এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা—এর আড়ালে কেবল ময়দানি খামতি নয়, লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের গভীর অসুখও। মাঠের ব্যর্থতা আসলে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি আর সামরিক মনোভাব ও অধঃপতনের বাস্তব প্রতিফলন।

ছবি: সংগৃহীত
শেষ আপডেট: 13 August 2025 16:55
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বছরের গোড়ার ছবি। ঢাকঢোল পিটিয়ে, রাতারাতি স্টেডিয়ামের ভোল বদলে কয়েক দশক বাদে বরাত পাওয়া আইসিসি টুর্নামেন্টের আয়োজন করেছিল পাকিস্তান। অনেকেরই ধারণা ছিল, ঘরের মাঠে সমর্থকদের হর্ষ-উল্লাসে মন্দ্রিত স্টেডিয়ামে বিরাট বড় কিছু একটা ঘটিয়ে ফেলবেন বাবর আজমরা।
কিন্তু আখেরে কী হল? গ্রুপ লিগে একের পর এক বিপর্যয়, চিরশত্রু ভারতের কাছে হার এবং নক আউটে না উঠেই পত্রপাঠ বিদায়! এত আড়ম্বর, এত ঢক্কানিনাদ—সব সিন্ধু নদে বয়ে গেল! তোপের মুখে পড়লেন খেলোয়াড়রা। চাকরি খেল কোচের। কিন্তু যেখানে আদতে ঘুণ ধরেছে, সেই মসনদে আসীন নির্বাচক প্রধান কিংবা বোর্ড (PCB) প্রেসিডেন্টের টিঁকিটিও কেউ ছুঁতে পারল না। মহসিন নাকভি এখনও স্বপদে আসীন। বহাল তবিয়তে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন। ইচ্ছেমতো কোচ ও কোচিং স্টাফদের নিয়োগ করছেন, আবার ছুড়ে ফেলছেন। একাধিক ফর্ম্যাটে একাধিক কোচের আজগুবি তত্ত্ব প্রণয়ন করছেন। অথচ কেউ টুঁ শব্দটুকু করছে না!
চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে হারের লজ্জা, নিউজিল্যান্ডের হাতে নাস্তানাবুদ হওয়ার গ্লানি মুছতে না মুছতেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের ঘরে গিয়ে আপাতত অর্ধচন্দ্র খেতে হয়েছে। ৩৪ বছর বাদে ক্যারিবিয়ানে সিরিজ হাতছাড়া। এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা—এর আড়ালে কেবল ময়দানি খামতি নয়, লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের গভীর অসুখও। মাঠের ব্যর্থতা আসলে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি আর সামরিক মনোভাব ও অধঃপতনের বাস্তব প্রতিফলন।
ময়দানে ম্যাচ, মগজে যুদ্ধ
ভারতের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মানেই পাকিস্তানের সর্বত্র যুদ্ধং দেহি আবহ ছড়িয়ে পড়া। মিডিয়া, রাজনীতিক এমনকি ক্রিকেট বোর্ডের কর্তারাও এই লড়াইকে ‘মর্যাদারক্ষার যুদ্ধ’ বলে দেগে দেন। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতেও একই দৃশ্য দেখা গিয়েছে। এতে খেলোয়াড়দের উপর চাপ অসহনীয় হয়ে ওঠে। বাইশ গজে নামার আগেই মাথায় গুঁজে দেওয়া হয়: প্রতিটি রান বুলেট, প্রতিটি উইকেট মানেই সীমানা দখল। ফলে যুক্তিযুক্ত রণকৌশল, পরিকল্পনা যায় উবে। বাড়ে ভুল। ভেঙে পড়ে মনোবল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো সিরিজেও সেই চাপের ভূত দলকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। গতকালের ম্যাচ এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ব্যাট হাতে নেমে শুরু থেকেই নাগাড়ে উইকেট খুইয়েছে পাকিস্তান। সিরিজ নির্ধারণকারী ম্যাচে স্নায়ুর চাপ ধরে রাখতে পারেনি।
অর্থনীতির ধস, উপেক্ষায় ক্রীড়াখাত
পাকিস্তানের অর্থনীতি এখন পিছনে হাঁটছে। এরই মধ্যে চলতি বছরের বাজেটে সামরিক খাতে বরাদ্দ প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা (ভারতীয় মুদ্রায়)। যা মোট জিডিপি-র প্রায় ২%। শিক্ষাক্ষেত্র পেয়েছে ২%, স্বাস্থ্য ১.৩%। ক্রীড়াখাতের বরাদ্দ এতই নগণ্য যে, আলাদা একটি লাইনও অনেক নথিতে অনুপস্থিত। সামরিক বাজেট ২০% বেড়েছে। কিন্তু ক্রিকেট বা অন্যান্য খেলায় বিনিয়োগ কার্যত শূন্যের কোঠায়। এর অর্থ: প্রশিক্ষণকেন্দ্র, আধুনিক পরিকাঠামো, পেশাদার কোচিং—সবই টাকার অভাবে ধুঁকে চলেছে। বদলে সীমান্তে বাড়ছে উত্তেজনা। চলছে গুলিবর্ষণ। সন্ত্রাসবাদীদের পোষণ। আর যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা!
বোর্ডে পচন, মাঠে ছ্যাঁকা
ক্ষমতাসীন সরকারের মতো পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডও একচক্ষু। একদিকে দল বিশ্রীভাবে পরাস্ত হয়ে চলেছে। একের পর এক সিরিজ হাতছাড়া হচ্ছে। অন্যদিকে বোর্ডের অন্দরে বিস্তর আর্থিক অনিয়ম! কর্মকর্তারা কেউ দেখেও দেখছেন না, কেউ সরাসরি বেনিয়মে লিপ্ত।
২০২৩ সালের সরকারি অডিট রিপোর্টে বেরিয়ে এসেছে কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত পারিশ্রমিক, অনুমোদনহীন নিয়োগ আর অপচয়ের হিসেব। শীর্ষ নেতৃত্বে ক্ষমতার লড়াই, কোচ-অধিনায়ক ঘন ঘন বদল, দল বাছাই নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব—খেলোয়াড়দের পেশাদার স্থিতি উধাও! যেখানে বাকি দলগুলি যুফের দাবি মেনে আন্তর্জাতিক মানের ফিটনেস ট্রেনার বা স্পোর্টস সাইকোলজিস্ট নিয়োগ করে চলেছে। পিসিবি তাতে নজর পর্যন্ত দিচ্ছে না। প্রতিভা ভরপুর। কিন্তু তাকে মাজাঘষা না করলে কাজের কাজটুকু হবে কীভাবে?
ঘরোয়া ক্রিকেটের ঝুরঝুরে কাঠামো
ভারতের সঙ্গে তুলনা করলেই পাকিস্তানের ছবিটা স্পষ্ট হবে। ভারতীয় ক্রিকেটের মেরুদণ্ড ঘরোয়া টুর্নামেন্ট—রঞ্জি, সৈয়দ মুস্তাক আলি, আইপিএল। কোটি টাকার স্পনসরশিপ, বিশ্বমানের স্টেডিয়াম, নিয়মিত বিনিয়োগ ক্রিকেটারদের ধারালো করে তোলে। পাকিস্তানে এর ঠিক উলটো চিত্র। আইপিএলের সঙ্গে রেষারেষি করে বানানো পাকিস্তান সুপয়ার লিগ (PSL) ছাড়া বড় মঞ্চ নেই। যা বোর্ডের অর্থকষ্টে বারবার টলমলে!
যুদ্ধপ্রিয় মনোভাবের বিষ
ক্রিকেটে জয়-পরাজয় স্বাভাবিক। কিন্তু পাকিস্তানের হার মানেই ‘জাতীয় অপমান’। এই দৃষ্টিভঙ্গি তরুণদের গলা টিপে ধরে। অভিষেক ম্যাচেই তারা পড়ে যায় জাতীয় গর্ব রক্ষার অযথা চাপে। ফল? ভুল শট, অগোছাল বোলিং, খামখেয়ালি ফিল্ডিং। প্রতিপক্ষ যখন শান্ত মাথায় খেলে, পাকিস্তান তখন আবেগে ডুবে সিদ্ধান্ত নেয়। যা অধিকাংশ সময় আত্মঘাতী।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ—একটি স্বচ্ছ আয়না
ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে অপ্রত্যাশিত পরাজয় দেখিয়ে দিল, পাকিস্তানকে হারাতে প্রতিপক্ষকে বিশেষ কিছু না করলেও চলবে। ক্যারিবিয়ানরা শুধু শৃঙ্খলা মেনে খেলেছে। ভুল কম করেছে। ব্যাস! এটুকুই যথেষ্ট। পাকিস্তান ডুবেছে স্বখাতসলিলে—নিজেদের দোষে। দুর্বল ব্যাটিং, অমনোযোগী ফিল্ডিং, চাপ সামলাতে না পারা বোলিং—বিপর্যয়ের ময়নাতদন্তের গভীরে না ঢুকেও একগুচ্ছ কারণ সামনে টেনে আনা যেতে পারে। এগুলো কেবল টেকনিক্যাল ঘাটতি নয়। রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রচ্ছায়া।