এই লম্বা কেরিয়ারে বিরাট যা করে দেখিয়েছেন, এর জন্য তাঁর এই সম্মান প্রাপ্য। চোখে যে স্বপ্ন ছিল পৃথিবীকে জয় করার, সেটা তিনি ইতোমধ্যেই করে ফেলেছেন।

বিরাট কোহলি
শেষ আপডেট: 19 June 2025 18:25
একটা ফ্ল্যাশব্যাক মনে করা যাক। তারিখটা ১৯ ফেব্রুয়ারি। সাল ২০১১। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে খেলতে নামলেন একজন বাইশ বছরের যুবক। এটাই তাঁর সিনিয়র কেরিয়ারের ওয়ার্ল্ড কাপ। বয়সটা কম হলেও লক্ষ্য আকাশচুম্বী। স্বপ্ন বিশ্বজয়ের।
প্রথম সুযোগে যেন জাত চেনাতে ভুল করলেন না তরুণ খেলোয়াড়। হাঁকালেন দুর্দান্ত শতক। তাও আবার মাত্র ৮৩ বলে। সেদিনই হয়তো গোটা বিশ্ব জেনে গেল, তিনি আসছেন দুনিয়া জিতে নিতে।
এতক্ষণে হয়তো বুঝে ফেলেছেন, যাঁর কথা বলছি, তিনি আর কেউ নন, বরং ‘দ্য কিং’ বিরাট কোহলি। বিশ্বকাপ স্পর্শ করার সৌভাগ্য তাঁর হয়েছিল। অন্যদিকে অনেক অনেক কিংবদন্তির ভিড়ে এক তরুণ নক্ষত্রের সন্ধান পেয়ে গেল ভারত। সেই বিশ্বকাপে যে ন’টা ইনিংস তিনি খেলেছেন, সেখানে সর্বমোট রান ২৮২।
এবার আসুন ২ এপ্রিল ২০১১-এ। এটা সেইদিন, যেদিন ভারত ওয়ার্ল্ড কাপ জিতেছিল। জয়লাভের পর কিংবদন্তি শচীন তেন্ডুলকরকে সকলে মিলে কাঁধে তুলে উদযাপনে মাতল। উপহার দিল এক অবিস্মরণীয় বিদায়।
আজ পনেরো বছর বাদে হয়তো সকলের একটাই স্বপ্ন, একটাই প্রশ্ন। ক্রিকেটের ঈশ্বর যদি এমন রাজকীয় বিদায় পেয়ে থাকেন, তাহলে রাজা-কে বঞ্চিত রাখার মানে কী? তিনিও এমন জমকালো আয়োজনের হকদার! যেন আরও একটি বিশ্বকাপ হাতে সকলের কাঁধে চড়ে ক্রিকেটকে চিরতরে আলবিদা জানাতে পারেন কোহলি!
বিরাট তাঁর খেলা প্রতিটি বিশ্বকাপেই নিজের সব কিছু উজাড় করে টিমের জন্য লড়েছেন। ২০১৫ সালে ৫০.০৮-এর গড়ে তুলেছেন ৩০৫ রান। কিন্তু সেমিতে অস্ট্রেলিয়ার কাছে পরাজিত হয়ে শেষ হয় অভিযাত্রা।
তারপর ২০১৯ সালেও ৫৫.০৪-এর দুর্দান্ত গড়ে করলেন ৪৪৩ রান। তবে গত আসরের মত এবারও তরী তীরে এসেই ডুবল। পরাস্ত করল নিউজিল্যান্ড।
অতঃপর ২০২৩। যেখানে আয়োজক দেশ ভারত নিজেই। কোহলিও ছিলেন অবিশ্বাস্য ফর্মে। উপহার দিলেন স্মরণীয় বিশ্বকাপ। ৯৫.০৬-এর গড়ে হাঁকালেন ৭৬৫ রান। যেখানে ছিল ছ’টি শতক এবং তিনটি অর্ধশতক। যারা চোখে দেখেনি তাদের কাছে এটা অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয়, অভাবনীয়।
অথচ এই অমর কীর্তি গড়ার পরেও ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ছুঁতে পারলেন না সেই ট্রফি। টুর্নামেন্ট সেরা হয়েও নির্বাক অশ্রুসিক্ত চোখে চেয়ে থাকলেন বিশ্বকাপ বিজয়ী অস্ট্রেলিয়ার দিকে।
এই সবই তো অতীতের গল্প। দুঃখের, ব্যর্থতার, না পাওয়ার কাহিনি। এবার একটু আলোকপাত করা যাক বর্তমান এবং ভবিষ্যতের দিকে।
বয়সটা আজ ছত্রিশ বছর। চব্বিশে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতে ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততম ফর্ম্যাট থেকে অবসর নিলেন। এরপর কিছুদিন আগেই ঘোষণা দিলেন, সেই বিখ্যাত সাদা জার্সি গায়ে আর খেলবেন না টেস্ট।
তাহলে এবার টার্গেট কী? আর দু’বছর বাদে ওয়ান ডে বিশ্বকাপ। তখন বয়স গিয়ে দাঁড়াবে আটত্রিশে। নিজের চিরায়ত কঠোর নিয়মশৃঙ্খলা মেনে ফিটনেস ঠিকঠাক ধরে রাখতে পারবেন কোহলি? হয়তো অধিনায়কত্বের ভার তিনি নেবেন না। তবে মুকুটহীন রাজার মতো একজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড় হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে যাবেন। সেই বিশ্বকাপ, সেই সোনার হরিণ যদি কোনওমতে ভারত স্পর্শ করার সুযোগ পায়!
আসলে এগারো সালের ছুঁয়ে দেখা আর তখনকার সেই স্পর্শের মধ্যে থাকবে বিশাল তফাৎ। তিনি নিজে এবং অন্যরা যেভাবে শচীনকে রাজকীয়ভাবে বিদায় দিয়েছিলেন, এবার হয়তো সকলের কাঁধে থাকবেন তিনি নিজেই। এই স্বপ্ন সকল ভারতীয় দেখে থাকেন। কিং হয়তো সেদিনই ঘোষণা করবেন বিদায়। রাজার প্রস্থান যেন রাজার মতোই হয়… এটাই সকলের চাওয়া।
এই লম্বা কেরিয়ারে বিরাট যা করে দেখিয়েছেন, এর জন্য তাঁর এই সম্মান প্রাপ্য। চোখে যে স্বপ্ন ছিল পৃথিবীকে জয় করার, সেটা তিনি ইতোমধ্যেই করে ফেলেছেন। সকলের মনের আশার সেই সোনার হরিণ অর্থাৎ বিশ্বকাপটা ফের একবার স্পর্শ করতে পারলে ‘দ্য কিং’ বিরাট কোহলি হয়ে উঠবেন ক্রিকেটের অধীশ্বর।