নির্বাচকদের চিন্তাভাবনা ভিন্ন। তাঁদের মতে, শ্লথ উইকেটেও আক্রমণাত্মক মানসিকতার ব্যাটারদের উপর ভরসা করাই ইদানীং চালু রেওয়াজ। শুরু থেকে বাউন্ডারির ঝড় তুলে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলে দেওয়াটাই কৌশল।

শুভমান গিল
শেষ আপডেট: 18 August 2025 14:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজের (England Series) নায়ক তিনি। অধিনায়ক হিসেবে অভিষেক সফরে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ব্যাট হাতে রান তুলেছেন। সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকও তিনিই। সব মিলিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটের পোস্টার বয় একজনই—তিনি শুভমান গিল (Shubhman Gill)।
জাতীয় দলের জার্সিতে যতটা উজ্জ্বল, ঠিক ততটাই দাপট দেখিয়েছেন আইপিএলে। গুজরাত টাইটানসের তরুণ দলনেতা ব্যাট হাতে সাড়ে ছ’শোর উপর রান তুলেছেন।
অথচ তাঁরই কিনা এশিয়া কাপের (Asia Cup) দলে জায়গা জুটছে না! অধিনায়ক হওয়া তো দূর অস্ত, ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত ফর্ম্যাটে নাকি শুভমানে অনাস্থা নির্বাচকদের। কেন? আড়ালে কি রাজনীতি? নাকি টি-২০-র জটিল অঙ্ক?
ফর্মে থাকা ক্রিকেটার, তায় কিনা লাল বলের ক্রিকেটে দলের অধিনায়ক, তাঁর বাদ পড়ার খবরে স্বাভাবিকভাবে বিস্ময় ছড়িয়েছে। বিকল্প হিসেবে শ্রেয়স আইয়ার আর জিতেশ শর্মার নাম জোরালো হওয়ায় অনেক প্রশ্নের জট জড়িয়ে-পেঁচিয়ে বিতর্ক ঘনিয়েছে দ্বিগুণ। সওয়াল একটাই—কেন এমন সিদ্ধান্ত? ঘুরিয়ে বললে: টেস্ট অধিনায়ক হয়েও কোন রহস্যে ব্রাত্য শুভমান গিল?
ভারতীয় নির্বাচকদের অবস্থান বেশ স্পষ্ট। টি-২০ দলে এখন ধারাবাহিকতা নয়, চাই ম্যাচ বদলে দেওয়া প্রতি আক্রমণ। পাওয়ার হিটিং, প্রথম বল থেকেই আগ্রাসন—এই দর্শনে দল গড়া হচ্ছে। গিল নিখুঁত টেকনিকের ব্যাটার, লম্বা ইনিংস গড়তে সিদ্ধহস্ত। কিন্তু তাঁর স্ট্রাইক রেট নিয়ে বরাবরই প্রশ্নচিহ্ন রয়ে গিয়েছে। শুরুর ওভারগুলোতে থিতু হতে সময় নেন, গতি তোলেন ধীরে। আর সেখানেই ম্যানেজমেন্টের আশঙ্কা—টি-২০ তে এই ধরণ কখনও পুরো দলের লয় থামিয়ে দিতে পারে। তাঁদের যুক্তি: যদি প্রথম একাদশেই জায়গা না মেলে, তবে শুধু নামের জন্য গিলকে স্কোয়াডে রাখার অর্থ হতে পারে কি?
এই যুক্তির পাশাপাশি কঠোর বাস্তব হচ্ছে ওপেনিং স্লটে ভিড়। অভিষেক শর্মা ও সঞ্জু স্যামসন সাম্প্রতিক সিরিজে আগুন-ঝরানো ব্যাটিং করেছেন। সঞ্জুর বাড়তি উইকেটকিপিং দক্ষতা আর অভিষেকের বিস্ফোরক মেজাজ কুড়িয়েছে নির্বাচকদের আস্থা। এঁদের একজনকে বাদ দিয়ে গিল জায়গা পেলে ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা।
আরেকটি বিশ্লেষণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এবারের এশিয়া কাপের মঞ্চ সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। এখানকার উইকেটগুলো সাধারণত ধীরগতির, ব্যাটে বল আসে দেরিতে। বড় শট খেলা সহজ নয়। স্পিনারদের দাপট থাকে প্রবল। এমন পরিস্থিতিতে এক প্রান্ত ধরে রেখে ইনিংস গড়তে পারে এমন ব্যাটার অনেক সময় অপরিহার্য হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, কাগজে-কলমে শুভমন গিলের ধীরস্থির ব্যাটিং এখানেই বরং কাজে লাগতে পারত।
কিন্তু নির্বাচকদের চিন্তাভাবনা ভিন্ন। তাঁদের মতে, শ্লথ উইকেটেও আক্রমণাত্মক মানসিকতার ব্যাটারদের উপর ভরসা করাই ইদানীং চালু রেওয়াজ। শুরু থেকে বাউন্ডারির ঝড় তুলে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলে দেওয়াটাই কৌশল। তাই শারজাহ বা দুবাইয়ের ধীর পিচ শুভমানের হয়ে যুক্তি তৈরি করলেও, ভারতীয় দল-গঠনের নতুন দর্শনে সেটা আর তেমন প্রাধান্য পাচ্ছে না।
বোর্ডের চোখে, মিডল অর্ডারে শ্রেয়সের অভিজ্ঞতা ও নোঙর ধরার ক্ষমতা (Anchoring) কাজে লাগবে। আর জিতেশকে দেখা হচ্ছে একেবারে ফিনিশার হিসেবে। যিনি শেষ পাঁচ ওভারে ঝড় তুলতে পারেন। এক কথায়, একজন ক্লাসিক অ্যাঙ্কর আর একজন হার্ড-হিটার—এই দুই ঝাঁজ যোগ হতেই গিলের জায়গা উবে গিয়েছে।
কোনও গোপন রহস্য বা আড়ালের রাজনীতি নয়—এ আসলে ফরম্যাটভিত্তিক চিন্তার ফল। টেস্ট অধিনায়ক হয়েও শুভমান আপাতত টি-২০ সমীকরণে বাড়তি। তাই তাঁকে ছেঁটে দেওয়া হচ্ছে। অবশ্যই এই সিদ্ধান্ত বিতর্ক উসকে দেবে। কারণ, আরবের ধীর পিচে গিলের ধৈর্যশীল ইনিংস কার্যকর হতে পারত। তবে নির্বাচকরা আপাতত ভিন্ন দর্শনে অটল। টি-২০ মানেই আগ্রাসন, গতি, ইমপ্যাক্ট। গিলের ফর্ম ঝলমলে হলেও তাঁর ধরণ সেখানে পুরোপুরি খাপ খাচ্ছে না।