এমনিতে গম্ভীরের বক্তব্য শুনতে মন্দ নয়৷ ম্যানেজারের রোঁয়া-ওঠা অহং বেরিয়ে আসে। বেশ চটপটে, মশলাদার, হেডলাইন-সুলভ। চায়ের কাপে তুফান ওঠে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, মোরিনহো-ফার্গি-গুয়ার্দিওলার পেছনে যে বাহারি চালচিত্র, সাফল্যের যে জ্যোতির্বলয় রয়েছে, গম্ভীর সেখানে নিঃস্ব।
.jpeg.webp)
গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 2 December 2025 12:55
২০২৮ সাল, ২৮ অগস্ট। টটেনহ্যাম হটস্পারের বিরুদ্ধে ঘরের মাঠে ৩ গোলে চুরমার হল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। এমনিতেই চাপে ছিলেন কোচ জোসে মোরিনহো। সাংবাদিকদের প্রশ্নবাণ তাঁকে আরও বেকায়দায় ফেলে দেয়৷
আপনি কি সত্যি ম্যান ইউয়ের মতো ক্লাবের হট সিটে বসার যোগ? পারবেন দলের হাল ফেরাতে? এমন একগুচ্ছ সওয়াল তীক্ষ্ম তিরের মতো ধেয়ে আসছে যখন, চেয়ার ছেড়ে বেরিয়ে আসার আগে আগত সাংবাদিকদের আঙুল তুলে নামতা বোঝানোর স্টাইলে জোসে বলেছিলেন, ‘আজকের স্কোরলাইন ৩-০। কিন্তু এই ফলাফল আসলে কীসের প্রতীক জানা আছে? আমি এই লিগে ঠিক এতগুলো খেতাব জিতেছি। বাকি সমস্ত ম্যানেজারদের যোগ করেও তা হবে না। অতএব সম্মান জানান!' ‘রেসপেক্ট, রেসপেক্ট ম্যান, রেসপেক্ট!'—ক্রমশ বিলীয়মান তিনটি শব্দ আজও সোশ্যাল মিডিয়ায় মিমের রসদ জোগায়!
জোসে একা নন৷ ইউরোপীয় ফুটবল এমন একাধিক বিতর্কিত প্রেস কনফারেন্সের সাক্ষী। যেমন, পেপ গুয়ার্দিওলা। সাংবাদিকের অস্বস্তিকর প্রশ্নের জবাবে তাঁর দিকে হিমশীতল চাহনি ছুড়ে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, ‘সওয়াল করলে উত্তরদাতার দিকে তাকাতে হয়৷ অন্যদিকে চেয়ে থাকাটা অভদ্রতা! যখন কথা বলব, আমার দিকেই তাকাবেন, অন্য কোনও দিকে নয়!’
স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন অবশ্য এত নীতিপাঠের রাস্তায় হাঁটেননি৷ বেয়াড়া প্রশ্নকর্তার কথা কানে আসতেই পাশে বসা ক্লাবের কর্তাকে সটান বলে দেন, ‘পরের প্রেস মিটে যেন এই ভদ্রলোককে আর না দেখি!’ এবং এটা ফিসফিস করে নয়৷ স্পষ্ট উচ্চারণে। যা হলঘরে প্রত্যেকের কানে পৌঁছেছিল!
এতগুলো কথা বললাম, তার কারণ, গৌতম গম্ভীরের সাম্প্রতিকতম সাংবাদিক সম্মেলেন। গুয়াহাটি টেস্টে দলের ভরাডুবির পর গদি যখন টলমল, তখন তিনিও মোরিনহো-সুলভ কায়দায় নিজের অতীত কীর্তি সব্বাইকে স্মরণ করিয়ে দেন৷ জানান, কুর্সি ছাড়তে বলার কথা আসছে কোত্থেকে? তিনি যে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জিতেছেন, জিতেছেন এশিয়া কাপ, এই কিছুদিন আগে, সেটা কি লোকে ভুলে গেল? দল জেতে৷ দল হারে। একা কোচকে গিলোটিনের তলায় আনাটা অযৌক্তিক। তিনি কোচ হিসেবে যেমন ব্যর্থ। তেমন সফল। আর এই উত্থান-পতনের আদত কারণ, টিম ট্রানজিশনে রয়েছে। অনেক তারকা, অভিজ্ঞ মুখ বিদায় নিয়েছেন। নতুন খেলোয়াড় এসেছেন৷ ফলে সবকিছু ধাতস্থ হতে সময় জরুরি। সেই সময় তাঁর হক, তাঁর প্রাপ্য!
এমনিতে গম্ভীরের বক্তব্য শুনতে মন্দ নয়৷ ম্যানেজারের রোঁয়া-ওঠা অহং বেরিয়ে আসে। বেশ চটপটে, মশলাদার, হেডলাইন-সুলভ। চায়ের কাপে তুফান ওঠে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, মোরিনহো-ফার্গি-গুয়ার্দিওলার পেছনে যে বাহারি চালচিত্র, সাফল্যের যে জ্যোতির্বলয় রয়েছে, গম্ভীর সেখানে নিঃস্ব। তাঁর পেডেগ্রি নেই৷ কোচ হিসেবে বনেদিয়ানা নেই৷ আর এখানেই যে ঔদ্ধত্য ফার্গুসনের সাজে, ব্যক্তিত্বের সঙ্গে খাপে খাপ খেয়ে যায়, আরও গ্ল্যামারাস মনে হয়, সেই একই অহং গম্ভীরের কথায় ফুটে বেরলে হয়ে ওঠে শব্দদূষণ! জমে বিতর্ক, তীব্র সমালোচনা!
আসলে প্রেস কনফারেন্সে ম্যানেজারদের আদবকায়দা, সওয়াল শোনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, জবাব দেওয়ার তরিকা—সবেরই একটা ব্যাকরণ আর বিজ্ঞান রয়েছে। আজ নয়৷ দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই রীতিনীতির কাঠামো গড়ে উঠেছে৷ গৌতম গম্ভীর তার ছাঁটটুকু নিয়েছেন, ফেলে দিয়েছেন সারবস্তু!
ইউরোপে কেন সাংবাদিক সম্মেলন এত গুরুত্বপূর্ণ, সেটার উত্তর পাওয়া যায় সেই বিশাল ক্যানভাসেই। গম্ভীরের কনফারেন্সে যে টেনশন দেখা গেল, তার শিকড় লুকিয়ে একটা বড় সত্যে: প্রেস রুমে সঠিক আচরণ আসলে এক ধরনের ‘ম্যানেজারিয়াল স্কিল’। যার আলাদা প্রশিক্ষণ লাগে। মাঠে ট্যাকটিক্স তৈরি যেমন জরুরি, প্রেস রুমে নিজের কথাকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করাও ঠিক ততটাই বড় দায়িত্ব। ইংল্যান্ড, স্পেন, জার্মানি—যে লিগই ধরা হোক, সেখানে প্রেস মিট শুধু তথ্য দেওয়া নয়, বরং জন-মনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ করার পরিসর!
মোরিনহো যখন ‘রেসপেক্ট’ বলে চিৎকার করেন, তিনি জানেন, এই নাটক মিডিয়ার আলো নিজের দিকে টেনে আনছে, আর দলকে সরিয়ে দিচ্ছে আড়ালে! গুয়ার্দিওলার দৃশ্যমান ক্রোধ আসলে ম্যাচ-পরবর্তী চাপ পাল্টানোর কায়দা—নিশানা রিপোর্টার নয়, বিতর্কের আঁচ ও আলো—দুই-ই নিজের দিকে ঘোরানো! স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনও প্রায়ই ইচ্ছাকৃতভাবে সাংবাদিকের প্রশ্ন কেটে দিতেন, যাতে ড্রেসিংরুমের সমালোচনা বাইরে না যায়।
আর এগুলো সবই বহু বছরের ট্যাকটিক্স। তাঁরা জানেন—প্রেস রুমে ভুল করলে, ড্রেসিংরুমে ঢেউ লাগে। সাংবাদিকের সামনে সামান্য শব্দচয়নে ত্রুটি পুরো দলের মানসিক কাঠামো নড়িয়ে দিতে পারে! এই জায়গাতেই প্রকট গম্ভীরের ঘাটতি। দল ট্রানজিশনে—ঠিক। নির্বাচন বিতর্কের মধ্যে—ঠিক। ব্যাটিং বিচ্যুতি, বোলিং কনফিউশন—সবই বাস্তব। কিন্তু সাংবাদিকদের মুখোমুখি দাঁড়ালে একজন কোচের তো সামগ্রিক বিতর্ক শান্ত করা, আবছাভাবে হলেও ভুল স্বীকার করা, দূরের পরিকল্পনা ঘোষণা, প্রতিপক্ষকে কৃতিত্ব দেওয়া এবং অবশ্যই নিজের ব্যর্থতার দায় কাঁধে নেওয়া কর্তব্য!
এই জায়গায় দাঁড়িয়ে গম্ভীর দিলেন কী? না, অতীতের সাফল্যের তালিকা, ট্রানজিশন নামক অজুহাত এবং একধরনের ‘মোরিনহো-ধাঁচের’রাগমেশানো ফাঁপা আগ্রাসন! সমস্যা এখানেই—য়ুর্গেন ক্লপ, পেপ, ফার্গুসন নিজেদের ব্র্যান্ড তৈরি করেছেন মাঠের সাফল্যে। গম্ভীর এখনও সেই স্তরে পৌঁছোননি। ফলে তাঁর কথার প্রতিটি কথা ভুল ওজন পায়। এবং দুর্ভাগ্যবশত, এই ছোট ছোট ভুল জমতে জমতেই তাঁকে খাদের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বিশ্বের তাবড় কোচেরা জানেন কখন লড়াই করতে হয়, কখন সরে যেতে হয়, এবং কখন সাংবাদিকদের সামনে নিজেদের ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠা করাতে হয়। তাঁরা রেগে যান—কিন্তু সেই রাগ আসলে কৌশল। কথার জোরে সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করেন—কিন্তু তা হিসেবকৃত। বিতর্ক তৈরি করেন—কিন্তু তাতে আখেরে দলের লাভ হয়।
গম্ভীরের ক্ষেত্রে সবটাই উলটো। তাঁর ক্রোধ দৃষ্টিকটু, আত্মরক্ষা অগভীর, যুক্তি একগুঁয়ে—আর সব মিলিয়ে তিনি দেখিয়ে দিলেন, যে বড় মঞ্চে প্রশ্ন সামলানোর মানসিক প্রস্তুতি তাঁর নেই। আর এ কারণেই বোর্ডের ভেতরে ‘অসন্তোষ’ বাড়ছে। হারাচ্ছেন ড্রেসিং রুমের সমর্থন। ইতিহাস সাক্ষী, খেলোয়াড়দের ভরসা হাতছাড়া হওয়াটা যে কোনও কোচের প্রস্থানের এপিসেন্টার! গম্ভীরের হাতে সময় কম। নিজেকে শুধরে নেওয়ার হাতেগোনা সুযোগ পাবেন। আদৌ কাজে লাগাবেন তো?