
'হেমন্ত সন্ধ্যা' উদযাপনে আরতি মুখোপাধ্যায় ও হৈমন্তী শুক্লা
শেষ আপডেট: 29 March 2024 16:07
ঠাকুরপুকুর সৃজনছন্দ'-এর ১০ম বার্ষিক অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসদনে মঞ্চস্থ হল 'হেমন্ত সন্ধ্যা'। সেই সন্ধ্যার সুর তাল ছন্দ নিয়ে কলম ধরেছেন শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।
বহু যুগ পর কলকাতার বসন্তে কোকিলকন্ঠী আরতি মুখোপাধ্যায়ের আগমন হল। এই মার্চেই কলকাতার মঞ্চে দু বার পরপর গান গাইলেন আরতি। প্রথম বার উত্তম মঞ্চে এবার রবীন্দ্রসদনে। বিশিষ্ট তবলিয়া দীপঙ্কর আচার্যর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান 'ঠাকুরপুকুর সৃজনছন্দ'-র হেমন্ত সন্ধ্যায় রবীন্দ্রসদনে আরতির সঙ্গে একই মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন অসামান্য সঙ্গীতশিল্পী হৈমন্তী শুক্লা। আর ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান যাঁর কন্ঠে সবথেকে প্রাণ পায় সেই শিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য। এছাড়াও এক ঝাঁক এখনকার শিল্পীর সঙ্গে ছিল 'ঠাকুরপুকুর সৃজনছন্দ' র সভ্যব সঙ্গীত পরিবেশন কখনও একক কখনও সমবেত।
দীপঙ্কর আচার্য দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে তবলায় সঙ্গত করেছেন কিংবদন্তী শিল্পীদের সঙ্গে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, আশা ভোঁসলে,আরতি মুখোপাধ্যায়ের গানের রেকর্ড করার সময় তবলা বাজিয়েছেন তিনি। দীপঙ্কর আচার্যর অনুষ্ঠানে শিল্পীরা তাই ধরা দেন একেবারেই ঘরোয়া মেজাজে। সম্প্রতি হেমন্ত সন্ধ্যা শুরুর আগে রবীন্দ্রসদন ভরে উঠেছিল হেমন্ত গানের আবহে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বরণ করে নেওয়া হল প্রণব রায়ের পুত্র প্রদীপ্ত রায় ও পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র পিয়াল বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সংগীত পরিচালক তথা বাংলা গানের বিশিষ্ট গীটারিস্ট বুদ্ধদেব গঙ্গোপাধ্যায়-কে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সহকারী মিউজিশিয়ান ছিলেন বুদ্ধদেব।
ঘড়ি ধরা ঠিক পাঁচটায় শুরু হয় অনুষ্ঠান। অকল্পনীয় ভাবে ৩৭ টি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের স্বকন্ঠের ও সুরারোপিত গান পরিবেশন হল, যা সত্যি প্রশংসনীয়। গানের সাথে টুকরো টুকরো গল্প বললেন দেবাশিস বসু। শুরুতেই 'ঠাকুরপুকুর সৃজনছন্দ'র সুশান্ত ভৌমিক ও সমবেত কন্ঠে গায়ে কাঁটা দেওয়া পারফরমেন্স 'পথের ক্লান্তি ভুলে'। অনবদ্য সঙ্গত। অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল বম্বে থাকা আসা আরতি মুখোপাধ্যায় ও বাংলার হৈমন্তী শুক্লার উপস্থিতি। আরতি-হৈমন্তী দুই বন্ধু বহুযুগ পর মানে-অভিমানে হাত ধরলেন গ্রিনরুমে। তবে মঞ্চে দুজন এলেন আলাদাই।
আরতি মঞ্চে উঠতেই দর্শকদের মধ্যে তৈরি হল উন্মাদনা। বহু বছর পর রবীন্দ্রসদনে আরতি। ঠাকুরপুকুর সৃজনছন্দের পক্ষ থেকে দীপঙ্কর আচার্য সংবর্ধনা জ্ঞাপন করলেন আরতিকে। শ্রীকান্ত আচার্য পড়লেন মানপত্র। আরতি মুখোপাধ্যায় হেমন্ত-কথায় বললেন "হেমন্তদার সঙ্গে গান করতেও যেমন ভাল লাগত, গল্প করতেও খুব ভাল লাগত। হেমন্তদাকে দেখলে মনে হতো না উনি এত মজার মানুষ। ওঁনার সঙ্গে গেয়েছি,ওঁনার সুরে গেয়েছি,এক সঙ্গে অনেক অনুষ্ঠানও করেছি। হেমন্তদাকে মনে রাখা শুধু গানের জন্য নয়, সকলের সুখে-দুখে উনি এসে দাঁড়াতেন। বম্বেতে আমার বাড়ির কাছে হেমন্তদা থাকতেন। প্রায় রোজই আমার বাড়িতে আসতেন। ওঁনার সুগার ছিল তাই মিষ্টি খাওয়া বারণ ছিল। কিন্তু আমার বাড়ি এসে ফ্রিজ খুলে মিষ্টি খেয়ে নিতেন নিজেই। মুখ মুছে বলতেন -বেলাকে কিন্তু একদম বলবি না।" হেমন্ত সুরে আরতি 'অজানা শপথ' ছবির 'ওগো বন্ধু আমার আঁধার রাতে যদি এলে' দু কলি গাইলেন। দ্বিতীয় গানে আরতির সেই আগের টান যেন ফিরে পেলাম। 'কতদূর আর কতদূর, প্রেমেরই সেই মধুপুর' গানে যেভাবে আরতি গাইলেন তা মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে শ্রোতাদের । হেমন্ত সুরে এই গানের কথা লিখেছিলেন আরতির প্রথম স্বামী সুবীর হাজরা। ২৪ শে মার্চ ছিল ভি বালসারার মৃত্যুদিবস। বালসারাজি কতটা সময়ানুবর্তিতা মেনে চলতে তা বললেন আরতি। শুধু তাই নয় তখন ভি বালসারা লতা মঙ্গেশকর,মহঃ রফিকে কলকাতায় এনে হিন্দি ছবির গান রেকর্ড করাতেন। জানা গেল সেই সব ছবিতেও গান গেয়েছিলেন আরতি।
দ্বিতীয়ার্ধের চমক ছিল হৈমন্তী শুক্লা ও শ্রীকান্ত আচার্য র এক সঙ্গে সঙ্গীত পরিবেশন । হৈমন্তী কে বরণ করে নেওয়ার পর একেবারে আড্ডার মুডে হৈমন্তী ধরা দিলেন। 'রাগ অনুরাগ' ছবিতে হেমন্ত-সুরে মালকোষের উপর দুর্দান্ত ক্লাসিকাল ডুয়েট গেয়েছিলেন হেমন্তর সঙ্গে হৈমন্তী 'কী গান শোনাব বলো ওগো সুচরিতা'। সে গান এদিন মঞ্চে গেয়ে মন ভরিয়ে দিলেন হৈমন্তী শুক্লা। ছবিতে অনুপকুমার আর সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়ের লিপে ছিল গানটি। এই সন্ধ্যা স্মরণীয় হয়ে থাকল শ্রীকান্ত আচার্যর কন্ঠে 'তার আর পর নেই, নেই কোন ঠিকানা' গানের অসাধারণ পরিবেশনায় ।
গানের মাঝেমাঝে 'তারপর' বলে উঠলেন হৈমন্তী শুক্লা। এই তারপর' হেমন্তর সঙ্গে বলেছিলেন মুকুল দত্তর স্ত্রী হিন্দি ছবির বিখ্যাত অভিনেত্রী চাঁদ উসমানি।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কথায় হৈমন্তী বললেন "আমি বাগবাজারে তখন থাকতাম জানেন। আমার একবার জ্বর হয়েছে তাই হেমন্তদার গান রেকর্ডিংয়ে যেতে পারিনি। হেমন্তদার ফোন "কীরে তুই এলি না?" বললাম জ্বর হয়েছে খুব। ওমা ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে বাগবাজারে আমার বাড়ি এসে উপস্থিত। আমি বললাম "এতদূর অহেতুক এলেন কেন?" হেমন্তদার উত্তর "তুই যে বললি জ্বর হয়েছে!" হেমন্তদা আমাকে নিজের মেয়ের মতো ভালবাসতেন। দাদা নেই আমি ভাবতেও পারিনা।" বলেই আবেগপ্রবণ হৈমন্তী শুরু করলেন 'ওগো বৃষ্টি আমার চোখের পাতা ছুঁযো না'। গানটি ছিল পুজোর গানে হৈমন্তীর প্রথম হিট।
শ্রীকান্ত আচার্য কথা বলার কন্ঠ আর গানের গল্প দুটোই অপূর্ব। গানে গল্পে সেভাবেই ধরা দিলেন শ্রীকান্ত। 'যদি জানতে চাও এ ব্যথা আমার কতটুকু' গানে শ্রীকান্ত আচার্য অতুলনীয়। 'ভিজে যাওয়া চোখ দুটো' গায়কীতে গোটা রবীন্দ্র সদনকে মন্ত্রমুগ্ধ করে দিলেন শ্রীকান্ত। শ্রীকান্ত আচার্যর সঙ্গে এই সময়ের সঙ্গীতশিল্পী তৃষা পাড়ুইয়ের দ্বৈত গান 'চঞ্চল মন আনমনা হয়'খুব ভাল লাগল।
সঞ্চালক দেবাশিস বসু বললেন সেই কবেকার ১৯৫৬ সালের ছবি 'সূর্যমুখী'তে সন্ধ্যারানি র লিপে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের এই গান সুর করেছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। বৃষ্টিলেখা নন্দিনী একক কন্ঠে মাত করলেন। হেমন্ত-লতার ডুয়েট 'দে দোল দোল দোল'। সুদেষ্ণা গাঙ্গুলির কন্ঠে প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'বড় সাধ জাগে' বেশ লাগল। কিশোরকন্ঠী অমিত গাঙ্গুলি আসর জমিয়ে দিলেন 'লুকোচুরি' ছবির 'শিং নেই তবু নাম তাঁর সিংহ'। এমন সুর কিন্তু হেমন্তই করেছিলেন। শুভ্রকান্তি চট্টোপাধ্যায়ের মিষ্টিগলায় কানে আরাম দিল 'শুকসারি' র 'ওগো চন্দ্রবদনী সুন্দরী'।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের স্বল্পশ্রুত অনেক গান এই জলসার তালিকায় রেখেছিলেন দীপঙ্কর আচার্য। 'ফুলের মতো ফুটল ভোর' পরেশ ধরের কথায় সুরে হেমন্ত গেয়েছিলেন গানটি। পঞ্চাশের দশকের জনপ্রিয় গানে নৃত্য পরিবেশন করলেন শ্বেতশুভ্র সাজে শিউলি মণ্ডল। ৩৭ টি হেমন্ত গানের সফর এক সন্ধ্যেতে ইতিহাস তৈরি করল।