আজ, ২৮ জুলাই, তাঁর জন্মদিনে ফিরে দেখা সেই একখানা জীবনের পাতায়, যা নিজের ছায়া ফেলে দিয়ে হাজারো নতুন জীবনের আলো হয়ে উঠেছিল।

সুখেন দাস
শেষ আপডেট: 28 July 2025 13:09
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একটা নাম... এক অদম্য সাহস... এক লড়াকু জীবন... আর একটা স্বপ্ন, যার অশ্রুজলে শুরু হয়— তিনি ‘সুখেন দাস’। আজ, ২৮ জুলাই, তাঁর জন্মদিনে ফিরে দেখা সেই একখানা জীবনের পাতায়, যা নিজের ছায়া ফেলে দিয়ে হাজারো নতুন জীবনের আলো হয়ে উঠেছিল।
কলকাতার বউবাজারের বিখ্যাত ‘শ্রীনাথ দাস লেন’– এই গলির নামেই আজও বেঁচে আছেন উনিশ শতকের বিশিষ্ট আইনজীবী ও অভিজাত শ্রীনাথ দাস। আর এই শ্রীনাথই ছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা, পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার সুখেন দাসের পিতামহ।
শ্রীনাথের আদি বাড়ি ছিল হালিশহরে। পিতা রামলোচন দাস ছিলেন স্থানীয়ভাবে বিখ্যাত ধনী ব্যক্তি, যিনি পরবর্তীতে কলকাতায় এসে দুর্গাদালানসহ একাধিক অট্টালিকা নির্মাণ করেন। সেই দুর্গাদালান আজও টিকে আছে বউবাজারের দশ নম্বর শ্রীনাথ দাস লেনে, যেখানে প্রতি বছর আজও দুর্গাপূজা হয়।

শ্রীনাথ নিজেও ওকালতিতে সুখ্যাতি অর্জন করেন। কিন্তু তাঁর পুত্রদের জীবন ভিন্ন পথে গড়ায়। নাট্যআন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁদের কেউ কেউ জীবন দিয়ে শিল্পকে বেছে নেন। এরই একজন উপেন্দ্রনাথ দাস – যিনি ‘শরৎ সরোজিনী’ ও ‘সুরেন্দ্র বিনোদিনী’ নাটকের মাধ্যমে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান এবং কিছুদিনের জন্য কারাবরণও করেন। অন্যজন, সুখেনের পিতা ফণীন্দ্রনাথ দাস – নাট্যপ্রযোজনায় যুক্ত হয়ে আর্থিক দিক থেকে পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। দেনার দায়ে একদিনে তাঁর অংশের কলকাতার ন’টি বাড়ি বিক্রি করতে হয়। এরপর একের পর এক ধাক্কায় পরিবার হারায় মাথার ছাদ, অভিভাবকত্ব। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ফণীন্দ্রনাথের মৃত্যু হয় এবং তার কিছুদিন পরই মৃত্যু হয় তাঁর স্ত্রীরও।
তখন সুখেন দাস এবং তাঁর ভাইবোনেরা একেবারেই শিশু। কোনো আত্মীয়ের দয়ায় ঠাঁই হয় অনাথ আশ্রমে। কিন্তু চঞ্চল, জেদি ও আত্মবিশ্বাসী ছোট্ট সুখেনকে সে আশ্রম আটকে রাখতে পারেনি। একদিন দেয়াল টপকে পালিয়ে আসে সে। রাস্তাই হয়ে ওঠে তাঁর ঠিকানা, অন্যের দয়া আর ছোটখাটো কাজের বিনিময়ে চলে খাবারের ব্যবস্থা।
এমনই একদিন ধর্মতলায় ফুটপাথে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় এক সদয় চিকিৎসকের। তাঁর চেম্বারে পরিচ্ছন্নতা ও ছোটোখাটো কাজে যুক্ত হয়ে সুখেন পান নিরাপত্তার আশ্রয়। কিন্তু এই স্থির জীবনে তিনি নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। সিনেমা হল ঘুরে ঘুরে ছবি দেখতেন, আর শিখতেন অভিনয়। বাবার রক্তে যে নাট্যের টান ছিল, তা যেন স্বাভাবিক ভাবেই ফুটে উঠতে শুরু করল তাঁর মধ্যে।
স্টুডিওয় সুযোগ পাওয়ার আশায় সুখেন ঘুরতে লাগলেন একের পর এক গেটে। কিন্তু কোথাও ঢোকার অনুমতি মিলছিল না।

একদিন দারোয়ানের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে গেলেন। সেই সময় বিখ্যাত শব্দযন্ত্রী জে. ডি ইরানি ঘটনাস্থলে এসে তাঁর সাহস, কৌতূহল ও মুখের মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে ফ্লোরে ঢুকতে দেন। অভিনয়ের অনুকরণ করে দেখাতে বললে, সুখেন এতটাই ভালো করে অভিনয় করে দেখান যে সবার মন জয় করে ফেলেন।
এর কিছুদিন পরই বিখ্যাত পরিচালক দেবনারায়ণ গুপ্তের নজরে পড়ে যান তিনি। দেবনারায়ণ তখন ‘দাসীপুত্র’ ছবির কাজ করছেন (১৯৪৯)। মাত্র এগারো বছরের সুখেনকে ছোট্ট একটি চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দেন তিনি। এখান থেকেই ‘মাস্টার সুখেন’ হিসেবে তাঁর সিনেমা-জীবনের সূচনা। একই বছরে প্রেমেন্দ্র মিত্র পরিচালিত ‘কুয়াশা’ ছবিতেও শিশু নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেন।
তারপর থেকে প্রায় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি আড়াইশোরও বেশি বাংলা ছবিতে অভিনয় করেছেন—নায়ক, খলনায়ক, চরিত্রাভিনেতা—নানান রূপে। পঞ্চাশের বেশি ছবিতে প্রধান চরিত্রে, আর অনেক ছবিতে পরিচালক, কাহিনিকার ও চিত্রনাট্যকার হিসেবেও তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন।

সাতের দশকের পর বাংলা সিনেমার বাণিজ্যিক ধারায় যখন পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে, সেই সময় সুখেন দাস হয়ে ওঠেন ‘পারিবারিক মেলোড্রামার’ অন্যতম মুখ। ‘পান্না হীরে চুনী’, ‘সিংহ দুয়ার’, ‘সোনা বৌদি’, ‘জীবন মরণ’, ‘প্রতিশোধ’, ‘দাদামণি’ বা ‘স্বর্ণমহল’-এর মতো ছবি তাঁকে বানিজ্যিক সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দেয়।
তবে তাঁর সাফল্যের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে তাঁর ব্যক্তিত্বে। নিজের কষ্টের অতীত ভুলে যাননি কখনও। শ্যুটিং ইউনিটে সবার খাওয়া-দাওয়ার খোঁজ তিনি নিজেই রাখতেন। নিজে খেতেন সবার শেষে। সিনেমার ভেতরে-বাইরে এই মানবিকতা ছিল তাঁর অন্যতম পরিচয়।
আটের দশকে উত্তমকুমারের মৃত্যুর পর বাংলা সিনেমার যে টালমাটাল সময় এসেছিল, সেখানে অঞ্জন চৌধুরীর পাশাপাশি তিনিও দায়িত্ব নিয়েছিলেন সিনেমার ধারাকে টিকিয়ে রাখার। সেই সময় অনেক সমালোচনা সত্ত্বেও তিনি বাণিজ্যিক সিনেমার স্রোতে সামিল হন। কারণ, তাতে বাংলা সিনেমাকর্মীদের জীবিকা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছিল। তবু চলচ্চিত্রের শালীনতা ও রুচির প্রশ্নে তিনি কখনও আপোস করেননি।
সুখেন দাস—একটি নাম নয়, একটি সময়, এক সংগ্রামের প্রতীক। অনাথ আশ্রম থেকে সিলভার স্ক্রিনে নায়ক হয়ে ওঠার কাহিনি, একেবারে শূন্য থেকে শুরু করে সৃষ্টিশীলতার উচ্চতায় পৌঁছানোর জীবনপথ আমাদের শিক্ষা দেয়—সাহস, আত্মবিশ্বাস আর নিষ্ঠা থাকলে অন্ধকার গলিও আলোয় ভরে উঠতে পারে।