এই এড়িয়ে চলা শুধু মিডিয়া-ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়। এর মধ্যেই ধরা পড়ছে মানসিক শৈথিল্য। হার মানতে না পারা, দায় নিতে না চাওয়া—এটাই হয়তো পাকিস্তান ক্রিকেটের বড় রোগ।

সলমন আঘা
শেষ আপডেট: 22 September 2025 18:38
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মাঠে হোঁচট, মাঠের বাইরে অস্বস্তি।
পাকিস্তান ক্রিকেট এখন শুধু ব্যাট–বলের লড়াইয়েই নয়, মিডিয়ার মঞ্চেও মুখ লুকোচ্ছে। যে দল একসময় ময়দানে টিম ইন্ডিয়াকে টক্কর দিত, ‘মিডিয়া-স্মার্ট’ বলে কলার তুলত, তারাই এখন ভারতীয় সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়াতে কেমন যেন কুণ্ঠিত, জড়সড়!
এশিয়া কাপের (Asia Cup 2025) মঞ্চে ইতিমধ্যেই দু’বার ভারতের কাছে হারতে হয়েছে। কিন্তু খেলার ব্যর্থতার চেয়েও বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে—কেন সাংবাদিক সম্মেলন এড়িয়ে চলেছে পাকিস্তান? বিশেষত, ভারতীয় মিডিয়াকে প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না কোন রহস্যে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবকিছুর সূত্রপাত ১৪ সেপ্টেম্বর, দুবাই আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে। ভারত–পাক গ্রুপ ম্যাচ। টসে দুই অধিনায়কের মধ্যে করমর্দন হয়নি। ভারতীয় শিবির জানিয়ে দেয়, পহেলগামের জঙ্গিহানায় ২৬ জন সাধারণ নাগরিকের মৃত্যুর পর পাকিস্তানের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় সম্ভব নয়। সেই চাপানউতর থেকেই শুরু বিস্তর আলোড়ন।
মাঠের লড়াই গড়ায় পাকিস্তানের বিপক্ষে। সাত উইকেটে লজ্জার পরাজয়। দৃষ্টান্তমূলক আত্মসমর্পণ। কিন্তু ম্যাচ-পরবর্তী সাংবাদিক সম্মেলনে দেখা যায়, সলমন আলি আঘা (Salman Ali Agha) বেমালুম গায়েব। নিয়ম অনুযায়ী, অধিনায়কের আসার হওয়ার কথা থাকলেও হাজির হন কোচ মাইক হেসন (Mike Hesson)। যেখানে তাৎপর্যপূর্ণভাবে ভারতীয় সাংবাদিকদের প্রশ্ন তোলার সুযোগও দেওয়া হয়নি।
পরের ম্যাচ সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (UAE) বিরুদ্ধে। সেখানে সবাইকে চমকে দিয়ে নির্ধারিত প্রেস কনফারেন্স বাতিল করে দেয় পিসিবি (PCB)। অজুহাত—‘দল অনুশীলনে ব্যস্ত’! কিন্তু আসল কারণ কি প্রস্তুতি? নাকি ভারতীয় মিডিয়ার প্রশ্ন এড়ানো? জল্পনা ক্রমশ ঘনীভূত হয়।
২২ সেপ্টেম্বর সুপার ফোরে আবারও ভারতের মুখোমুখি পাকিস্তান। ফল একই—পরাজয়। প্রশ্ন আরও জোরাল: ম্যাচ শেষে পাকিস্তান কি এবার নিয়ম মেনে প্রেস কনফারেন্স করবে? শেষমেশ সলমন আঘা সাংবাদিকদের সামনে এলেন বটে। কিন্তু ঘটনাচক্রে দেখা গেল, ভারতীয় সাংবাদিকরা আবারও সওয়াল রাখার সুযোগটুকু পেলেন না। প্রেস কনফারেন্সের সময় মাইক্রোফোন ঘুরল শুধু পাকিস্তানি সাংবাদিকদের দিকে। ভারতের তরফে একাধিক হাত উঠলেও তাঁদের প্রশ্ন চাপা পড়ল। পাকিস্তানের মিডিয়া ম্যানেজার নইম গিলানি (Naeem Gilani) যেন সচেতনভাবেই মঞ্চ নিয়ন্ত্রণ করলেন। আর সেই দৃশ্য স্পষ্ট করে দিল, এশিয়া কাপ শুধু মাঠেই নয়, মাইক্রোফোনের দুনিয়াতেও ভারত–পাক দ্বন্দ্বে ভরপুর!
এতকিছুর মধ্যে পাক বোর্ড প্রধান মহসিন নকভি (Mohsin Naqvi) এশিয়া কাপ চলাকালীন হাজির হন দুবাইয়ের আইসিসি একাডেমিতে। ভারতীয় সাংবাদিকরা ছুটে যান তাঁর দরবারে। সরাসরি প্রশ্ন—কেন সাংবাদিক সম্মেলন বারবার বাতিল হচ্ছে? কেন ভারতীয় মিডিয়াকে প্রশ্নের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না? নকভির জবাব ছিল অস্পষ্ট। পিঠটান দেওয়ার আগে শোনা যায়, ‘শিগগিরই আমরা কথা বলব!’ কিন্তু সেই ‘শিগগিরি’ কবে? উত্তর আজও মেলেনি।
ক্রিকেট হোক বা রাজনীতি। হার মেনে নেওয়ার সাহসটাই আসল। সেখানে পাকিস্তানের আচরণ অদ্ভুত। পরাজয়ের দায় স্বীকার তো দূরের কথা, কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতেই চাইছে না তারা। অথচ নিয়ম পরিষ্কার—ম্যাচ শেষে অধিনায়ক বা কোচকে সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়াতেই হবে। তা না হলে শাস্তির মুখে পড়তে পারে যে কোনও দল।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—পাকিস্তান এতটা আতঙ্কিত কেন? কীসের ভয়? ভারতীয় সাংবাদিকরা মাঠের পারফরম্যান্স নিয়েই প্রশ্ন করতেন। সেটা সামলানো কি এতটাই কঠিন? নাকি দলের ভিতরমহলের অস্থিরতা সামনে আনতে ভয় পাচ্ছে পিসিবি?
অন্যদিকে একই টুর্নামেন্টে ভারতীয় অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব (Suryakumar Yadav) সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়েছেন বারবার। ভয়ডরহীন মেজাজে উত্তর দিয়েছেন, সওয়াল যতই অস্বস্তিকর হোক না কেন! এমনকি এক পাক সাংবাদিক সরাসরি হাত না মেলানো বিতর্ক নিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেও তিনি মেজাজ হারাননি। হাসিমুখে বলেছেন, ‘কিছু কিছু বিষয় ক্রিকেটের সৌজন্যের থেকেও বড়!’ এটাই তো পেশাদারিত্ব। যেখানে চাপ এড়ানো নয়, চাপকে মেনে নিয়ে জবাব দেওয়া জরুরি।
আসলে এটা নতুন কিছু নয়। এর আগে গ্রুপ পর্বেও পিসিবি আইসিসিকে চিঠি লিখে জানিয়ে দেয়, ম্যাচ রেফারি অ্যান্ডি পাইক্রফট (Andy Pycroft) নাকি পাকিস্তান অধিনায়ককে হাত না মেলাতে বলেন। সেই অভিযোগ খারিজ করে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা। উলটে পাক বোর্ডের উপরই নিয়ম ভাঙার দায় চাপায়। সুপার ফোরে ফের একবার ফখর জামানের আউট নিয়ে আইসিসির কাছে লিখিত অভিযোগ পিসিবি-র। একের পর এক ইস্যুতে পাকিস্তান বোর্ডের অবস্থান ‘অভিযোগ জানানো’-তেই সীমাবদ্ধ। মাঠে জেতার সাহস না থাকলে, অন্তত সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়ানোর সাহস তো থাকা উচিত! পরাজয়ের পর অধিনায়কই দলের মুখ। সেখানেই সলমন আঘা বারবার এড়িয়ে যাচ্ছেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি।
২৩ সেপ্টেম্বর শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের বাঁচা–মরার লড়াই। হার মানে কার্যত বিদায়। তার আগে প্রশ্নটা আরও বড় হয়ে উঠছে—সলমন আঘারা এবার কি সাংবাদিক সম্মেলনে বুক চিতিয়ে আসবেন? ভারতীয় মিডিয়ার প্রশ্ন শুনে উত্তর দেবেন? নাকি আবারও এড়িয়ে যাবেন? এই এড়িয়ে চলা শুধু মিডিয়া-ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়। এর মধ্যেই ধরা পড়ছে মানসিক শৈথিল্য। হার মানতে না পারা, দায় নিতে না চাওয়া—এটাই হয়তো পাকিস্তান ক্রিকেটের বড় রোগ। যতক্ষণ না তারা এই সাহস শিখছে, ততক্ষণ মাঠে হোক কিংবা মাঠের বাইরে, আফ্রিদিরা বারবার ধাক্কা খাবেন।