তখন হত সিনেমার আলোচনা। পাড়ার মা-মাসিরা দলেদলে দুপুরবেলা ম্যাটিনি শোতে বাংলা শো দেখতে যেতেন। আমাদের কৈশোর থেকেই বেড়ে ওঠা ভাল ভাল ছবি রিলিজের আবহে।
কখন কোন হলে কোন সিনেমা ( বাংলা/ হিন্দি/ ইংরাজি)আসছে সব মুখস্থ থাকত আমাদের। কবে কোন ছবিটা দেখবো মনে মনে ঠিক করা থাকত। কিন্ত কোনোদিনও সেই সিনেমার অভিনেতাদের সেই সিনেমার প্রচারে আসতে দেখিনি !! না কোনও সিনেমাহলে, না কোনও রাস্তাঘাটে। তাঁরা ছিলেন কল্পনার মানুষ। যাদের দেখা যায় না ছোঁয়া যায় না। তাঁরা 'যদি এমন হতো' মানুষ।
কিন্ত এখন বাংলা ছবিতে একটা নতুন ট্রেনড এসেছে !! যার নাম 'প্রোমোশন'। প্রোমোশনের নামে তো এখন ফাংশন হচ্ছে। ছবির প্রমোশন তো দূর থেকেও তারকারা মিডিয়া, অ্যাপের মাধ্যমেও করতে পারেন। তা তো হচ্ছে না। তারকারা তো রঙিন জগতের লোক। তাঁদের যদি বারবার দর্শকরা সামনে দেখতে পায়, তবে তাঁরা আগ্রহটা হারিয়ে ফেলে। সিনেমা তো একটা স্বপ্নের জগৎ, সেটা যদি বাস্তবে আছড়ে পড়ে তাহলে তো রহস্যটা চলে যায়।
এদিকে ভাস্কর সামাজিক মাধ্যমে লেখেন 'যেখানে ছবি আসার আগে সেই ছবির সব অভিনেতারা জনগণের কাছে গিয়ে ভিক্ষা চইছে। হ্যাঁ ভিক্ষাই বলছি 'যে ছবিটা দেখুন'। আর কিছু অশিক্ষিত ( হ্যাঁ অশিক্ষিতই বলছি ) মানুষও সেই সব দেখছে। কেউ ছাউ (!) নাচছে! কেউ ঘোড়ার পিঠে চড়ছে!কেউ আবার " যা নয় তাই " করছে।
সত্যিই লজ্জা করে ভাবতে যে একটা চলচ্চিত্র চালাতে, দর্শক আনতে এইভাবে তাদের পায়ে পড়তে হবে? আগে তো এটা করতে হত না!!! ছবি চলত নিজগুনে। মানুষ ভালোবেসে ছবি দেখত। ভাবতে ঘেন্না করে বড় বড় ( তথাকথিত) শিল্পীরা এই জোয়ার গা ভাসাছেন ...!!! ভালো ছবি করুন ...মানুষ ঠিক দেখবে। তার জন্য ওই লোকদেখানো " প্রোমোশন" এর কোন প্রয়োজন নেই।'
এমন বিস্ফোরক মন্তব্য করার সাহস দেখালেন অভিনেতা ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। বহু দর্শক ভাস্করকে সাধুবাদ জানিয়েছেন তাঁর এই স্পষ্ট কথার জন্য।
দ্য ওয়ালকে ভাস্কর আরও বললেন 'ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান যদি খেলা হয়, কোচেরা প্লেয়াররা যদি পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে বলেন আমাদের খেলা আছে দেখতে আসবেন, টিকিট কাটবেন। তাহলে কেমন লাগবে! এসব ম্যাচ দেখতে তো দর্শকরা এমনই আসবে। পাবলিক এমনই ভিড় করে। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন ভর্তি হয়ে যায়। যে ছবি লোকে দেখবে, এমনই দেখবে। অথচ আজকাল বেশিরভাগ শো শেষে তারকারা পৌঁছে যাচ্ছেন সিনেমাহলে। বলছেন সবাইকে বলবেন আমাদের ছবি দেখতে, ফেসবুকে লিখতে বলবেন। বাংলা ছবির এমন দৈন্যদশা কবে থেকে হল? আগেকার বাংলা ছবির আর্টিস্টদের এমন করতে হত কী? নয়ের দশকেও এমন বাধ্যতামূলক ট্রেন্ড ছিল না।
পেশাদার রঙ্গমঞ্চ তো এভাবেই শেষ হয়ে গিয়েছে। আর্টিস্টরা গ্রামে মফস্বলে সব চলে গেলেন 'ওয়ান ওয়াল' করতে। গ্রামের লোকরা আর্টিস্টদের সামনে থেকে দেখছেন। যাতে পাবলিক থিয়েটার শেষ হয়ে গেল। কেউ আর বিশ্বরূপা, রঙ্গনা, রংমহল, সারকারিনাতে থিয়েটার দেখতে যেত না। '

তবে ভাস্করকে শেষে প্রশ্ন করা হল একদল লোক তো বলতেই পারে ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ছবিতে আর লিড রোল পান না বলে এমন কথা বলছেন। উত্তরে ভাস্কর নিজেই বললেন দ্য ওয়ালকে 'কে কী বলছে ছবির প্রমোশনে গিয়ে সেটা তো কথা নয়! একজন তো বললেন 'ছাউ নৃত্য' করেছি। 'ছাউ নৃত্য' পৃথিবীতে কেউ কোথাও দেখে থাকতে পারেন। আমি তো কোনওদিন দেখিনি। এখন বললে বলবে আমি তো আর হিরো হতে পারছি না তাই বলছি। এটা একদম অর্থহীন কথা। যেটা চোখের সামনে অন্যায় দেখছি, ভুল দেখছি সেটাই বলেছি। আমি সিনেমার থেকে সিরিয়ালে বেশি পরিচিতি পেয়েছিলাম। আমি হিরো হতে বেশি পারিনি বলে আমি কেন অ্যান্টি হতে যাব! আমি তো স্টার নই। আমাকে দেখতে পুলিশ নামাতে হবে না। কিন্তু স্টারদের এগুলো করা মানায়না।'
শেষমেষ ভাস্কর বললেন 'আমি ছবির প্রমোশনের বিরোধী নই। আমি তো বলছি প্রমোশন কর কিন্তু তাঁর মধ্যে একটা মাত্রা থাকা উচিত, একটা শালীনতা থাকা উচিত। সবার সামনে গিয়ে তারকাদের লাফালাফি না করাই ভাল। এইভাবেই তো স্টারডম চলে যায়। এক ঝলক দেখে মুগ্ধ হলাম তারাদের। ঐ রহস্যটা থাক। যদিও কেউ কী শুনবেন?'