এখন ফিল্ড-ম্যানিপুলেশন আগের চেয়েও নিখুঁত। মিড-অন তুলে আক্রমণ, থার্ড-ম্যানের খালি জায়গা খুঁজে একের পর এক সিঙ্গল চুরি—এগুলোই সূক্ষ্ম লড়াই।
.jpeg.webp)
বিরাট কোহলি
শেষ আপডেট: 3 December 2025 17:36
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিকল্প শিরোনাম হতেই পারত ‘মার্সেডিজ দিয়ে হালচাষ চলে না!' উপমার কেন্দ্রে একজন। তিনি নায়ক৷ বিতর্কিত৷ আপাতত শিরোনামে, চর্চায়। কেন্দ্রে একটি দৃঢ় অবস্থান (যা আপাতত একটু নরম হয়েছে)—তিনি বিশ্বকাপের যোগ্যতা প্রমাণে ঘরোয়া ক্রিকেটে নামবেন না। রাঁচি ম্যাচের শেষে জানিয়েছিলেন কারণ—কেরিয়ারে এত অর্জন, এত সাফল্যের পর কেঁচেগণ্ডূষ নিরর্থক। প্রস্তুতির সংজ্ঞা গিয়েছে পালটে। এখন আর নেটে ঘাম ঝরানো অনুশীলন, ম্যাচ ডে প্রিপারেশন জরুরি নয়। সবই মানসিক। মানসিক অনুশীলন৷ কায়িক কসরত বাতুলতা। তিনি ফার্স্ট বয়। অনেক মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের চ্যালেঞ্জ সামলেছেন৷ পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের ফাইনাল দিতে যাওয়ার আগে স্রেফ ঝালাই-ই যথেষ্ট... এখন আর কেউ শীতের রোদে খোলা ছাদে টেস্ট পেপার সলভ করতে বসে?
রাঁচির ময়দানের বক্তব্য যে বায়বীয় ছিল না, তার প্রমাণ দিতেই যেন আজ, রায়পুরে, নেমেছিলেন বিরাট৷ বস্তুভিত্তি প্রতিষ্ঠা পেল। ফের সেঞ্চুরি হাঁকালেন বিরাট। কখনও খুলে খেললেন, কখনও ধরে। সবশেষে ১০২ রানে আউট হয়ে যখন সাজঘরে ফিরলেন, তখন যা বোঝানোর পুরোটাই বুঝিয়ে দিয়েছেন। বিশ্বকাপ এখনও দূরের ডেস্টিনেশন। কিন্তু তার আগে, অন্তত সামনের কয়েক মাস, ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলা নিয়ে যে কেউ কানের পাশে শিঙে ফুঁকবে না—দুরন্ত ইনিংসের পর এই তথ্যটা বিরাটকে বোধ হয় সবচেয়ে বেশি স্বস্তি দেবে!
কী অপূর্ব স্টাইলে আজ খেলাটাকে সাজালেন বিরাট! দু'উইকেট পড়ে গিয়েছে। পিচ বিষাক্ত নয়, তবে বুঝে না খেললে স্খলনের জোর সম্ভাবনা! রোহিত সাজঘরে। আউট যশস্বীও৷ সেই অবস্থায় সূত্রধরের ভূমিকায় পার্টনারশিপ গড়ে তুললেন। ধাপে ধাপে।
একটা বড় প্রশ্ন ছিল—রাঁচির সেঞ্চুরি কি ‘এক ম্যাচের ঝলক’? নাকি তাঁর ব্যাটিং-ডিএনএতে সত্যিই কোনও বদল এসেছে? আজ রায়পুরে দেখা গেল—এটা ধারাবাহিকতা। একটা ভাবনা। একটা পরিকল্পনা। আর তার উপর দাঁড়িয়ে নিজের ‘মানসিক প্রস্তুতি থিসিস’-কেই মাঠে প্রমাণ করে দেওয়া।
বিরাট বলেছিলেন, ‘অতিরিক্ত প্রস্তুতিতে আমি বিশ্বাসী নই’। শুনে অনেকেই হেসেছিল। কেউ ভেবেছিল—অজুহাত, কারও বিদ্রূপ—‘এবার থেকে বিদেশে নেট করেও ভারতীয় দলে খেলা মঞ্জুর হবে?’ রায়পুরে ৯৩ বলে দ্বিতীয় শতরান স্পষ্ট প্রমাণ—কোনও সাধারণ ক্রিকেটার নন… বিরাট নামটাই ব্যতিক্রমী!
হঠাৎ এমন স্বাধীনতা কোথা থেকে খুঁজে পেলেন কোহলি? উত্তরটা ব্যাটিং স্টাইলের গভীরে। আগের ম্যাচ-ই যার জোরালো প্রমাণ—প্রথম ২০ বলে দু’খানা ছয়, আজও সেই মনোভাব। ইনিংসের মাঝপথে তিনি আবারও দেখালেন—রান তোলার গতি আর বাউন্ডারি হাঁকানো—দুটোই পরিস্থিতি বুঝে মিশিয়ে নিতে পারেন। যেন নতুন করে কোনও ফর্মুলা রচনা করছেন নিজের বয়স, শরীর, ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারকে মাথায় রেখে। ঠিক পাকা রাঁধুনির মতো। কখনও আঁচ বাড়ানো, কখনও কমানো। আজ মার্কো জানসেনের অফ-লেংথ বলকে ‘গ্লাইড’ করে, পরের বলেই ‘চিপ’। একই ধাঁচের ডেলিভারিকে ফের একবার মিড-উইকেটের উপর দিয়ে তুলে দিলেন—এ এক নতুনতর কোহলি, যিনি আপাতত নকশা-বদলানো ব্যাটিংয়ে মজে!
কোথাও যেন তরুণ বয়সের অ্যালার্ট ফুটওয়ার্ক, কোথাও প্রবীণতার অভিজ্ঞতা, কোথাও অতি সূক্ষ্ম বল-চোখের সমন্বয়—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত মিশ্রণ। বয়স ছত্রিশ-সাঁইত্রিশ পেরোলে সাধারণত ক্রিকেটাররা নিরাপদ মোডে চলে যায়। বিরাট সেখানে নিজের উন্নততর সংস্করণ! আর এই উন্নতি দুই দিকেই—মন আর শরীরে।
উদাহরণ রায়পুরের ইনিংস—প্রথম ৫০ তুললেন ৪৯ বলে, পরের ৫০ ৪১ বলে। এই দুই পর্ব দেখে বোঝা যায়—এলোমেলো আক্রমণ নয়। হিসেবি গতিবদল। যা তাঁকে ‘অভিজ্ঞ সিনিয়র’ থেকে ফের একবার ‘ম্যাচ-উইনার সিনিয়র’ বানিয়ে তুলেছে। বিশ্বকাপে এমন খেলোয়াড়কে দলে না নেওয়াটা আত্মঘাতী হতে পারে।
তর্ক উঠছে—বোর্ডের ‘খেলতে গেলে ঘরোয়া খেলো’ তত্ত্ব নিয়েও। আজকের সেঞ্চুরির পর বোর্ড কি তাঁকে ঘরোয়া ওয়ান ডে-তে নামতে বাধ্য করতে পারে? নিয়ম আর নীতির দোহাই দিলে উত্তর হবে: পারে। বাস্তবে? রায়পুরের শতরান দেখে কিন্তু এটা পরিষ্কার—যাঁর ৮৪টি আন্তর্জাতিক শতরান, ম্যাচ-ধারণ ক্ষমতা এই স্তরের—তাঁকে ‘প্র্যাকটিস-ম্যাচ’-এর বাধ্যতামূলক ঘরোয়া প্রস্তুতি দিয়ে মাপাটা মূর্খামি ছাড়া কিছুই নয় কী! বিরাট যে এখনও বহুমাত্রিক ওয়ান ডে ব্যাটার—অ্যাঙ্কর, আগ্রাসী, রান চেজার—সব ভূমিকাতেই সমানে খেলে যেতে পারেন আর এই বহুমুখী দক্ষতা যে কাউকে শিখিয়ে দেওয়া যায় না, তৈরি হয় দেড় দশকের আন্তর্জাতিক শ্রমে—এ কথা বোর্ড যত তাড়াতাড়ি বুঝবে ততই ভারতীয় ক্রিকেটের মঙ্গল।
কোচ হিসেবে গম্ভীরকেও বুঝতে হবে—বিরাট ব্যাটার হিসেবে নিজেকে পালটে ফেলেছেন। এখন ফিল্ড-ম্যানিপুলেশন আগের চেয়েও নিখুঁত। মিড-অন তুলে আক্রমণ, থার্ড-ম্যানের খালি জায়গা খুঁজে একের পর এক সিঙ্গল চুরি—এগুলোই সূক্ষ্ম লড়াই। যা আজকের ওয়ান ডে-র জমানায় ম্যাচ জেতায়। দক্ষিণ আফ্রিকার বোলাররা মাঝেমধ্যে কাটার, ব্যাক-অফ-লেংথ, হার্ড লেংথে আক্রমণ করেছেন। বিরাট প্রতিটি ক্ষেত্রে বল দেখেছেন দেরিতে—কব্জির ব্যবহার ফাঁক খুলে দিয়েছে। এটা খাঁটি ব্যাটিং-বুদ্ধিমত্তা। যার অনুশীলন হয় নেটে, কিন্তু সিদ্ধি আসে মানসিক অনুশীলনে!
শেষ কথা একটাই—ফর্ম ভাগ্যের খেলা। কিন্তু ক্লাস সচেতন রূপান্তর… নিজের বয়সকে বুঝে নতুন ব্যাটিং-নকশা তৈরি করার শিল্প। আজ রায়পুরে সেই শিল্পেরই প্রদর্শনী মেলে ধরেছেন বিরাট কোহলি।