
হায়দরাবাদে সাইক্লোনের পর দুই ওপেনার ট্র্যাভিস হেড ও অভিষেক শর্মা।
শেষ আপডেট: 9 May 2024 15:54
সানরাইজার্স হায়দরাবাদের মালিক হায়দরাবাদের সান গ্রুপের কর্ণধার কলানিথি মারান। একাধিক ধুন্ধুমার তামিল ছবির প্রযোজক হিসেবে সুপরিচিত তিনি। গতকাল রাজীব গান্ধী স্টেডিয়ামে লখনউ সুপার জায়ান্টসের বিরুদ্ধে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের ইনিংস শেষ হবার পর মনে হচ্ছিল, এই বুঝি পর্দায় তাঁর নাম ভেসে উঠবে। বাস্তবে তো এ' জিনিস চট করে দেখা যায় না। হিন্দি ছবিতেও এতটা হয় না। একমাত্র তামিল অ্যাকশন ছবিতেই দেখা মিলতে পারে। নয়ত বাস্তবের কোনও ক্রিকেট বইয়ের নিয়ম দিয়ে ট্র্যাভিস হেড-অভিষেক শর্মার ওই অতিমানবীয় যুগলবন্দিতে ব্যাখ্যা করা যায়? ভাবুন দিকি!
পেশাদার সাংবাদিক না হয়ে সমাজবিজ্ঞানী বা তাত্ত্বিক কেউ লিখতে বসলে একটা ভারিক্কি নাম দেওয়ার লোভ বোধ হয় ছাড়তে পারতেন না। হয়ত নাম রাখতেন 'হেড-শর্মা স্কুল অফ ক্রিকেট'। বা হয়ত, 'আইপিএলে হেড-শর্মা বিপ্লব'। এবারের আইপিএলের সিলেবাস, পাঠ্যবই, টেকনিক সবই কার্যত এই দু'জন এসে বদলে দিয়েছেন। ২০০৮-এ আইপিএলের একেবারে প্রথম ম্যাচেই ২২২ তুলে শোরগোল ফেলে দিয়েছিল কলকাতা নাইট রাইডার্স। চিন্নাস্বামীতে সেদিন ৭৩ বলে অপরাজিত ১৫৮ করে রেকর্ড গড়েছিলেন ব্রেন্ডন ম্যাককালাম। কিন্তু তাও মোটের ওপর দেড়শো রান উঠলেই ভদ্রগোছের টার্গেট ধরা হত। ১৭০-১৮০ মানে তো বড়সড় রান। মাঝেমধ্যে যে এক-আধটা বড় রান হত না, এমন নয়। ম্যাককালামের ওই রেকর্ড যেমন বছরপাঁচেক ছিল। ২০১৩ সালে তাঁকে টপকে আইপিএলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান তোলেন 'দ্য ইউনিভার্স বস' ক্রিস গেইল। ১৭৫ নট আউট। আজও সেটাই অক্ষুণ্ণ আছে।
কিন্তু এবারের আইপিএলে সানরাইজার্স হায়দরাবাদ যা শুরু করেছে, তাতে ওই ব্যতিক্রমটাই এবার নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনিতে নরেন্দ্র মোদীর আমলে ভারত-অস্ট্রেলিয়ার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বেশ ভাল। প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, খনি-টনি সবেতেই সহযোগিতা আছে। কিন্তু এবারের আইপিএল দেখার পর বলতে হবে, ইন্দো-অস্ট্রেলিয়া সহযোগিতার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ নিঃসন্দেহে ট্র্যাভিস হেড ও অভিষেক শর্মা। ২৭ মার্চ মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের বিরুদ্ধে ব্যাট করতে নেমে ২৭৭ রানের পাহাড় তুলে দেয় হায়দরাবাদ। ওপেন করতে নেমে হেড তোলেন ২৪ বলে ৬২, অভিষেক উল্টোদিকে ২৩ বলে ৬৩। আইপিএলের ইতিহাসে ওটাই ছিল সর্বোচ্চ স্কোর। কিন্তু নজিরবিহীন ভাবে মাত্র ২০ দিন পরে নিজেদের রেকর্ড নিজেরাই ভাঙে হায়দরাবাদ। বেঙ্গালুরুতে গিয়ে আরসিবির বিরুদ্ধে তাণ্ডব শুরু করে ৪১ বলে ১০২ রানের এক ঝোড়ো ইনিংস খেলে দেন হেড একাই। অভিষেক অবশ্য সেই ম্যাচে বেশিক্ষণ থাকেননি। কিন্তু ২৮৭ রানের রেকর্ড রান তুলে দেয় হায়দরাবাদ, আজ যা সর্বোচ্চ রেকর্ড। মাত্র ৫ দিন পরে দিল্লিতে আবারও সেই হেড-অভিষেক ঝড়। ওপেন করতে নেমে হেড ৩২ বলে ৮৯, পাল্টা অভিষেক ১২ বলে এলোপাথাড়ি মেরে তুলে গেলেন ৪৬। ২৬৬ রানের লক্ষ্যমাত্রা দিয়ে গেল হায়দরাবাদ। আইপিএলের পাঁচ সর্বোচ্চ স্কোরের মধ্যে তিনটেই তাদের।
গতকাল ঘরের মাঠে হেড-অভিষেক যা করে গেলেন, লোকে বলাবলি করছে, এরপর আর কুড়ি ওভারের ক্রিকেট খেলে-টেলে লাভ নেই। ওটাকে দশ ওভারে নামিয়ে দাও। লখনউ কেএল রাহুলের অশেষ সৌভাগ্য, টসে জিতে ব্যাট নিয়েছিলেন। এমনিতেই হায়দরাবাদের খেলা থাকলে অনেকে তিনশো পেরোবে কিনা এই মর্মে বাজি-টাজি ধরছে। হায়দরাবাদ আগে ব্যাট পেলে বোধ হয় কাল তিনশো পেরিয়েই যেত। ষোলোটা চার, চোদ্দটা ছয় মেরেছেন দু'জনে। উইকেটের পিছনে দাঁড়িয়ে অসহায়ভাবে দেখছিলেন রাহুল। বাহাত্তরটা আন্তর্জাতিক টি-২০, একশো তিরিশটা আইপিএল ম্যাচ খেলা রাহুল ম্যাচের পরে বলে গেলেন, অ্যাদিন এসব টিভিতেই দেখেছেন। 'সব কিছু ব্যাটের মধ্যিখানে লাগছে! কীরকম অবাস্তব লাগছে দেখে!' বস্তুত, দশ ওভারের আগে, ৬২ বল বাকি থাকতে ১৬৬ তুলে নেওয়ার নজির গোটা আইপিএলের ইতিহাসেই আর নেই। অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ লিগে একবার ব্রিসবেন হিট মেলবোর্নের বিরুদ্ধে ১৫৭ তাড়া করতে নেমে দশ ওভারে তুলে দিয়েছিল বটে! সেও ২০১৮-১৯ সালের কথা। এমনকি দশ ওভারের আগে ১৬৬ তুলে দেওয়ার নজিরও আর নেই আইপিএলে। কাউন্টিতে একবার ওরচেস্টারশায়ার-নর্দাম্পটনশায়ার ম্যাচে এরকম হয়েছিল।
এখন আইপিএলে যা অবস্থা, তাতে ২০০ উঠলে লোকে ভাবছে, যাক একটা ভদ্রগোছের রান হল! যে কোনও দল ২০০ তুলে দেওয়ার মত ক্ষমতা রাখছে! কলকাতায় কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব এসে ২৬১ তাড়া করে জিতে গেল। আরসিবি নেহাত কপাল খারাপ বলে ২২২ তাড়া করেও এক রানে হেরে বাড়ি ফিরল। অথচ হায়দরাবাদের চিন্তার জায়গাও আছে। দ্য ওয়াল প্রিভিউতে বারবার লিখেছে, মিডল অর্ডারের দুর্বলতার কথা। ব্যাটিং বড্ড বেশি হেড-অভিষেক নির্ভর। ওপেনার দাঁড়িয়ে গেলে পরে তিন-চারের ব্যাটসম্যানরাও খেলে দিচ্ছেন। হাইনরিখ ক্লাসেন, আইডেন মার্করাম, নীতিশ রেড্ডি বা আব্দুল সামাদ। অথচ শুরুতে হেড-অভিষেকের উইকেট পড়ে গেলেই আর ম্যাচে পাওয়া যাচ্ছে না তাঁদের। মার্করামকে ইতিমধ্যেই বসিয়ে দিয়েছেন প্যাট কামিন্স। কিন্তু হেড-অভিষেক দাঁড়িয়ে গেলে আর কারুর কিছু বলার জায়গা নেই। যেমন মনে হয় দু'জনে ছোটবেলা থেকে একই স্কুলে পড়েছেন, অভিন্নহৃদয় বন্ধু, গলিতে ইঁট পেতে ক্রিকেট খেলে পড়শির কাঁচ ভেঙেছেন।
ইতিমধ্যেই টি-২০ বিশ্বকাপের জন্য কোমর বাঁধা শুরু হয়েছে। হেড যে আইপিএলের স্লো সারফেসে স্পিন খেলার অভিজ্ঞতা ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে কাজে লাগাবেন, তা বলাই বাহুল্য। মার্করাম দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক। রয়েছেন ক্লাসেনও। বুধবার অবশ্য দেখে মনে হচ্ছিল, নেটে ছয় মারার প্র্যাকটিস করছেন। ১২ ম্যাচ খেলে ১৪৬-টা ছক্কা মেরেছে হায়দরাবাদ। যা আইপিএলে সর্বোচ্চ। ১৬ বলে অর্ধশতরান করেন হেড। হাত মেলান অভিষেকের সঙ্গে। যিনি কিছুদিন আগেই মুম্বইয়ের বিরুদ্ধে ১৬ বলে অর্ধশতক করে রেকর্ড করেছিলেন। এতদিন অস্ট্রেলিয়ার ডেভিড ওয়ার্নারকে ভাবা হত তেলুগু ছবির ভক্ত। প্রায়ই প্রযুক্তির সাহায্যে নানা তেলুগু অ্যাকশন দৃশ্যের রিল বানিয়ে সমাজমাধ্যমে ছাড়েন ওয়ার্নার। কিন্তু ১৬৬ তাড়া করতে নেমে মাত্র ৯ ওভার ৪ বলে কোনও উইকেট না হারিয়ে চার-ছয়ের ফোয়ারা ছুটিয়ে ট্র্যাভিস হেড-অভিষেক শর্মা যা খেল দেখালেন, যে কোনও তেলুগু ছবির পরিচালক চাইলে একটা চিত্রনাট্য লিখে ফেলতে পারে।