গিলকেও শিখতে হবে নিয়ন্ত্রণের কৌশল। আগুন ধরাতে জানানোই সবটুকু নয়, আঁচ বাড়ানো-নেভানো-কমানোর বিদ্যাও আয়ত্তে থাকা চাই। ইংল্যান্ড সফর অধিনায়ক গিলের আত্মনিয়ন্ত্রণের পাঠশালা হয়ে উঠতে পারে!

শুভমান গিল
শেষ আপডেট: 23 July 2025 15:10
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শুভমান গিল এখন আঁধারপথের পথিক।
জাতীয় দলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা, কয়েক মাস আগেও, হাওয়ায় কান পাতলে শোনা যায়নি। রোহিত শর্মার আকস্মিক অবসর, জাতীয় ক্রিকেটে ডামাডোল, অনেক প্রশ্ন, বিতর্ক, গুঞ্জন… তারপর বাকিদের ঠেলে নির্বাচকদের পছন্দের পাত্র হয়ে ওঠা। মাত্র পঁচিশ বছর বয়সেই টিম ইন্ডিয়ার নেতৃত্ব। এই সাফল্য রেকর্ড না হলেও আলোচনায় আসার যোগ্য। এবং খুব সঙ্গত কারণেই আলোচনায় এসেছেন শুভমান।
চর্চা চলেছে তাঁর নেতৃত্বের ধরন নিয়ে। তার কারণ, দলনেতা হিসেবে এক আইপিএল ছাড়া কোথাও সেভাবে দেখা যায়নি। ঘরোয়া ক্রিকেট এখনও হালে পানি পায় না। জনতার দরবারে আদৃত নয়। ফলে অধিনায়ক হিসেবে তিনি ঠিক কোন ধাতুতে গড়া… ধোনির মতো স্থিতধী নাকি কোহলির মতো আগ্রাসী? প্রশ্ন উঠেছে। স্পষ্ট জবাব বুঝে নিতে চাইছে ক্রিকেট মহল।
ইংল্যান্ড সিরিজের প্রথম টেস্টে হেরে যাওয়ার পর স্বভাবসিদ্ধ মেজাজেই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। পরের ম্যাচে জয়। সেখানেও ‘ব্যাটসম্যান’ শুভমানের পরিচিত সত্তাই বেরিয়ে আসে… একই রকম শান্ত, অনুচ্চকিত এবং গোছানো। মাঠে ও মাঠের বাইরে নিজের জনপ্রিয় স্বভাবেই ধরা দেন টিম ইন্ডিয়ার অধিনায়ক।
কিন্তু সমস্ত ধারণা এক লহমায় বদলে যায় লর্ডস টেস্টে। রীতিমতো মেজাজ হারিয়ে ইংল্যান্ড ওপেনার জ্যাক ক্রলির দিকে তেড়ে যান শুভমান, গালিগালাজ দিতেও কসুর করেননি। ‘ইমপ্যাক্ট সাব’ সঙ্কেত দেখিয়ে, আঙুল হেলিয়ে জুড়ে দেন তর্ক। ম্যাচ চলাকালীন এমন দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। বিতর্কের কেন্দ্রে শুভমান বলে বিস্ময়ের ঘোর আরও বেড়েছে।
কী ঘটেছিল লর্ডসের শেষ বিকেলে? তৃতীয় দিনের একেবারে অন্তিম লগ্নে ভারত চেয়েছিল শেষ দুই ওভার বল করতে। তাতে কান না দিয়ে জ্যাক ক্রলি ও বেন ডাকেট সময় নষ্ট শুরু করেন। কেউ একটু ধীর গতিতে হাঁটলেন, কেউ স্ট্রেচিং করলেন, কেউ জল খেলেন, এমনকি ফিজিও পর্যন্ত ডাকা হল। ভারত এক ওভারের বেশি বলই করতে পারল না। ঠিক তখনই স্লিপ থেকে তেড়ে এলেন গিল। শুরু হল বাকযুদ্ধ।
ম্যাচ শেষে গিল বলেন, ‘আমরাও হয়তো কম ওভার খেলতাম, কিন্তু সেটা একটা পদ্ধতিতে করতে হয়। ওরা ৯০ সেকেন্ড দেরি করে ক্রিজে আসে। সাত মিনিট খেলা বাকি ছিল। সেই সময় এমন অনেক কাজ করে, যা খেলার স্পিরিটে পড়ে না। সব হঠাৎ করে হয়নি। আমাদের সেইরকম কিছু করার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু আপনি খেলছেন, জেতার জন্য। ফলে আবেগ থাকবেই। কিছু কিছু ঘটনায় তা আচমকা বেরিয়ে আসে!’
শুভমান গিলকে এভাবে প্রকাশ্য মুখ খুলতে খুব একটা দেখা যায় না। ব্যাট হাতে বরাবরই শান্ত, কথা কম। কিন্তু এই ইংল্যান্ড সফর সেই ইমেজটাই বদলে দিয়েছে। ২০২১ সালে গাব্বা টেস্টের পর বিদেশে কোনও অর্ধশতরান ছিল না। অধিনায়ক হয়ে ইংল্যান্ড সফরে নেমেই সমালোচক ও সংশয়ীদের জবাব দিয়েছেন। মাত্র ৬ ইনিংসে ৬০৭ রান, যা ইংল্যান্ডে কোনও ভারতীয় ব্যাটারের সর্বোচ্চ সিরিজ রানের রেকর্ড। তিনটে শতরান, যার মধ্যে এজবাস্টনে অসাধারণ দ্বিশতরান। ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাটিং নয়, বরং ৯০% ‘কন্ট্রোল রেট’ ছিল তাঁর ইনিংসে, যা সিরিজে এখনও পর্যন্ত সেরা।
ভারতের দল অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের ছাড়াই খেলতে নেমেছে। নেই রোহিত, নেই কোহলি। গত আট টেস্টে মাত্র একটিতে জিতেছে দল। এই অবস্থায় নেতৃত্বের রাশ হাত তুলেছেন গিল। তিনটি টেস্টের পরও জয় এসেছে একটিতে। ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়ার মূল্য চোকাতে হয়েছে। তবে প্রতিটি ম্যাচেই ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। যা ম্যাঞ্চেস্টারে নামার আগে দলকে আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে।
লর্ডসে চতুর্থ দিন গিল যখন ব্যাট করতে নামেন, তাঁর আগ্রাসী মেজাজ কি ব্যাটিংয়ে ছায়া ফেলেছিল? প্রশ্নটা উঠছে। ইংল্যান্ড তখন ইতিমধ্যেই দু'টি উইকেট তুলে নিয়েছে। গিল নামার পরই ড্রেসিংরুম থেকে ব্রেন্ডন ম্যাকালামের বার্তা ছিল—‘স্লেজিং বাড়াও!’
গিল টিকতে পারেননি। মাত্র ৯ বল খেলে আউট হয়ে সাজঘরে ফেরেন। গুরুত্বপূর্ণ উইকেট পতন, যা ভারতকে পরাজয়ের দিকে টেনে নিয়ে যায়। তাই জল্পনা দানা বেঁধেছে: গিল কি নিজের খোলস ছেড়ে অকারণ ‘কোহলি’ হওয়ার চেষ্টা করলেন? গম্ভীর-শান্ত মেজাজ আসল সত্তা? নাকি নির্মোক?
শুভমানের এই আগ্রাসনকে ‘স্বাভাববিরুদ্ধ’ দেগে দেওয়াটা সহজ। কিন্তু ইতিহাস বলছে, এই প্রথম নয়। দু’বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে নিজের আউট নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় গর্জে উঠেছিলেন। গত বছর ইংল্যান্ডের জেমস অ্যান্ডারসনের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়ান। এমনকি তাঁকে অবসর নেওয়ার পরামর্শ পর্যন্ত দেন! আইপিএলেও গুজরাত টাইটানসের অধিনায়ক হিসেবে আম্পায়ারদের সঙ্গে ঝামেলা করেছেন, কোড অফ কন্ডাক্ট লঙ্ঘনের জেরে সাজাও পেতে হয়েছে।
কিন্তু তর্কের মুখেও পিছপা হননি। মনে পড়বে ২০১৮ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তান ম্যাচের কথা। যখন পাক ক্রিকেটারদের ক্রময়াগত স্লেজিংয়ের জবাব দেন ব্যাট হাতে, হাঁকান শতরান।
যদিও এই আগ্রাসন যে সবসময় কাজে দেয়, তা নয়। বিরাট কোহলিও বারবার বলেছেন, তাঁর ট্রেডমার্ক আগ্রাসন সবসময় সহজাত ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে তাঁকেও পিছু হঠতে হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২২ সালে বেয়ারস্টোর সঙ্গে ঝামেলা কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকায় স্টাম্প মাইক-বিতর্ক। মুখের কথার তেজ কাজে দেয়নি।
গিলকেও শিখতে হবে নিয়ন্ত্রণের কৌশল। আগুন ধরাতে জানানোই সবটুকু নয়, আঁচ বাড়ানো-নেভানো-কমানোর বিদ্যাও আয়ত্তে থাকা চাই।
ইংল্যান্ড সফর অধিনায়ক গিলের আত্মনিয়ন্ত্রণের পাঠশালা হয়ে উঠতে পারে!