গুয়াহাটির স্কোরবোর্ড তাই শুধু পিছিয়ে পড়া নয়—এ এক সতর্কবার্তা। সমস্যা উইকেটে নয়, সমস্যাটা ভিত্তিতে। এখন সময় ভিতটা মেরামত করার।
.jpeg.webp)
স্পটলাইটে ব্যাটিং বিপর্যয়
শেষ আপডেট: 25 November 2025 12:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইডেনে মুখ থুবড়ে পড়া ব্যতিক্রম নয়। নিউজিল্যান্ডের হাতে চুনকাম খাওয়াটাও নয় বিচ্ছিন্ন ঘটনা৷ গুয়াহাটির ময়দানে ব্যাটিং লাইন আপ ভেঙে পড়া, অকাতরে রান বিলোনো, ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে ম্যানেজমেন্টের দ্বিধাতুর অবস্থান আসলে একটা খুব চেনা ও পরিচিত রোগেরই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মাত্র। এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ। যারা গলদের গোড়া খুঁজতে বসে স্রেফ মহম্মদ সামির মতো কয়েকজন যোগ্য, অভিজ্ঞ খেলোয়াড়কে বাদ দেওয়া নিয়ে হইচই করতে নারাজ। বদলে নজর ঘুরিয়েছেন ঘরোয়া ক্রিকেটের দিকে। কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিসিসিআই আর কতটুকু কথা রেখেছে—এই হিসেব বুঝে নেওয়ার সময় আসন্ন—আওয়াজ ইতিমধ্যে দেশের ক্রিকেট মহলে উঠতে শুরু করেছে!
গুয়াহাটির সকাল তাই শুধু একটি অবক্ষয় নয়—পূর্ণাঙ্গ ‘ডায়াগনোসিস’। ভারতীয় ব্যাটিং-ধসকে ঘিরে যত আলোচনা, যত হতাশা, তার মূলে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে—রঞ্জি ক্রিকেট দিয়ে টেস্ট টিম গঠনের অধরা স্বপ্ন, যা এখন কাগজে-কলমে আটকে! মাঠে, নির্বাচনী চর্চায়, নীতিতে—কোথাও তার প্রতিফলন আগের মতো নেই।
বিসিসিআই বহুদিন ধরেই বলে আসছে—‘রঞ্জির পারফরম্যান্সই সিলেকশনের মূল মাপকাঠি!’ কিন্তু সেই কথার সঙ্গে বাস্তবের দূরত্ব রীতিমতো দৃষ্টিকটু। নির্বাচনে এখন ‘প্রজেক্ট ক্রিকটার’ ধারণা শক্তিশালী—যাঁরা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এখনও নিজেদের পুরোপুরি মজ্জায়-মজ্জায় প্রমাণ করতে ব্যর্থ, তাঁরাই পাচ্ছেন সুযোগ। আর ঘরোয়া লিগে পাহাড়প্রমাণ রান বানিয়ে চলেছেন যাঁরা, বসতে হচ্ছে সাইড বেঞ্চে।
পরিসংখ্যান নির্মম—করুণ নায়ারের ১২৫ ম্যাচে ৫০-এর গড়, সরফরাজ খানের ৬০ ম্যাচে ৬৩.১৫—আগে যেটা ‘অটোমেটিক টেস্ট টিকিট’-এর সমতুল্য, এখন কোনও নিশ্চয়তাই তৈরি করছে না। তুলনায় সাই সুদর্শনের ৩৮ ম্যাচে ৩৯-এর গড় বা জুরেলের সীমিত অভিজ্ঞতা—এই সবই ইঙ্গিত করছে নির্বাচনের মেরুদণ্ড কতটা বেঁকে গিয়েছে!
সমস্যা শুধু খেলোয়াড় বাছাইয়ে? নাকি ক্রিকেট-বুদ্ধিরও? গুয়াহাটিতে তার প্রমাণ মিলেছে। টপ অর্ডারের পতন বাঁধাধরা চিত্রনাট্য—হঠকারিতা, পরিস্থিতি না বোঝা, সেশন-পাঠ না জানা। সেখানে ওয়াশিংটন সুন্দরের সঙ্গে কুলদীপের ৩৫ ওভারের ‘গ্রাইন্ডিং’ জুটি এক জমজমাট ক্লাসরুম—টেস্ট ক্রিকেট কী, তা শেখানোর পাঠ। অথচ সেই পাঠেই অনুপস্থিত থাকা তরুণ ব্যাটারদের খেলানো হচ্ছে, যাদের মধ্যে কেউ কেউ এখনও টেস্ট জার্নির অর্ধেক পথও পেরোয়নি।
এই জায়গাতেই বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য স্পষ্ট—টেস্ট ক্রিকেট ভবিষ্যৎ তৈরি করার ল্যাবরেটরি নয়। এটা এমন এক ফরম্যাট, যেখানে টেকনিকের পাশাপাশি চরিত্র, মেজাজ, পরিস্থিতি অনুধাবন—সব মিলিয়ে ব্যাটারের পূর্ণতা দরকার। এই পরিণতি আসে শুধুই ঘরোয়া ক্রিকেটের ‘স্কিল-গ্রাইন্ড’-এ। রঞ্জিতে যাঁরা রান করছেন, তাঁরা ঠিক সেই কঠিন পরিস্থিতিতে বারবার তৈরি হচ্ছেন—শুষ্ক পিচ, স্থৈর্যের পরীক্ষা, ৯০ ওভার ধরে লড়াই—যা ভারতীয় টেস্ট ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় অক্সিজেন।
কিন্তু সেই অক্সিজেনই ধীরে ধীরে কমছে। ফলে ক্রমশ দৃশ্যমান—পরাজয়টা আসলে বহিরঙ্গে, ভিতরে ভিতরে সিস্টেমটাই দুর্বল! কারণ সেটা তো আমাদের টেস্ট ভাবনা তৈরি করে—কোন পজিশনে কে খেলবে, কতটা রোটেশন হবে, কোন অভিজ্ঞতাকে মূল্য দেওয়া হবে। এবং সেখানেই ভারত এখন ‘অতিরিক্ত ভবিষ্যৎমুখী’ হয়ে পড়ছে। একটা কথাই ঘুরে ঘুরে ফিরে আসছে—ভারত কি সত্যিই পুনর্গঠনের পথে? নাকি সত্যিটা অন্য?
টিম ইন্ডিয়া তো বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ক্রিকেট কাঠামোর দেশ। দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী টেস্ট হোম রেকর্ডের মালিক। এমন ময়দানে কী করে বাছাই নীতিতে অভিজ্ঞতার মূল্য হুড়মুড়িয়ে কমে গেল? দীর্ঘদিন ধরে যে যুক্তি দেখানো হচ্ছে—‘এখন হারলেও ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে’—সেটা প্রশ্নের মুখে। কারণ ভারতীয় ক্রিকেট প্রতিশ্রুতি কিংবা সম্ভাবনা তৈরির মতো ছোট দল নয়। তারা জেতার জন্যই খেলে। হার মানে প্রশ্ন—আর সেই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে থাকে গোটা সিস্টেমে। আজ তাই গুয়াহাটি বুঝিয়ে দিচ্ছে—পরাজয়টা স্রেফ কাকতালীয় নয়, এটা পরিকাঠামোগত ব্যর্থতা!
রঞ্জির গুরুত্ব যদি কেবল কথা আর প্রেস রিলিজে সীমাবদ্ধ থাকে, আর জাতীয় দলে সুযোগ তৈরি হয় ‘প্রজেক্ট’ বা বয়সভিত্তিক ভাবনায়—তবে এমন ধস আরও নামবে। সোজা কথা—তরুণেরা দরকার, কিন্তু ‘অভিজ্ঞতা’ বিলাসিতা নয়—টেস্ট ক্রিকেটে সেটা অপরিহার্য। ভারতের দল নির্বাচনে এই দুইয়ের মিশ্রণই এখন অনুপস্থিত। যদি ঘরোয়া ক্রিকেটকে সত্যিকারের মানদণ্ড করা না হয়, যদি রঞ্জির সেরা পারফরমারদের নিয়মিত সুযোগ দেওয়া না হয়, যদি ক্রিকেট-বুদ্ধির স্কুলে তরুণদের পাঠ পড়ানো না হয়—তবে এই বিপর্যয় আরও বড় আকার নেবে।
গুয়াহাটির স্কোরবোর্ড তাই শুধু পিছিয়ে পড়া নয়—এ এক সতর্কবার্তা। সমস্যা উইকেটে নয়, সমস্যাটা ভিত্তিতে। এখন সময় ভিতটা মেরামত করার।