বিশ্বচর্চিত চন্দননগরের আলোকশিল্প যেন এক রহস্যময় পরম্পরা। ফরাসি কলোনির সেই প্রাচীন শহর আবারও সাজছে আলোয়, ইতিহাসে জুড়ছে নতুন পালক।

চন্দননগরের আলো নিয়ে যত গল্প, তত বিস্ময়
শেষ আপডেট: 12 September 2025 14:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিশ্বচর্চিত চন্দননগরের আলোকশিল্প যেন এক রহস্যময় পরম্পরা। ফরাসি কলোনির সেই প্রাচীন শহর আবারও সাজছে আলোয়, ইতিহাসে জুড়ছে নতুন পালক। এ বার সেই শিল্পকে নিয়ে তৈরি হল পূর্ণাবয়ব তথ্যচিত্র। ভাবনা ও ক্যামেরার পিছনে রয়েছেন হুগলির ভূমিপুত্র, জাতীয় পুরস্কারজয়ী তথ্যচিত্র নির্মাতা অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। নাম দিয়েছেন তিনি— ‘দ্য র্যাকেন্টার অব দ্য ডার্ক — আঁধারপটুয়া’।
৭৪ মিনিটের এই ছবিতে ধরা পড়েছে শিল্প, শিল্পীর অজানা ইতিহাস ও সংগ্রামের কাহিনী। অভিজিৎ বলছেন, “শ্রীধর দাসই এই শিল্পের জনক। পড়াশোনা ছিল না, এমনকি নিজের ঘরে আলোও ছিল না। অথচ তাঁর হাতেই জন্ম নিল এক বিশ্বখ্যাত শিল্পধারা। আজও চন্দননগরের মানুষ সেই আলোয় মেতে আছেন। সেটিই আমার তথ্যচিত্রের প্রাণ।”
চন্দননগরের আলো নিয়ে যত গল্প, তত বিস্ময়। সিনেমা গুপি গাইন বাঘা বাইন-এর ভূতের রাজার পিছনে যে বিখ্যাত আলোকসজ্জা, সেটিও করেছিলেন চন্দননগরের শিল্পীরা। জিম্বাবোয়ের হারারে শহরের পার্কেও বসেছে তাঁদের তৈরি আলো। কিন্তু আজও এই শিল্পের কোনো সরকারি স্বীকৃতি নেই, এমনকি এর নির্দিষ্ট নামও দেওয়া হয়নি। শহরের মানুষ তাই শুধু বলেই এসেছেন— “চন্দননগরের আলো।”
এমনই নানা অজানা ইতিহাস ধরা পড়েছে ‘আঁধারপটুয়া’য়। শ্রীধর দাস ও তাঁর উত্তরসূরিদের লড়াই, তাঁদের অন্ধকারের ভিতর থেকে আলো ফুটিয়ে তোলার গল্প। অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন, “এই মানুষগুলো আসলে আমাদের আনন্দের স্রষ্টা। কিন্তু আমরা তাঁদের শিল্পী বলিনি, বলেছি শুধু ‘ইলেকট্রিক মিস্ত্রি’। অথচ তাঁরা আজও রয়েছেন অন্ধকারেই। হয়তো তাঁদের শিল্পকে দেখাতে রাতের অন্ধকার লাগে বলেই, তাঁরাও অন্ধকারে থেকে গেলেন।”
চন্দননগরের মেয়র রাম চক্রবর্তীও উচ্ছ্বসিত। বললেন, “আবারও আলোকমালায় সাজবে শহর। দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ আসবেন। এই আবহে চন্দননগরের আলোকশিল্প নিয়ে জন্মচর্চা আরও একবার গর্বের।”
কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভজিৎ সাউ-ও একই সুরে জানালেন, “একটি শহরের নিজস্ব শিল্প যখন তথ্যচিত্রের বিষয় হয়, তখন আমাদের গর্ব আরও বেড়ে যায়। শহরবাসী হিসেবে আমরা সত্যিই পরিতৃপ্ত।”
আজ, শুক্রবার, নন্দনে সেই তথ্যচিত্রের প্রথম প্রদর্শনী। সামনে জগদ্ধাত্রী পুজো। শহর জুড়ে আলোর উৎসবের আবহে যেন এই প্রদর্শনী বাড়তি মাত্রা জুড়ে দিল।
চন্দননগরের আলোকশিল্প আসলে এক অনামা মানুষের সৃষ্টি। শ্রীধর দাস থেকে তাঁর উত্তরসূরি প্রজন্ম— তাঁরা আলো দিয়ে সাজিয়েছেন দেশ থেকে দেশান্তর, আর তার বিনিময়ে পেয়েছেন শুধুই উপেক্ষা। আমাদের কাছে তাঁদের শিল্প আনন্দের, তাঁদের আলোয় শহর উজ্জ্বল, অথচ তাঁরা আজও অচেনা, অন্ধকারের আড়ালে। হয়তো, সেই আঁধারই তাঁদের ক্যানভাস। আলোয় ভাসা পৃথিবী দেখলেও, তাঁরাই থেকে যান আঁধারের আলো হয়ে।