তরুণ মজুমদার, সত্যজিৎ রায়রা বলতেন গল্পটা ছবিতে ভাল করে বল তাহলেই দর্শক দেখবে। সায়ন্তন ঘোষাল অতিরিক্ত স্মার্টনেস দেখাতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছেন। প্রথম ভাগেই দর্শক ধরে রাখতে অক্ষম হলেন তিনি।

গ্রাফিক্স -দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 4 September 2025 16:14
ছবি: সরলাক্ষ হোমস
পরিচালক: সায়ন্তন ঘোষাল
অভিনয়ে: ঋষভ বসু, অর্ণ মুখোপাধ্যায়, গৌরব চক্রবর্তী, রাজনন্দিনী পাল
প্রযোজনা: এস কে মুভিজ
দ্য ওয়াল রেটিং: ২/১০
সাদা কালো যুগের রহস্য রোমাঞ্চ বাংলা ছবি বলতে যে ছবির নাম প্রথমেই আসে সেটি হল 'জিঘাংসা'। পরিচালক অজয় কর ও সংগীত পরিচালক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। হেমন্ত প্রযোজক রূপে হিন্দিতে পরে একই কাহিনি নিয়ে ছবি বানান 'বিশ সাল বাদ'। পরিচালনা করেছিলেন বীরেন নাগ। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে কণ্ঠে 'বিশ সাল বাদ'-এর গান আজও কাল্ট। দুটি ক্লাসিক ছবিই রমরমিয়ে চলেছিল বাংলায় ও বম্বেতে। স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের 'দ্য হাউন্ড অফ বাস্কারভিল' অবলম্বনে 'জিঘাংসা' ও 'বিশ সাল বাদ' তৈরি হয়। সেই একই গল্পের নির্যাসে সায়ন্তন ঘোষাল বানালেন 'সরলাক্ষ হোমস'। 'পরশুরাম' রাজশেখর বসু বাংলা সাহিত্যে প্রথম শার্লক হোমসকে নিয়ে আসেন তাঁর 'নীলতারা' তে। 'সরলাক্ষ হোম' নামেও তিনি একটি স্পুফ লেখেন। পরশুরাম কে শ্রদ্ধা জানিয়ে গোয়েন্দা নায়কের এই নাম দিয়েছেন পরিচালক সায়ন্তন ঘোষাল। 'সরলাক্ষ হোমস'-এর গোয়েন্দাগিরি কতখানি জমল? শার্লকের ক্ষুরধার বুদ্ধির প্রয়োগ কি হল ছবিতে?
![]()
সরলাক্ষ হোমস যার ছেলেবেলা কেটেছিল কলকাতায়। বাবা বাঙালি পুলিশ অফিসার। কনস্টেবল থেকে ঘষেমেজে অফিসার হয়েছে। যে চরিত্রে বাদশা মৈত্র ভাল করেছেন। তাঁর স্ত্রী বিদেশিনী।
তাদের দুই ছেলে। সরলাক্ষ ছোট। যখন সরলাক্ষর নয় বছর বয়স তার বাবা-মা আলাদা হয়ে যায়। বাবার কাছেই কলেজ অবধি বেড়ে ওঠা কলকাতাতেই। সরলাক্ষ বড় হবার পর ঋষভ বসু। একদিন বাবার সঙ্গেই সরলাক্ষ হাজির হয় এক বৃদ্ধার আত্মহত্যার তদন্তে। সবাই আত্মহনন ভাবলেও সরলাক্ষ ঘোষনা করে এটা আত্মহত্যা নয় খুন। খুনিকেও সবার সামনে চিহ্নিত করে দেয় সরলাক্ষ। সমাজের প্রভাবশালী সেই খুনি সরলাক্ষকে মেরে ফেলতে চায়। তাই সরলাক্ষকে লন্ডনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু লন্ডনে গিয়ে সরলাক্ষ হয়ে ওঠে দুঁদে গোয়েন্দা।
সায়ন্তন ঘোষালের পরিচালনায় কোনান ডয়েলের 'শার্লক' হয়ে উঠেছেন বাঙালি 'সরলাক্ষ'। তাঁর সহকারী ওয়াটসন হয়ে গিয়েছেন বাঙালি আর্য সেন। যে চরিত্রে অর্ণ মুখোপাধ্যায়। স্যর হেনরির পরিবার হয়েছে 'চৌধুরী' পরিবার। তবে এই বিদেশি চরিত্রগুলি বাংলা বললেও বেশিরভাগ চরিত্র ঠিকঠাক বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠেনি।
সবথেকে এই ছবিকে হাস্যকর করে তুলেছেন নায়ক সরলাক্ষ ঋষভ বসু। ছবির শুরু থেকেই তিনি হাস্যকর। না আছে গোয়েন্দার বুদ্ধির মেধা, না আছে ব্যক্তিত্ব। তিনি যেন সারা ছবি জুড়ে একজন ফ্যাশন শোয়ে হাঁটা মডেল। অথচ হলিউড আভিজাত্য এতটুকু ফুটে ওঠেনি। বারবার মনে হয় ময়ূরপুচ্ছ কাক। ছবির শুরুই হচ্ছে সরলাক্ষর বালখিল্য অ্যাকশন দিয়ে। বন্ধু আর্যকেই টোপ হিসেবে ব্যবহার করে দুষ্কৃতী দমন করে সে। ঋষভের অভিনয়ে ধার ভার কিছুই নেই। আবার সরলাক্ষর গোয়েন্দাগিরির বৈশিষ্ট্য সে প্রমাণ চেটে দেখে তদন্ত করে। যা আরও হাস্যস্পদ।
নিজেকে অতি বুদ্ধিমান ফ্যাশন আইকন গোয়েন্দা সাজাতে গিয়ে কলার খোসায় যেন পা উল্টে পড়েছেন ঋষভ। এত খারাপ মানের গোয়েন্দা দেখলে বাঙালির ফেলুদা, ব্যোমকেশ, মিতিনমাসিরা হাসবে।
অথচ পরিচালক সায়ন্তন ঘোষাল গোয়েন্দা থ্রিলার গল্প করে আগের বেশ কিছু ছবিতে দাগ কেটেছিলেন। অত্যাধিক বেশি ছবি বানানোই কি তাঁর এই অবনমনের কারণ?
তেমনই দুর্বল পদ্মনাভ দাশগুপ্তর চিত্রনাট্য, সঞ্জীব ব্যানার্জীর স্টোরি অ্যাডাপশান। যে দুর্বল চিত্রনাট্যে অর্ণ মুখোপাধ্যায়, রাজনন্দিনী পাল, গৌরব চক্রবর্তী শতফ ফিগার, সাহেব চ্যাটার্জীরা ভাল অভিনয় করার চেষ্টা করেও বিফলে যায়।
সবথেকে বড় কথা, স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের 'দ্য হাউন্ড অফ বাস্কারভিল' উপন্যাসে যে গা ছমছমে ব্যাপার ছিল সেই ব্যাপারটাই এই ছবিতে নেই। না আছে গভীরতা, না আছে বুদ্ধিমত্তা। তরুণ মজুমদার, সত্যজিৎ রায়রা বলতেন গল্পটা ছবিতে ভাল করে বল তাহলেই দর্শক দেখবে। সায়ন্তন ঘোষাল অতিরিক্ত স্মার্টনেস দেখাতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছেন। প্রথম ভাগেই দর্শক ধরে রাখতে অক্ষম হলেন তিনি।
ছবির আউটডোর লন্ডনে দেখতে স্মার্ট লাগে তবু তা অপ্রয়োজনীয়। এসকে মুভিজের পরপর ছবিতে আউটডোর বারবার লন্ডনে,যা দেখতেও একঘেঁয়ে লাগে। ছবির মেকিং এত নিম্নমানের যে সিনেমাটোগ্রাফি, এডিটিং, শিল্প নির্দেশনা কিছুই এ ছবিকে পার করতে পারে না। গানে রূপম ইসলাম ও ঊষা উত্থুপ যথাযথ। তবে গানগুলি দাগ কাটে না।
কুকুর যে ছবিতে দেখানো হল তাও ভয় জাগাতে অক্ষম। অতি কায়দাবাজি করতে গিয়েই সরলাক্ষ গল্প বলার সরলতা হারাল। করুণ উদ্রেককর এই ছবি ধারেকাছেও গেল না পাঁচের দশকে বানানো কাল্ট বাংলা ছবি 'জিঘাংসা'র। এমনকি 'বিশ সাল বাদ' করে বলিউডে বাঙালি হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠা পান। তখনকার পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকাররা কত এগিয়ে ছিলেন। এমন হাস্যকর 'সরলাক্ষ হোমস' শার্লকের হতাশ প্রয়োগ হয়েই রইল।