বাংলাদেশের শক্তি তাদের মানসিকতা। তারা জানে, হারালেও তেমন সমালোচনা আসবে না। কিন্তু জিতলে? ইতিহাস লেখা হবে। এই ‘কিছুই হারানোর নেই’-মানসিকতা বরাবরই বিপজ্জনক।

বাংলাদেশ টিম
শেষ আপডেট: 24 September 2025 11:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নামের সামনে দাপট, রেকর্ডের পাহাড়, টানা জয়ের ছন্দ—সব মিলিয়ে এশিয়া কাপে সুপার ফোরে আজও ভারতের (India) ঝুলিতে ‘হট ফেভারিট’ তকমা। কিন্তু এই ট্যাগের বোঝাই মাঝেসাঝে বিপদ ডেকে আনে। কারণ প্রতিপক্ষ যখন বাংলাদেশ (Bangladesh), তখন ইতিহাস বলে দিচ্ছে—টাইগারদের ‘আন্ডারডগ’ তকমা একদিক দিয়ে যতটা ভাঁওতা, ঠিক ততটাই ভয়ঙ্কর। তালগোল পাকানো একটা সেশন, আচমকা ব্যাটিং ধস কিংবা এক ওভারে বিপুল রান খরচ টিম ইন্ডিয়াকে টেনে নিয়ে যেতে পারে অস্বস্তির গর্তে।
তা ছাড়া বাংলাদেশ ক্রিকেটের ডিএনএ বরাবর আলাদা, ছকভাঙা। ছোট দল হয়েও বারবার বড়দের ঘুম কেড়েছে। ২০০৭ বিশ্বকাপে (World Cup 2007) পোর্ট অব স্পেনে তারকাখচিত ভারতকে দেওয়া ধাক্কা, ২০১৫ সালে ঘরের মাঠে ঐতিহাসিক ওয়ানডে সিরিজ জয় কি স্রেফ ব্যতিক্রম? তাহলে ২০১৮ এশিয়া কাপ ফাইনালে টিম ইন্ডিয়াকে শেষ ওভার পর্যন্ত রীতিমতো ধুঁকতে হবে কেন? ২০১৬-র টি২০ বিশ্বকাপে (T20 World Cup) জয়ের খুব কাছাকাছি এসেও পা ফসকে যাওয়া কিংবা ২০২২-এ অ্যাডিলেডে লিটন দাসের ঝড়ো ব্যাটিং—বাংলাদেশ প্রতিবার প্রমাণ করেছে, বড় মঞ্চে ভারতকে ভড়কে দেওয়ার কৌশল তারা বিলক্ষণ জানে।
যে কারণে অভিষেক শর্মা, সূর্যকুমার যাদব বা শুভমান গিলেরা যতই ফর্মে থাকুন না কেন, বাংলাদেশকে হাল্কা চোখে দেখলে ভুল হবে। কারণ টাইগারদের সাফল্যের মন্ত্র একেবারে সোজা—ধৈর্য, সাহস আর আক্রমণাত্মক মানসিকতা। মুস্তাফিজুর রহমান (Mustafizur Rahman) এখনও ভয় ধরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। তাঁর ডেথ-ওভার বোলিং, কাটার-স্লোয়ারের বৈচিত্র্যে বিশ্বমানের ব্যাটাররা পর্যন্ত বিভ্রান্ত হন। পাশাপাশি স্পিনাররা মন্থর পিচে চেপে ধরতে ওস্তাদ। একবার যদি ভারতের টপ অর্ডার আটকে যায়, তখন চাপ পড়বে মিডল অর্ডারে। যা কাজে লাগাতে বাংলাদেশ সিদ্ধহস্ত।
ব্যাটিংয়ের দিক থেকেও প্রতিপক্ষ শিবিরে রসদের কমতি নেই। শাকিব আল হাসান না থাকলেও দলে রয়েছেন সাইফ হাসান (Saif Hassan), যিনি আগের ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে দুরন্ত জয় এনে দিয়েছেন। তৌহিদ হৃদয় (Towhid Hridoy) এশিয়া কাপে টিমের সর্বোচ্চ রান-সংগ্রাহক। শান্ত স্বভাবের ব্যাটার, ধারাবাহিকভাবে ভরসা জুগিয়ে চলেছেন। লিটন দাস (Litton Das) তো আছেনই—যিনি সম্প্রতি টি-২০ ক্রিকেটে দেশের সবচেয়ে বেশি রান শিকারী। এই তিনজনের ধারাবাহিকতা ভারতীয় বোলিংকে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জে ফেলতে পারে।
তা ছাড়া তরুণ তানজিদ হাসান তামিম (Tanzid Hasan Tamim) মাঝেমধ্যে আলো ছড়াচ্ছেন। ফর্ম খারাপ হলেও জাকার আলি অনীকের (Jaker Ali Anik) মতো পাওয়ার হিটার যদি জ্বলে ওঠেন, ম্যাচ ঘুরে যেতে সময় লাগবে না। অর্থাৎ, বাংলাদেশের ব্যাটিং কোনও একজনের উপর নির্ভরশীল নয়, গোটা লাইনআপই লড়াই করতে জানে।
ভারত অবশ্যই এগিয়ে। কিন্তু বাস্তব হচ্ছে—টি২০ ফরম্যাটে (T20 format) সামান্য ভুলই সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে। টিম ইন্ডিয়ার ব্যাটাররা যদি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে রান তুলতে গিয়ে উইকেট ছুড়ে দেন, বা বোলাররা এক-দু’ওভার নষ্ট করেন, তখন খেলার মোড় ঘুরে যেতে সময় নেবে না!
ইতিহাসও বলছে, বাংলাদেশ ভারতকে শুধু চাপে ফেলেনি, জিতেও দেখিয়েছে। ২০১৫-তে মুস্তাফিজুরের টানা দুই ম্যাচে পাঁচ উইকেট নিয়ে হোঁচট খাওয়ানো, কিংবা ২০০৫-এ কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বিশ্বক্রিকেটে হইচই ফেলে দেওয়া—সবই জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ। তাই আজকের ম্যাচের আগে যতই ভারতীয় শিবিরে আত্মবিশ্বাস থাকুক, আদতে লিটন–হৃদয়–সাইফদের ধারালো পারফরম্যান্সই লড়াইয়ের চাকা উলটে দিতে পারে।
বাংলাদেশের শক্তি তাদের মানসিকতা। তারা জানে, হারালেও তেমন সমালোচনা আসবে না। কিন্তু জিতলে? ইতিহাস লেখা হবে। এই ‘কিছুই হারানোর নেই’-মানসিকতা বরাবরই বিপজ্জনক। ভারতকে তাই আজ শুধুই প্রতিপক্ষের রণকৌশল নয়, স্নায়ুযুদ্ধও জিতে দেখাতে হবে!